ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চাই কঠোর পদক্ষেপ

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চাই কঠোর পদক্ষেপ

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের অন্যতম বড় জননিরাপত্তা সংকট। প্রতিদিন সড়কে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং অসংখ্য পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের ঘটনা ঘটছে। একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না, বরং একটি পরিবারকে ঠেলে দেয় দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামাজিক সংকটের দিকে। অথচ কার্যকর পরিকল্পনা, আইনের কঠোর প্রয়োগ, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং চালকদের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, উল্টো পথে চলাচল, ট্রাফিক আইন অমান্য, চালকের অদক্ষতা এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের মতো কারণগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার, ক্লান্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং মাদকাসক্ত চালকের অসতর্কতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত সড়ক, ফুটপাত দখল, পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা না থাকাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই যানবাহনের গতিসীমা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ক্যামেরা স্থাপন, সিসিটিভি নজরদারি এবং নিয়মিত ট্রাফিক তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং চালকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা শিথিলতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অদক্ষ চালকদের প্রশিক্ষণ এবং পেশাদার চালকদের নিয়মিত দক্ষতা যাচাইও নিশ্চিত করা দরকার।

সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্পষ্ট সড়কচিহ্ন, কার্যকর ট্রাফিক সিগন্যাল, জেব্রা ক্রসিং, নিরাপদ বাসস্টপ, ফুটপাত ও মিডিয়ান ব্যারিয়ার নির্মাণ করতে হবে। স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার এলাকায় গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি মহাসড়কে যানবাহনের ধরন অনুযায়ী চলাচলের নিয়ম কার্যকর করতে হবে, যাতে ধীরগতির যানবাহনের সঙ্গে দ্রুতগতির যানবাহনের সংঘাত কমে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৬ মাসে সারাদেশে ৪ হাজার ২৩৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৪৬ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৫৪৪ জন আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তবে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। চালক, যাত্রী ও পথচারী— সবার মধ্যে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার, নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পারাপার এবং ট্রাফিক সংকেত মেনে চলার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্মিলিত অঙ্গীকার। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ বা তদন্তের পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা মানে শুধু যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা নয়, মানুষের জীবন রক্ষা করা। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত