প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
বাংলাদেশে সড়ক অবরোধের ঘটনা নতুন নয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন, শ্রমিকদের বিক্ষোভ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিবাদসহ নানা উপলক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমাদের কাছে খুব পরিচিত। এসব আন্দোলনের পেছনে অনেক সময় বাস্তব সমস্যা, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কিংবা কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা কাজ করে। সেই দাবির যৌক্তিকতা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু দাবি আদায়ের প্রধান পদ্ধতি হিসেবে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া কতটা ন্যায়সংগত, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রতিবাদের অধিকার যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ অন্যের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার। এ দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে প্রতিবাদ একসময় জনসমর্থন অর্জনের বদলে জনবিরক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিদ্যমান বিভিন্ন গবেষণা একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে তোলে। যান চলাচলের স্বাভাবিকতা ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধার গণ্ডিতে আটকে থাকে না, বরং তা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার সঙ্গে যখন নিয়মিত সড়ক অবরোধ যুক্ত হয়, তখন আগে থেকেই যানজটে বিপর্যস্ত নগরজীবনের চাপ আরও বহুগুণ বাড়ে। ২০২৪ সালে 'ফ্রন্টিয়ার্স ইন পলিটিক্যাল সায়েন্স' সাময়িকীতে প্রকাশিত গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি গবেষণায় আন্দোলনের সামাজিক প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। ২৬ জনের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ওই গুণগত গবেষণায় সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল, জীবিকা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হওয়ার মারাত্মক উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। এ গবেষণা দিয়ে হয়তো সারা দেশের আন্দোলনের ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে এটি স্পষ্টভাবে দেখায়, আন্দোলনের প্রভাব বোঝার জন্য শুধু আন্দোলনকারীদের দাবি বা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া দেখলেই চলে না। যারা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, তাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। দাবি আদায়ের জন্য জনজীবন অচল করে দেওয়ার এই প্রবণতা থেকে আমরা কেন বেরিয়ে আসতে পারছি না? ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং অক্টোবরে পোশাকশ্রমিকদের সড়ক অবরোধের ঘটনা একই প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকার উত্তরা ও সায়েন্স ল্যাবসহ বিভিন্ন স্থানে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ সব সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। একই বছরের ৯ আগস্ট গাজীপুরের টঙ্গীতে সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। তাদের মূল দাবি ছিল একটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ। পুলিশ কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের পর দুপুর ৩টার দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। তবে অবরোধ উঠে যাওয়ার পরও যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। অতি সম্প্রতি ঘটনাটি ঘটে গত ১৫ অক্টোবর। রাজধানীর উত্তরার আজমপুর ও রাজলক্ষ্মী এলাকায় বকেয়া বেতন পরিশোধ, মজুরি বৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। সকাল থেকে চলা এ কর্মসূচিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশপাশের সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষ, গণপরিবহনের যাত্রী ও সাধারণ পথচারীরা। শ্রমিকদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়ে গেছে, তাতে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার দাবি জানিয়েও তারা কোনো সমাধান পাননি। এ তিনটি ঘটনার প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। পরীক্ষার্থীদের অসন্তোষ, নিরাপদ সড়কের দাবি এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও বকেয়া বেতন আদায়ের প্রশ্নকে কখনোই এক পাল্লায় মাপা যাবে না। বিশেষ করে বকেয়া বেতন কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব। দীর্ঘদিন দাবি জানানোর পরও কার্যকর সমাধান না পেলে মানুষের ক্ষোভ বাড়ে এবং আন্দোলন তীব্র হয়। তাই শুধু পুলিশ দিয়ে অবরোধ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তবে এসব ঘটনা এটাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, দাবি আদায়ের চাপ তৈরি করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে কেন বারবার চরম মূল্য দিতে হবে। একজন শ্রমিকের বকেয়া বেতন যেমন তাঁর ন্যায্য অধিকার, ঠিক তেমনি একজন কর্মজীবী মানুষের সময়, একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা এবং একজন রোগীর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার দায় সাধারণ যাত্রীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত হতে পারে না। সড়ক অবরোধের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমাদের একটি ভুল ধারণা অবশ্যই এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। যানজট হচ্ছে বলেই সব প্রতিবাদ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া যাবে, এমন চিন্তা গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা নয়। নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত রাখাও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়া এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অবশ্য আইনসঙ্গত ও যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের বিষয়টিও এখানে প্রাসঙ্গিক। এ দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি বদলাতে হলে আমাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
মিরপুর, ঢাকা।