ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নিরাপদ যাত্রায় নারী চালকের নতুন সম্ভাবনা

নিরাপদ যাত্রায় নারী চালকের নতুন সম্ভাবনা

নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় গণপরিবহন নারীদের চলাচল ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিন অসংখ্য নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পারিবারিক প্রয়োজনে গণপরিবহন ব্যবহার করেন। কিন্তু অনিরাপদ পরিবেশ, হয়রানির আশংকা এবং যাতায়াতের নানা সীমাবদ্ধতা এখনও অনেক নারীর জন্য বড় বাধা। এ বাস্তবতায় নারীদের জন্য বিশেষায়িত ইভি 'পিংক' বাস চালু এবং এসব বাস পরিচালনায় নারী চালক তৈরির উদ্যোগ একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বিনামূল্যে ভারী মোটরযান চালনার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুধু নিরাপদ যাতায়াতের উদ্যোগ নয়, এটি নারীর কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। দীর্ঘদিন ধরে ভারী যানবাহন চালনার পেশাটি প্রায় পুরোপুরি পুরুষনির্ভর। নারীদের এ পেশায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি সমাজে প্রচলিত ধারণা ভাঙার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হালকা মোটরযান চালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নারীদের ভারী যানবাহন চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। প্রশিক্ষণের মেয়াদ এক থেকে চার মাস এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী নারীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসব সুবিধা নারীদের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের পথে আর্থিক ও সামাজিক বাধা কমাতে সহায়ক হবে। প্রশিক্ষণ শেষে দক্ষ প্রার্থীরা ইভি পিংক বাস পরিচালনার সুযোগ পাবেন এবং ভবিষ্যতে যোগ্যতা অনুযায়ী বিআরটিসির স্থায়ী চালক পদেও অগ্রাধিকার পেতে পারেন।

এ উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যানবাহনের সঙ্গে নারীর কর্মসংস্থানের সংযোগ। ভবিষ্যতের পরিবহনব্যবস্থা ক্রমেই বিদ্যুৎনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। তাই নারী চালকদের আধুনিক যানবাহন পরিচালনায় দক্ষ করে তোলা ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের জন্যও একটি কার্যকর বিনিয়োগ। দেশে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দক্ষ নারী চালকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দক্ষ চালক তৈরির গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনা। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু নতুন সড়ক বা আইন করলেই হবে না; প্রয়োজন দক্ষ, দায়িত্বশীল ও প্রশিক্ষিত চালক। বিআরটিসির বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ তাই প্রশংসার দাবিদার। নারী চালকদের অন্তর্ভুক্তি এ কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে।

তবে পিংক বাস সার্ভিসের সাফল্য শুধু বাস চালু করলেই নিশ্চিত হবে না। নির্ধারিত রুট, পর্যাপ্ত বাস, নিয়মিত সময়সূচি, নিরাপদ স্টপেজ এবং যাত্রীবান্ধব সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। নারী চালকের পাশাপাশি বাসে নারী সহকারী ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে নারী যাত্রীদের আস্থা আরও বাড়বে।

সবচেয়ে বড় কথা, নারীদের কর্মসংস্থানকে কোনো বিশেষ সুবিধা হিসেবে নয়, বরং তাদের ন্যায্য অধিকার ও জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতি ও সমাজ উভয়ই লাভবান হবে। ইভি পিংক বাসের জন্য নারী চালক তৈরির উদ্যোগ সেই পথেই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কার্যকর প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এ উদ্যোগকে সফল ও সম্প্রসারিত করা এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত