ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বেকায়দায় জামায়াত

বেকায়দায় জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাত্র ২৭ দিন বাকি থাকলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের সংসদীয় আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। উল্টো দলগুলোর ভেতরে আসন সমঝোতা নিয়ে চরম সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। জোটের কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই গতকাল বুধবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নতুন জোট গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে।

জানা গেছে, ইসলামপন্থী দল হিসেবে প্রথমে আট দলীয় রাজনৈতিক জোটের ‘এক বাক্সে’ ভোট টানার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এই প্রক্রিয়ায় যোগ দেয়। এতে সংসদীয় আসন ভাগাভাগি নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এমনকি গতকাল বুধবার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা হলে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সেটি স্থগিত হয়। এ ব্যাপারে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের কারণ জানতে জোটের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় এক সিনিয়র নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মূলত জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে সৃষ্ট জটিলতার কারণে এ সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন সংবাদ সম্মেলনে আসতে চায়নি বলেও জানান তিনি।

জানা গেছে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ‘এক বাক্সে’ ভোট টানতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় লিয়াজোঁ কমিটি একাধিক বৈঠক করে। দলগুলোর শীর্ষপর্যায়ের নেতারা পারস্পরিক দীর্ঘ আলোচনা করেও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি। বরং জোট এখন ভাঙনের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কঠোর অবস্থানের কারণে জামায়াতে ইসলামী এখন চরম বিপাকে পড়েছে; যা দলটির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, গত সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, আগামী দু-এক দিনের মধ্যে ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা দৃশ্যমান হবে। সেই অনুযায়ী গতকাল আসন সমঝোতা স্পষ্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসায় জোটে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

জোটে অচলাবস্থার পেছনে প্রাথমিকভাবে তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রথমত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অতিরিক্ত সংসদীয় আসন দাবি। দলটির নেতৃত্বের দাবি, দেশব্যাপী তাদের শক্তিশালী ভোটব্যাংক রয়েছে। এ কারণে তারা জামায়াতের প্রস্তাবিত ৪০ আসনের বাইরে আরও বেশি আসন চায়। এমনকি জামায়াত অতিরিক্ত কিছু আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দিলেও তাতে রাজি হয়নি চরমোনাই পীরের দল। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন দলটি বাস্তব অবস্থানের তুলনায় বেশি আসন দাবি করছে। ফলে তাদের সঙ্গেও জামায়াতের চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। শেষ পর্যন্ত এই দুই দল আলাদা নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিতে পারে বলেও আলোচনা চলছে। সেক্ষেত্রে তাদের থাকা না থাকার পুরো বিষয়টিই চরমোনাইয়ের পীরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে জানা গেছে। তৃতীয়ত, জোটে নতুন দল যুক্ত হওয়ার পর শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়া। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন আট দলীয় ইসলামি জোটে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এলডিপি ও এবি পার্টি যুক্ত হয়ে ১১ দলীয় জোট গঠিত হলে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে অস্বস্তি বাড়ে। এনসিপিকে ৩০টি আসন ছেড়ে দেওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে অন্যান্য ইসলামি দলের দরকষাকষির ক্ষমতা কমে গেছে বলে তারা মনে করছে।

সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, আসন সমঝোতা নিয়ে গত মঙ্গলবার ঢাকায় জামায়াতের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। বৈঠকে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। ওই দিন রাতেই ইসলামী আন্দোলনের শুরা কাউন্সিল বৈঠক হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস গতকাল বুধবার সকালে শুরা কাউন্সিলের বৈঠক করেছে।

দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, প্রাথমিক আসন সমঝোতার ভিত্তিতে চরমোনাইয়ের পীর ও মামুনুল হকের দলের প্রার্থীদের বিপরীতে এক ডজনেরও বেশি আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াতে ইসলামী। সেক্ষেত্রে সমঝোতা না হলে ওই আসনগুলোয় কীভাবে প্রার্থী সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে জামায়াত চিন্তিত রয়েছে। আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। আসন সমঝোতার আলোচনায় থাকা ইসলামী আন্দোলন শুরু থেকে শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। তবে আলোচনার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে আসনের চাহিদা কমিয়েছে দলটি। সর্বশেষ তাদের দাবি ছিল ৫০টির বেশি আসন। তবে জামায়াত দলটিকে ৪০টি আসন ছাড় দিতে চায়। এটি নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। দলের একটা অংশ মনে করে, ৪০ থেকে ৪৫টি আসনে সমঝোতা হতে পারে। তবে দলের বড় অংশই মনে করে, কাঙ্ক্ষিত আসন না পেলে সমঝোতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, গত সোমবার জামায়াতের সঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বৈঠক হয়েছে। তবে দলটি যে পরিমাণ আসন চায়, জামায়াত ততটা ছাড় দিতে রাজি নয়। তাদের দল ২৫ থেকে ৩০টি আসন চায়; কিন্তু জামায়াত সর্বোচ্চ ২০টি আসন ছাড় দিতে পারে। কাঙ্ক্ষিত আসন না পেলে যে আসনগুলোতে সমঝোতা হবে না, সেখানে তারা প্রার্থী উন্মুক্ত রাখতে চায়।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ বলেন, ‘আসন সমঝোতা নিয়ে এখনও আগের অবস্থানেই আছে জামায়াত। জামায়াতের সঙ্গে আবার বৈঠক হবে, সেখানে কত আসনে সমঝোতা হচ্ছে তা স্পষ্ট হতে পারে। জামায়াতকে বলা হয়েছে, শরিক সবার সঙ্গে আলোচনা করে জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে যেন সংবাদ সম্মেলন করা হয়।’

জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবিতে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে রাজপথে সরব ছিল জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ৮টি রাজনৈতিক দল। পরে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে গত ডিসেম্বরে যুক্ত হয় এনসিপিসহ আরও তিনটি দল। তবে শেষে যুক্ত হওয়া তিনটি দল নিয়ে কিছুদিন যাবৎ টানাপোড়েন চলছে জোটটির অভ্যন্তরে। এমতাবস্থায় জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সামনের সারির নেতাদের নিয়ে গঠিত এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৫টির বেশি, খেলাফত আন্দোলনকে ১০টি, এলডিপিকে ৭টি, এবি পার্টিকে ৩টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে ২টি আসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে জাগপা, নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত আন্দোলনের আসন নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সবাই বলছে এটি ১১ দলীয় জোট। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা একবারও ১১ দলের যৌথ বৈঠক হতে দেখিনি। এতে আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, এনসিপি ও এবি পার্টি মিলে ৫০টি আসন চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৫টি এনসিপির জন্য এবং ১৫টি এবি পার্টির জন্য। পরে দেখি তারা আলাদাভাবে এনসিপি ও আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। এতে আমরা আমাদের অসন্তোষ জানাই।

নতুন জোটের ইঙ্গিত ইসলামী আন্দোলনের : জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতা যখন জটিলতায়, তখন নতুন জোটের ইঙ্গিত দিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। তিনি বলেন, ‘২০ জানুয়ারি হলো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। এই সময়ের আগপর্যন্ত যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।’ গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। গাজী আতাউর রহমান আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন যে, তারা সামনে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার গঠন করার জন্য আলোচনা করবেন। জামায়াতের আমির বলেছেন, খালেদা জিয়া ঐক্যের যে পাটাতন তৈরি করেছিলেন, তার ওপরে দাঁড়িয়ে তারা আগামীতে রাষ্ট্র চালাবেন। অথচ সেই ঐক্যের পাটাতন খালেদা জিয়ার জীবদ্দশাতেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এটি ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে সংশয় তৈরি করেছে। জামায়াতের জোটে বিভাজন বিএনপিকে সুবিধা করে দেবে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা তো স্বাভাবিক। তবে এর দায় আমাদের নয়।’ তিনি আরও জানান, ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে অনেকের সঙ্গেই তাদের আলোচনা চলছে। যারা ইসলামী আন্দোলনের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাদের নিয়ে তারা পথ চলবেন।

সমঝোতার সুযোগ এখনও রয়েছে : জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা পুরোপুরি ভেস্তে গেছে- এমন পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি বলে জানান ইসলামী আন্দোলনের এই মুখপাত্র। তিনি বলেন, নির্বাচনী আসন সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা কাউকে বের করে দেওয়ার মতো অবস্থা এখনও তৈরি হয়নি। ইসলামী আন্দোলন জাতীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। নানা প্রতিকূলতা থাকলেও ন্যূনতম সমঝোতা যাতে থাকে, সেই চেষ্টা তারা করে যাবেন। তবে কারও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ইসলামী আন্দোলন মেনে নেবে না। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট আলাদা করার দাবিতে তার আগে থেকেই রাজপথে কর্মসূচি পালন করছিল জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ইসলামি দল। পরবর্তীতে এই জোটে এনসিপি, এলডিপি এবং এবি পার্টি যুক্ত হয়ে ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়। এই জোটের সম্ভাব্য ভাঙন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত