ঢাকা রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মৃত্যুর আগেই মৃত্যুসংবাদ : এ দায়হীনতার শেষ কোথায়

শাহেদ কায়েস
মৃত্যুর আগেই মৃত্যুসংবাদ : এ দায়হীনতার শেষ কোথায়

একজন মানুষ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। তার স্বজনরা হাসপাতালের করিডরে উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। চিকিৎসকরা শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক তখনই ফেসবুকে ভেসে উঠল তার মৃত্যুসংবাদ। শুরু হলো শোক প্রকাশ। কেউ লিখলেন স্মৃতিচারণ, কেউ পুরোনো ছবি পোস্ট করলেন, কেউ বিদায় জানালেন। কিছুক্ষণ পর অনলাইন সংবাদমাধ্যমেও বড় শিরোনাম : তিনি আর নেই। অথচ হাসপাতাল তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি। মানুষটি চিকিৎসাধীন। এ অবস্থায় তার স্বজনদের ফোনে পৌঁছাতে থাকে শোকবার্তা।

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের ডিজিটাল সমাজ ও কিছু কিছু অনলাইন পোর্টাল এক গভীর অসুখ সামনে এনেছে। কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। ৭ সেপ্টেম্বর চ্যানেল আই অনলাইন তার লাইফ সাপোর্টে থাকার খবর প্রকাশ করে এবং জানায়, পরিবার তার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছে। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১০টা ৫৭ মিনিটে প্রকাশিত একটি সংস্করণে প্রকাশক মঈন মুরসালিনের বরাতে জানানো হয়েছিল, আমীরুল ইসলাম মারা যাননি, তিনি লাইফ সাপোর্টে আছেন। অথচ একই সময়ের আশপাশে অন্য কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যম তার মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করে। কোনো কোনো প্রতিবেদনের তথ্যের উৎস ছিল একজন প্রকাশকের ফেসবুক পোস্ট।

এখানে মূল আলোচ্য একজন লেখকের শারীরিক অবস্থা নয়। আরও বড় বিষয় সামনে এসেছে: একজন মানুষের মৃত্যু কে নিশ্চিত করবে? ফেসবুক, পরিচিতজন, সংবাদকর্মী, নাকি দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও হাসপাতাল?

মৃত্যু 'ব্রেকিং নিউজ' হওয়ার আগে : ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে গতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মৃত্যুসংবাদ প্রকাশে দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতার গুরুত্ব বহু গুণ বেশি। দশ মিনিট দেরিতে সঠিক সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকতার ক্ষতি হয় না। ১০ মিনিট আগে ভুল মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করলে ক্ষতিটা আর পুরোপুরি ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। বর্তমান অনলাইন সংবাদজগতে ভয়ংকর একটি চক্র তৈরি হয়েছে। একজন ফেসবুকে লিখলেন। আরেকজন পরিচিত মানুষ সেটি শেয়ার করলেন। কোনো অনলাইন পোর্টাল পোস্টটিকে সূত্র ধরে সংবাদ প্রকাশ করল। সেই সংবাদ দেখে আরও পাঁচটি পোর্টাল একই খবর প্রকাশ করল। কিছুক্ষণের মধ্যে গুগল ও ফেসবুকে একই শিরোনাম ছড়িয়ে পড়ল। তখন পাঠকের মনে হয়, এতগুলো সংবাদমাধ্যম যখন লিখছে, খবর নিশ্চয়ই সত্য।

বাস্তবে পাঁচটি সংবাদমাধ্যমের পাঁচটি স্বাধীন সূত্র নাও থাকতে পারে। সবার উৎস একই ফেসবুক পোস্ট। এই জায়গায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব সংবাদমাধ্যমে ঢুকে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়ে যায়। পরে সেই সংবাদ আবার ফেসবুকে ফিরে আসে সংবাদ মাধ্যমের লিংকসহ। যে তথ্য প্রথমে ছিল একজন ব্যক্তির অসমর্থিত পোস্ট, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি 'সংবাদ' পরিচয়ে সমাজে ফিরে আসে। ভুল তথ্যের এ বৃত্ত ভাঙার প্রথম দায়িত্ব সংবাদ মাধ্যমের।

ভেন্টিলেটর মানেই মৃত্যু নয় : আমীরুল ইসলামকে ঘিরে আলোচনায় 'লাইফ সাপোর্ট', 'ক্লিনিক্যালি ডেড' এবং 'ব্রেন ডেথ' শব্দগুলোও ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে অত্যন্ত সতর্ক থাকা দরকার। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এসব শব্দের অর্থ এক না। ভেন্টিলেটরে থাকা কোনো রোগীকে নিজের সিদ্ধান্তে মৃত বলা যায় না। একইভাবে 'ক্লিনিক্যাল ডেথ' এবং 'ব্রেন ডেথ'কে এক করে দেখাও ভুল। সাধারণভাবে হৃদ্‌?স্পন্দন ও স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার পরের অবস্থাকে ক্লিনিক্যাল ডেথ বলা হয়; দ্রুত পুনরুজ্জীবন চিকিৎসার মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে সেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব। ব্রেন ডেথ আলাদা চিকিৎসাগত অবস্থা, যা নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অঙ্গ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত আইনি কাঠামোতেও ব্রেন ডেথ ঘোষণার দায়িত্ব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ওপর দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মেডিসিন বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার, নিউরোলজি এবং অ্যানেসথেসিওলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে প্রক্রিয়া অনুসরণের বিধান রয়েছে। তাই রোগীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক, চিকিৎসকরা ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব কম দেখছেন, ডায়ালাইসিস করা যাচ্ছে না, ভেন্টিলেটরের সহায়তা চলছে, এসব তথ্য যত গুরুতরই হোক, সাংবাদিক নিজে সেখান থেকে 'মারা গেছেন' সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন না। চিকিৎসকের কাজ চিকিৎসক করবেন। সাংবাদিকের কাজ তথ্য যাচাই করা।

ভুল মৃত্যুসংবাদ আসলে কার ওপর আঘাত করে : এ ধরনের ভুলের সবচেয়ে নির্মম দিকটি আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। একজন মানুষের মৃত্যুসংবাদ তাঁর নিজের সম্পর্কে লেখা শেষ সংবাদগুলোর একটি। সেখানে ভুলের সুযোগ প্রায় শূন্য হওয়া উচিত। ভাবুন, একজন মা হাসপাতালে ছেলের পাশে বসে আছেন। একজন স্ত্রী চিকিৎসকের কাছ থেকে পরবর্তী খবরের অপেক্ষায়। সন্তান বাবার ফিরে আসার সামান্য সম্ভাবনাটুকু আঁকড়ে আছে। এমন সময় তাদের মোবাইল ফোনে শত শত শোকবার্তা পৌঁছাতে শুরু করল। কেউ জানাজা সম্পর্কে জানতে চাইছেন, কেউ দাফনের সময় জানতে চাইছেন, কেউ মৃত ব্যক্তির স্মৃতি লিখছেন।

একটি পরিবার যখন প্রিয় মানুষের জীবন নিয়ে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে, তখন তাদের নিজেদেরই অন্যদের বোঝাতে হচ্ছে: তিনি এখনো মারা যাননি। এর চেয়ে নিষ্ঠুর পরিস্থিতি খুব কম হতে পারে। মানুষের জীবনের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জীবনের শেষ পর্যায়ে তার মর্যাদাও গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর অসুস্থ মানুষ সংবাদমাধ্যমের ক্লিক সংগ্রহের উপকরণ নন। তার পরিবারও সংবাদকক্ষের যাচাইহীনতার মূল্য দেওয়ার জন্য বসে নেই।

'ফেসবুকে দেখেছি' কোনো সাংবাদিক সূত্র হতে পারে না : বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতায় একটি অভ্যাস ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে: 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন...।' সব ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সমস্যাজনক না হলেও মৃত্যুসংবাদের ক্ষেত্রে শুধু একটি পোস্টের ওপর নির্ভর করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যিনি পোস্ট দিয়েছেন, তিনি তথ্যটি কোথা থেকে পেয়েছেন? তিনি হাসপাতালে উপস্থিত আছেন কি? পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন কি? চিকিৎসকের ঘোষণা শুনেছেন কি? নাকি তিনিও অন্য কারও কাছ থেকে শুনেছেন?

সাংবাদিকতার সবচেয়ে মৌলিক কাজ এখানেই : উৎসের উৎস খুঁজে বের করা। কোনো পরিচিত লেখক, শিল্পী, রাজনীতিক, শিক্ষক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুসংবাদ এলে প্রথম ফোনটি তাঁর পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্যকে করা যায়। দ্বিতীয় ফোন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কর্মস্থলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছ থেকেও নিশ্চিত হওয়া যায়। দুই মিনিটের একটি ফোন যদি একজন জীবিত মানুষকে ভুল করে মৃত ঘোষণা করা থেকে সংবাদমাধ্যমকে রক্ষা করে, সেই দুই মিনিট ব্যয় না করার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। ভুল সংবাদ মুছে ফেললেই দায় শেষ হয় না : আরেকটি সমস্যা আরও গুরুতর। ভুল সংবাদ প্রকাশের পর অনেক অনলাইন মাধ্যম খবরটি চুপচাপ সরিয়ে দেয়, শিরোনাম পাল্টায়, কখনো একই লিংকের সংবাদ সংশোধন করে। পাঠক বুঝতেই পারেন না আগে সেখানে কী লেখা হয়েছিল। ডিজিটাল সাংবাদিকতায় সংশোধনের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা দরকার। একটি মাধ্যম যদি কাউকে ভুল করে মৃত ঘোষণা করে, পরে শুধু সংবাদ মুছে দিলে যথেষ্ট হবে না। দৃশ্যমান সংশোধনী দিতে হবে। কখন ভুল তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, কীভাবে ভুল হয়েছিল, সঠিক তথ্য কী, সব পরিষ্কার করে জানাতে হবে। সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশও দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত। কারণ ভুল মৃত্যুসংবাদ শুধু তথ্যগত ভুল নয়; এটি একজন মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভুল ঘোষণা।

সাধারণ ব্যবহারকারীর দায়ও কম নয় : ফেসবুক ব্যবহারকারী হিসেবে আমাদের আচরণ নিয়েও ভাবতে হবে। এখন প্রত্যেক মানুষের হাতে এক ধরনের ব্যক্তিগত সম্প্রচার মাধ্যম রয়েছে। একটি পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে 'শুনলাম', 'জানতে পারলাম', 'বিশ্বস্ত সূত্রে খবর' লিখে কারও মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের আগে আমাদেরও থামতে হবে।

বিশেষ করে মৃত্যু, দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, গুরুতর অসুস্থতা, নিখোঁজ এবং সহিংসতার মতো ঘটনায় একটি সহজ নিয়ম সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করা দরকার : নিশ্চিত না হলে প্রকাশ নয়, নিশ্চিত না হলে শেয়ার নয়। শোক প্রকাশে পাঁচ মিনিট দেরি হলে মৃত ব্যক্তির অসম্মান হয় না। ভুল করে একজন জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করলে তার এবং তার পরিবারের প্রতি গুরুতর অবিচার ঘটে।

সংবাদমাধ্যমকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে : আমীরুল ইসলামকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহ একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা দরকার। প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের লিখিত 'ডেথ কনফার্মেশন প্রটোকল' থাকা উচিত। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, হাসপাতাল, নিকটাত্মীয়সহ অন্তত একটি প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত না হয়ে কোনো মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে সূত্র হিসেবে নেওয়া গেলেও সেটিকে চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত না।

আরেকটি নিয়ম আরও সহজ : নিশ্চিত তথ্য যতটুকু, সংবাদও ততটুকু। মানুষ লাইফ সাপোর্টে থাকলে লিখুন লাইফ সাপোর্টে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে লিখুন আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকেরা আশা দেখছেন না বলে জানালে সেটুকুই লিখুন। কিন্তু চিকিৎসক মৃত্যু ঘোষণা করার আগেই সাংবাদিকতার কলম দিয়ে কাউকে মৃত বানানোর ক্ষমতা কোনো সংবাদমাধ্যমের নেই। আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন ভুল তথ্য সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়াতে পারে। সেই প্রতিযোগিতায় সংবাদ মাধ্যম যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেছনে ছুটতে থাকে, সাংবাদিকতার প্রয়োজনই একসময় পাঠকের কাছে দুর্বল হয়ে পড়বে। সংবাদমাধ্যমের শক্তি সবার আগে সংবাদ দেওয়ার মধ্যে একা নিহিত নেই; তার বড় শক্তি হলো, মানুষ বিশ্বাস করবে যে সেখানে প্রকাশিত তথ্য যাচাই করা।

মৃত্যু সংবাদের ক্ষেত্রে সেই বিশ্বাসের মূল্য আরও বেশি। একজন মানুষ যতক্ষণ চিকিৎসাধীন, তাঁর জীবন নিয়ে শেষ সিদ্ধান্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আসতে হবে। তার আগ পর্যন্ত আমাদের কাজ শোকবার্তা লেখা নয়, অপেক্ষা করা। কখনও কখনও কয়েক মিনিট অপেক্ষাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে দায়িত্বশীল কাজ।

লেখক : কবি, লেখক ও অধিকারকর্মী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত