ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মাদক নিয়ন্ত্রণ, একটি অভিযান ও অনেক প্রশ্ন

সাঈদ বারী
মাদক নিয়ন্ত্রণ, একটি অভিযান ও অনেক প্রশ্ন

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অংশ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবরের ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশ্ন ওঠে, মাদক নির্মূলের দায়িত্ব কি একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে সরাসরি অভিযানে নামা, নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর করার মাধ্যমে অপরাধ দমন নিশ্চিত করা? পরদিন এ নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয় এবং ১৯ অক্টোবর প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ঘটনাটি শুধু একজন জনপ্রতিনিধির আচরণ কিংবা তার পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে বাংলাদেশের মাদক সমস্যার গভীরতা, মাদক ব্যবসার বিস্তার এবং প্রচলিত ব্যবস্থায় এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রশ্ন। একজন প্রতিমন্ত্রী নিজ নির্বাচনী এলাকার মাদক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে সরাসরি অভিযানে নামার প্রয়োজন অনুভব করেছেন, তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অভিযোগও। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণের দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষের। কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সমাধান হতে পারে না। বরং এ ঘটনা থেকে প্রশ্ন ওঠা উচিত, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব যেসব সংস্থার, তাদের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে। মাদকাসক্তি এখন আর শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মাদক একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে। কখনও কখনও মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ অপরাধেও জড়িয়ে পড়েন। এর অভিঘাত পড়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মাদক গ্রহণের ঝুঁকি উদ্বেগজনক। এ বয়সে মাদকের সঙ্গে পরিচয় শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বিপন্ন করতে পারে। মাদকাসক্তির শুরু অনেক সময় হয় খুব সাধারণ একটি ঘটনা দিয়ে। বন্ধুর প্ররোচনা, নতুন কিছু চেষ্টা করার কৌতূহল কিংবা মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাউকে প্রথমবার মাদক গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। কেউ পারিবারিক অশান্তি থেকে পালাতে চান, কেউ বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তায় হতাশ হয়ে পড়েন, আবার কেউ নিজেকে বন্ধুদের কাছে সাহসী বা আধুনিক প্রমাণ করতে গিয়ে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রথমবারের সেই অভিজ্ঞতা যে একসময় নির্ভরশীলতায় রূপ নিতে পারে, তা অনেকে বুঝতে পারেন না। তবে মাদকাসক্তির কারণকে শুধু খারাপ বন্ধুবান্ধব বা নৈতিক শিক্ষার অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, মাদকের সহজলভ্যতা এবং অবৈধ মাদক ব্যবসার বিস্তার, সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে। তাই মাদক প্রতিরোধের উদ্যোগ হতে হবে বহুমাত্রিক। মাদক সমস্যার ব্যাপকতা বোঝার জন্য চিকিৎসা নেওয়া মানুষের পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৯ হাজার ৬৪১ জন মাদকনির্ভরশীল ব্যক্তি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ৭৬। অর্থাৎ চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।

তবে এ পরিসংখ্যান দিয়ে দেশে মোট মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। যাঁরা চিকিৎসা নিতে আসেন না, তাঁরা এ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে প্রকৃত চিত্র জানতে আরও বিস্তৃত ও হালনাগাদ গবেষণা প্রয়োজন। মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই নজর দিতে হবে সরবরাহব্যবস্থার দিকে। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ, দেশের ভেতরে পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও খুচরা বিক্রির সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। বড় কারবারিরা আড়ালে থেকে গেলে শুধু মাদক বহনকারী কিংবা সেবনকারীদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস, অপরাধী চক্রের যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

অভিযান কতটি হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কতটা মাদক সরবরাহ বন্ধ করা গেল এবং অপরাধী চক্রের কার্যক্রম কতটা দুর্বল করা গেল। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তা, অনিয়ম কিংবা মাদক ব্যবসায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। গেন্ডারিয়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কীভাবে ব্যবস্থা নেয়, কত দ্রুত নেয় এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হয়, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একজন জনপ্রতিনিধি যদি মনে করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তাহলে তার দায়িত্ব হবে প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অভিযান নিশ্চিত করা। অস্ত্র হাতে সরাসরি অভিযানে নামা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক, সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে।

মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোও এখন বড় প্রয়োজন। ২০২৫ সালে সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭ হাজার ১৫৯ জন, আর বেসরকারি কেন্দ্রে ৩২ হাজার ৪৮২ জন। আগের বছর সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ১৩ হাজার ২৪ জন। সরকারি ও বেসরকারি কেন্দ্রের এই পরিসংখ্যান চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা, ব্যয় ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি করে। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। তাই সরকারি নিরাময়কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা ও পরামর্শসেবা সম্প্রসারণ এবং চিকিৎসার মান নিশ্চিত করা জরুরি। চিকিৎসা মানে শুধু কিছুদিন নিরাময়কেন্দ্রে থাকা নয়। মাদকনির্ভরতা থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবারের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা। চিকিৎসার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ তৈরি করতে হবে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া তরুণদের আবার শিক্ষায় যুক্ত করা, কর্মদক্ষতা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে বর্জন করলে তার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু চিকিৎসার প্রয়োজন আছে এমন মানুষকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রতিরোধের কাজ শুরু করতে হবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, মানসিকভাবে কেমন আছে, আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না, সেদিকে অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে। তবে শুধু শাসন বা সন্দেহ নয়, সন্তানকে নিজের সমস্যা খুলে বলার মতো পরিবেশও দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের ক্ষতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক শিক্ষা, মানসিক পরামর্শ এবং সহপাঠীদের চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখানো প্রয়োজন। খেলাধুলা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণেরা সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক সামাজিক বন্ধনের মধ্যে বেড়ে উঠতে পারে। গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। মাদকবিরোধী প্রচারণা যেন শুধু বিশেষ দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। মাদকের ক্ষতি, চিকিৎসার সুযোগ, পুনর্বাসনের অভিজ্ঞতা এবং মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর উপায় সম্পর্কে মানুষকে নিয়মিত জানাতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে বিদ্রূপ, অপমান ও নেতিবাচক প্রচারণা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো নয়, বরং ঝুঁকি থেকে দূরে রাখা এবং বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে উৎসাহিত করা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-সহ প্রচলিত আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তবে আইন প্রয়োগের সাফল্য শুধু গ্রেপ্তার, মামলা কিংবা উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। দেখতে হবে, মাদক কতটা সহজলভ্যতা হারাল, তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার কতটা কমল, চিকিৎসা কতটা সহজ হলো এবং চিকিৎসা শেষে কতজন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলেন। এসব বিষয়ে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা হলে সরকারের উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করাও সহজ হবে। গেন্ডারিয়ার ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে। মাদক নির্মূলের দায়িত্ব যদি একজন প্রতিমন্ত্রীকে অস্ত্র হাতে মাঠে নামতে উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে প্রচলিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু সমাধান আরও বেশি অস্ত্র প্রদর্শন বা ব্যক্তিনির্ভর অভিযানে নয়। সমাধান হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর করা, মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মাদকনির্ভর মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দৃঢ় হতে হবে, কিন্তু মাদকাসক্ত মানুষকে সুস্থ জীবনে ফেরার সুযোগও দিতে হবে। কোনো একজন জনপ্রতিনিধির অভিযান নয়, বরং কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, দায়িত্বশীল সমাজ ও সচেতন পরিবারের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে মাদকের বিস্তার রোধ করতে।

লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত