প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমানো এবং পরিবেশের ওপর চাপ হ্রাসের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে কার্যকর ও টেকসই সমাধান। এ ক্ষেত্রে দেশের জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ছাদে ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে স্থাপিত ব্যবস্থাগুলোর কার্যকর ব্যবহার এবং নেট মিটারিং কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। সরকারি ভবনের অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দিনের বেলায় এসব কার্যালয়ের বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হবে এবং প্রচলিত জ্বালানির ব্যবহারও হ্রাস পাবে। শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে মাসিক প্রায় পাঁচ হাজার ইউনিট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে প্রায় ৮০০ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়নে কিছু সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। বিভিন্ন কার্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন ও সংযোগ কার্যক্রম এখনো প্রক্রিয়াধীন। ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বিল সমন্বয়ের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা থাকলে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ও সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে নেট মিটারিংয়ের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব জেলায় এখনও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কোথাও দরপত্রের মূল্য বরাদ্দের চেয়ে বেশি, কোথাও ভবন ভাড়া হওয়ায় স্থাপন সম্ভব হয়নি, আবার কিছু স্থানে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এসব বাধা দূর করতে প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা, যথাযথ বাজেট এবং প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন সক্ষমতা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু সরকারি ভবন নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক ভবনের ছাদকেও কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য সহজ অর্থায়ন, বিনিয়োগে প্রণোদনা, দ্রুত অনুমোদন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো শুধু বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের বিষয় নয়; এটি জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই সরকারি ভবনের ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নতুন স্থাপনা সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।