ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পুড়েছে স্বপ্ন, কান্না-হাহাকার

পুড়েছে স্বপ্ন, কান্না-হাহাকার

ঢাকার মহাখালী কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই পুড়ে গেছে দেড় হাজার ঘর। গত মঙ্গলবার বিকাল ৫টার দিকে আগুন লাগে বস্তিতে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট দীর্ঘ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ক্ষতির পরিমাণ ছিল ভয়াবহ। আগুনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন নিম্নআয়ের হাজার হাজার মানুষ। জীবনের সব সঞ্চিত স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় এখন খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্তরা পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই নিজেদের ঘরের ধ্বংসস্তূপে ফিরে সামান্য যা অবশিষ্ট আছে তা সংগ্রহের চেষ্টা করেন। কারও কারও হাতে কেবল অর্ধদগ্ধ কিছু কাপড়, ভাঙা জিনিসপত্র- আর কিছুই নেই। চারদিকে কেবল ধ্বংসস্তূপ, কংক্রিট, টিন আর পোড়া কাঠের গন্ধ- আগুন তাদের প্রায় সবকিছুই গ্রাস করে নিয়েছে। কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের আশ্রয়, জীবন ও স্বপ্নের সবটুকু ভরসা মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায় ভয়াবহ আগুনের লেলিহান শিখায়। সব হারিয়ে কান্না- আহাজারিতে ভেঙে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা; চোখের সামনে পুড়ে যাওয়া জীবন আর স্বপ্নের ভার সামলানোই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। আগুনে সর্বস্ব হারানো মানুষের বুকফাটা কান্না- আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে কড়াই বস্তির আকাশ-বাতাস। পোড়া ভস্মের পাশে দাঁড়িয়ে ফিরে দেখার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই কড়াইল বস্তিবাসীর।

কড়াইল বস্তিতে দেড় হাজার ঘর ভস্মীভূত : ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের চেষ্টায় দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় পর নিয়ন্ত্রণে আসে রাজধানীর মহাখালী এলাকায় কড়াইল বস্তির আগুন। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দেড় হাজারের মতো ঘর পুড়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। গত মঙ্গলবার বস্তিতে আগুন লাগার পর প্রথমে সাতটি ইউনিট পাঠানো হলেও আগুনের তীব্রতা বাড়ায় ধাপে ধাপে ইউনিট সংখ্যা বাড়ানো হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ইউনিট বাড়িয়ে করা হয় ১৬টি, পরে আরও তিনটি যোগ হয়ে মোট ১৯টি ইউনিট কাজ শুরু করে। রাত ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

রাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের ইন্সপেক্টর আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে। তবে তদন্ত শেষে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ ও আগুনের উৎস জানা যাবে। কেউ হতাহত হয়েছে- এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। গতকাল বুধবার ভোরের আলো ফুটতেই রাজধানীর কড়াইল বস্তির ভয়াবহ আগুনের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপনে ঠাঁই হয় বহু পরিবারের।

কড়াইল বস্তির আগুন ১৬ ঘণ্টা পর সম্পূর্ণ নিভলো : রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন ১৬ ঘণ্টা পর সম্পূর্ণ নিভিয়েছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, কড়াইল বস্তির আগুন নির্বাপণ সম্পন্ন হয়েছে আজ সকাল সাড়ে ৯টায়। আগুনে কোনও হতাহত নেই। আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। অপরদিকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর রাত কেটেছে টিঅ্যান্ডটি মাঠ, খামারবাড়ি মাঠে। স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো ঘরে পুড়েছে। অন্তত দুই হাজার লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটিয়েছে। এতো মানুষের জন্য তো কিছু করা যায় না। তারপরও আমরা স্থানীয়রা যতটুকু পারছি করছি।’

‘একটি কাপড়ও বাঁচাতে পারিনি, বাচ্চাটাকে কীভাবে রাখবো?’ : আগুনে সর্বস্ব হারানোর পর পাশের একটি অক্ষত দোকানে বসে থাকা আইরিনের মুখে গভীর ট্রমার ছাপ। গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা সেই চেহারা বলে দিচ্ছে রাতের ভয়াবহতা। চারদিকে পোড়া গন্ধ, ঘরবাড়ির ছাই আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে তাকে। পাশে সেলাই মেশিনের টেবিলে কাপড়ের থান দিয়ে বালিশ বানিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন আড়াই বছরের ছেলে আইমানকে। আগুনে চারটি কক্ষ ভস্মীভূত হওয়ার পর পরিবারটি এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব। আতঙ্কিত আইরিন বললেন, ‘এখন কোথায় যাবো? একটা কাপড়ও বাঁচাতে পারিনি। বাচ্চাটাকে কীভাবে আগলে রাখবো? আইরিনের শ্বশুর আব্দুর রশিদ বলেন, আমি বাড়িতে ছিলাম না। যখন খবর পেলাম তখন আর ভেতরে ঢুকতে পারিনি। সকালে এসে দেখলাম, চারপাশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আমাদের ঘরের প্রতিটি জিনিস— টেবিল, আলমারি, বিছানার চাদর, কাপড়, এমনকি শিশু আইমানের খেলনা—সবই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সঞ্চয়, সংগ্রহ করা জিনিসপত্র সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি।

চোখের পলকেই আগুন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে জানিয়ে আব্দুর রশিদের প্রতিবেশি রাজিব হোসেন বলেন, চোখের পলকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে ছোট একটি আগুন দেখেছিলাম, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ঘর লেলিহান শিখায় জড়িয়ে যায়। চারদিক ধোঁয়া আর আগুনে অন্ধকার হয়ে আসে। তখন আর কিছু বাঁচানোর মতো সময় ছিল না। প্রাণ বাঁচাতে সবাই কোনো রকমে বাইরে বেরিয়ে আসি। কেউই কল্পনা করতে পারেনি এত দ্রুত সব শেষ হয়ে যাবে। বাইরে এসে দাঁড়িয়ে শুধু আগুনে পুড়তে থাকা ঘর দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।

ক্ষতিগ্রস্তদের সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস প্রধান উপদেষ্টার : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক ঘর-বাড়ি পুড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় অসংখ্য পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়াকে ‘সকলের জন্য বেদনাদায়ক’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এক বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ‘কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ডে যেসব পরিবার গৃহহীন হয়েছেন, তাদের দুঃখ-কষ্ট আমাদের সকলের জন্য বেদনার। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করবে।’ তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা।

কড়াইল বস্তিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা তারেক রহমানের : কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারেক রহমান তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে গতকাল বুধবার এক পোস্টে বলেন, ‘২৫ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মহাখালী কড়াইল বস্তিসহ সংলগ্ন এলাকা ভয়াবহ আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। দমকল বাহিনীর পক্ষে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হচ্ছে। ইতোমধ্যে আগুনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে আমরা এখনও সঠিকভাবে অবগত হতে পারছি না। তবে অনেকের বাড়ীঘর পুড়ে গেছে বলে জানা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও এলাকাবাসীর আগুন নেভাতে প্রাণপন প্রচেষ্টার প্রতি পূর্ণ সংহতি জ্ঞাপন করছে। তাদের এই প্রচেষ্টা দেশবাসীকে এক নতুন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করেছে।’

তিনি আশা করে বলেন, ‘এই ভয়ংকর আগুনের ব্যাপ্তির দ্রুতই পরিসমাপ্তি ঘটবে। কোন জীবনহানি যাতে না ঘটে আমি সেজন্য মহান আল্লাহ’র নিকট মোনাজাত করছি। আমি এই বিপজ্জনক অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। তারা এই কঠিন সময়ে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশা রাখি।’

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কড়াইল বস্তি পরিদর্শন করেন জামায়াত আমির : রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন, তাদের খোঁজ-খবর নেন এবং সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে অবহিত হন। এ সময় জামায়াত আমিরের সঙ্গে ছিলেন- ঢাকা মহানগরী উত্তর মেডিকেল থানা সভাপতি ও ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামান, জামায়াত আমিরের পার্সোনাল সেক্রেটারি নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকের (মঙ্গলবার) আগুনে মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য নিম্নআয়ের মানুষের বসতঘর, জীবিকা ও সামান্য সঞ্চয় সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে এখন কঠিন মানবিক সংকটের মুখোমুখি। প্রাণহানি না ঘটলেও, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানো একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কান্না, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার এই দৃশ্য আমাদেরকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। জামায়াত আমীর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে প্রত্যেক পরিবারকে দুটি করে কম্বল ও কিছু খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন।’ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে আমরা তাদের পাশে থাকব এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হব, ইনশাআল্লাহ। তিনি আরও বলেন, মূলত সরকারেরই উচিত বিভিন্ন দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। জরুরি ভিত্তিতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত সকলকে নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, কাপড়, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র আমির আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার, বিভিন্ন এনজিও, সাহায্যকারী সংস্থা ও সমাজের বিত্তবানরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এগিয়ে আসবে। বস্তিবাসীরা সাধারণত নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ- এ কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত যে এ রকম জনবহুল এলাকায় কেন বারবার অগ্নিকাণ্ড ঘটছে এবং এর মধ্যে কোনো নাশকতা বা সাবোটাজের উপাদান রয়েছে কি-না। তিনি অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান জামায়াত আমির।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত