ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

স্তন ক্যান্সার : রোগের চেয়ে অবহেলা বেশি

আফিয়া আলম
স্তন ক্যান্সার : রোগের চেয়ে অবহেলা বেশি

স্তন ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়, কিন্তু সময়মতো শনাক্ত না হলে এ রোগ কেড়ে নিতে পারে জীবনের সম্ভাবনা। অথচ লজ্জা, ভয়, অসচেতনতা ও চিকিৎসার ব্যয় এই চার দেয়ালে আটকে অনেক নারী সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন না। ফলে যে রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে সফল চিকিৎসার সুযোগ বেশি, সেটিই অনেকের জীবনে পরিণত হয় গভীর সংকটের কারণ। প্রশ্ন হলো, স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতার কথা এত বলা হলেও প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আমরা কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি?

বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসার অন্যতম প্রধান ক্যানসার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা আইএআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে আনুমানিক ১২ হাজার ৯৮৯টি নতুন স্তন ক্যানসারের ঘটনা শনাক্ত হওয়ার হিসাব পাওয়া যায়। এটি প্রকৃত রোগীর পূর্ণাঙ্গ গণনা নয়; বরং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে করা একটি প্রাক্কলন। জনসংখ্যাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার নিবন্ধনের সীমাবদ্ধতা থাকায় দেশে রোগের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ এবং কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্র: আইএআরসি, গ্লোবোক্যান ২০২২।

স্তন ক্যানসার মূলত স্তনের কিছু কোষের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফলে সৃষ্টি হয়। বয়স বৃদ্ধি, পারিবারিক ইতিহাস, নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন, স্থূলতা এবং কিছু প্রজনন ও হরমোনজনিত বিষয় এর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিচিত ঝুঁকির কারণ না থাকলেও স্তন ক্যানসার হতে পারে। তাই শুধু বংশে ক্যানসারের ইতিহাস নেই বলে নিশ্চিন্ত থাকা কিংবা নিজেকে ঝুঁকিমুক্ত ভাবা বিপজ্জনক। লক্ষণকে অবহেলা, বিপদকে আমন্ত্রণ।

স্তনে নতুন কোনো পিণ্ড বা চাকা, স্তনের আকার কিংবা আকৃতিতে পরিবর্তন, ত্বকে টোল পড়া, কমলার খোসার মতো পরিবর্তন, বোঁটা ভেতরে ঢুকে যাওয়া কিংবা বোঁটা দিয়ে অস্বাভাবিক বা রক্তমিশ্রিত তরল বের হওয়া এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। বগলের নিচে নতুন পিণ্ড দেখা দিলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, সব পিণ্ড ক্যানসার নয়; আবার ব্যথা না থাকলেও ক্যানসার হতে পারে। লক্ষণ দেখা দিলে পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

সমস্যা হলো, অনেক নারী স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করেও চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। কেউ ভাবেন, ব্যথা নেই বলে বিপদের আশঙ্কাও নেই। কেউ আবার লোকলজ্জা, সামাজিক সংকোচ কিংবা পরিবারের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখেন। এই মানসিকতা রোগের ঝুঁকি কমায় না; বরং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে পারে। শরীরের পরিবর্তন নিয়ে সংকোচ নয়, সচেতন সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।

স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা মানে শুধু অক্টোবর মাসে গোলাপি প্রচারণা, আলোচনা সভা কিংবা পোস্টার প্রকাশ নয়। সচেতনতার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একজন নারী অস্বাভাবিক লক্ষণ চিনতে পারবেন, নির্ভয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা সহজে পাবেন। পরিবারকেও বুঝতে হবে, স্তন ক্যানসার নিয়ে কথা বলা লজ্জার নয়; বরং জীবন রক্ষার দায়িত্বশীল উদ্যোগ। নারীদের নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং নতুন কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

বয়স, ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত পরীক্ষা বা স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর সেটিকে শুধু নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের বিষয় ভেবে অপেক্ষা করা উচিত নয়। তখন প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং তামাক পরিহার সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক হলেও কোনো অভ্যাসই স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

স্তন ক্যানসার মোকাবিলায় সচেতনতার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ রোগ শনাক্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ অপেক্ষা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সীমিত প্রাপ্যতা, যাতায়াতের খরচ ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার চাপ রোগীকে বিপাকে ফেলে।

বিশেষত নিম্ন আয়ের পরিবারের কোনো নারী আক্রান্ত হলে চিকিৎসার ব্যয় পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতি নড়বড়ে করে দিতে পারে। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা বাড়ে।

রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি কিংবা লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। সব রোগীর চিকিৎসাপদ্ধতি এক নয়। তাই গুজব, অপচিকিৎসা কিংবা পরিচিত কারও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। ক্যানসার শনাক্ত হওয়া মানেই জীবন শেষ নয়; অনেক রোগী যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনেও ফিরে আসেন। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর মানসিক ও সামাজিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ত্রোপচার বা কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, শারীরিক পরিবর্তন, কর্মজীবনে বিঘ্ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ একজন রোগীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। এ সময়ে তাঁকে অবহেলা, করুণা কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য নয়; প্রয়োজন সম্মান, সহমর্মিতা ও বাস্তব সহায়তা।

ক্যানসার আক্রান্ত নারীকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা কিংবা তার স্বাভাবিক জীবনযাপনের সক্ষমতা নিয়ে আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়া অমানবিক।

স্তন ক্যানসার মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু নারীর নিজের নয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ সহজলভ্য করা, চিকিৎসার ব্যয় কমাতে কার্যকর সহায়তা দেওয়া, জেলা পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও রেফারেলব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য ক্যানসার নিবন্ধন ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। কতজন আক্রান্ত হচ্ছেন, কতজন দেরিতে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং চিকিৎসার সুযোগ কোথায় সীমিত এসব তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা কঠিন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কাছে সহজ ভাষায় রোগের লক্ষণ, চিকিৎসার সুযোগ ও সহায়তাব্যবস্থার তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। সচেতনতামূলক কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতটি সভা হয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং মানুষ কতটা সেবা পেয়েছে এবং সময়মতো চিকিৎসা নিতে পেরেছে কি না, তা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।

স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সময়মতো পদক্ষেপ। লজ্জা, ভয় ও অবহেলা দূর করতে হবে; পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা নাগালের মধ্যে আনার দায়িত্বও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সচেতনতার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের দায় শেষ হতে পারে না। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে কোনো নারী অর্থাভাবে, তথ্যের অভাবে কিংবা সামাজিক সংকোচে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন না। স্তন ক্যানসারকে ভয় নয়, অবহেলাকেই ভয় করতে হবে। কারণ সময়মতো শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধই পারে বহু জীবনের সম্ভাবনা রক্ষা করতে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত