
২০০৮ সালে কারামুক্ত হয়ে লন্ডনে চলে যান শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। এরপর প্রায় দেড়যুগ কাটাতে হয় নির্বাসনে।
অবশেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন বিএনপির এই কান্ডারী। দেশে ফিরেই দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করার কথা তুলে ধরে সেটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা চেয়েছেন তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান ফর দ্য পিপল, ফর মাই কান্ট্রি।’ এরপর থেকেই তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এ কি আছে তা জানার আগ্রহ দেখা দিয়েছে দেশবাসীর কাছে। ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এ কি আছে তা তারেক রহমান নিজেই আস্তে আস্তে প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বেশ কিছু প্ল্যান তুলে ধরেন। আগামীতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি জনগণের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেবে বলে জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, রাজনীতি শুধু সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সংবিধান ও আইন সংস্কারের পাশাপাশি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান ভবিষ্যতে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনার বেশ কিছু চিত্র তুলে ধরেন। নারী উন্নয়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কল্যাণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কারকে তিনি দলের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। প্রচারণার অংশ হিসেবে সারাদেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারেক রহমান। বিভিন্ন জনসবায় তিনি তার প্ল্যানের নানা বিষয় তুলে ধরছেন। এসব প্ল্যান ও ৩১ দফাসহ আরও বেশ বিছু বিষয় নিয়ে খুব শিগগিরই বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও ফ্যামিলি কার্ড : তারেক রহমান বলেছেন, আগামী নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি জানান, দেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে এবং প্রতিটি পরিবারের নারীদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। তার ভাষায়, এ কার্ড হবে সর্বজনীন। এর মাধ্যমে নারীরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন। তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। তাদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছিলেন, আর বিএনপি আগামী দিনে নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে চায়।
কৃষক কার্ড ও কৃষি খাতে সহায়তা : কৃষি খাত প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছেন, দেশে সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত জমির মালিক কৃষকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অতীতে বিএনপি সরকার কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিল। আগামীতে কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এ কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণে ভর্তুকিসহ নানা সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে কৃষকরা উৎপাদনে উৎসাহ পান এবং কৃষি খাত আরও শক্তিশালী হয়।
স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ : স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের বিষয়ে তারেক রহমান জানিয়েছেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তমণ্ডএ নীতিতে বিএনপি কাজ করতে চায়। ইউরোপের দেশগুলোর আদলে বাংলাদেশে কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা হবে। তিনি জানান, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ নারী হবেন। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা, পুষ্টি ও জীবনযাপন বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। একই সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও তারা ভূমিকা রাখবেন। তারেক রহমান বলেন, দেশের সম্পদ সীমিত, তাই জনসংখ্যাকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা জরুরি।
প্রবাসী কল্যাণ ও জনশক্তি রপ্তানি : প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেছেন, প্রতিবছর প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ বিদেশে গেলেও তাদের বড় অংশই অদক্ষ। ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মী পাঠানো গেলে জনশক্তি রফতানি থেকে আয়ের পরিমাণ অনেক বাড়বে। তিনি বলেন, ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, ইউরোপ ও চীনের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বন্ড সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
আইটি পার্ক ও তরুণদের কর্মসংস্থান : তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও আইটি খাতের বিকাশে বিএনপির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেছেন, দেশের আইটি পার্কগুলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ছোট অফিস স্পেস ও ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা দেয়া হবে। তিনি বলেন, অনেক ফ্রিল্যান্সার বাসা বা মেসে বসে কাজ করেন। তাদের জন্য ব্যবসায়িক ঠিকানা ও কর্মস্পেস নিশ্চিত করা গেলে তারা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন। পেপ্যালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের জটিলতা দূর করতেও কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও সংস্কার : গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান জানিয়েছেন, জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার ও ট্রেড বডি-সব ক্ষেত্রেই নিয়মিত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্র ও জবাবদিহির চর্চা থাকলেই দেশের সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, বিএনপি ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চায় না। হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি। সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কার তিন ভাগে বিভক্ত- সাংবিধানিক, আইনগত এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা। এতদিন সাংবিধানিক ও আইনগত সংস্কার নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবন, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। তারেক রহমান বলেন, এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আরও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি থাকা জরুরি, কারণ মানুষের প্রকৃত প্রত্যাশা এখানেই নিহিত।
ঢাকার পানি সংকট সমাধানে সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা : তারেক রহমান বলেছেন, পানির সমস্যা। এখন যেভাবে চলছে এভাবে চললে আমার ধারণা, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর হার্ডলি ২০ বছর পর ঢাকা শহরে কোনো জায়গা থেকে পানি আমরা পাব না। আমাদের বুড়িগঙ্গা নদী সম্পূর্ণ রকম পলিউটেড, ১০০ শতাংশ পলিউটেড। শীতলক্ষ্যা নদী ৫০ শতাংশের মতো পলিউটেড। এখন মেঘনা নদী থেকে পানি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, কয়েকটা প্রজেক্টে কাজ হচ্ছে। কিন্তু এটার পানিও আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে পলিউটেড হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে যে সাড়ে তিন কোটির মতো মানুষ বাস করছে; এরা পানি পাবে না। পানির অপর নাম জীবন। সারা দেশে যদি এ সমস্যা শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি কত ভয়াবহ হতে পারে তা নিয়ে এখন আলোচনা হওয়া উচিত। সেটি সংসদে হোক, বিভিন্ন সেমিনারে হোক। কারণ তা না হলে একটি ভয়াবহ ভবিষ্যৎ আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে হয়তবা হুইচ ইজ ভেরি আনওয়ান্টেড।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি সকলকে অনুরোধ করব, দলমত নির্বিশেষে আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে; কিন্তু আমরা যদি চেষ্টা করি তাহলে সেটি মতপার্থক্যের মধ্যে রেখে আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান হয়তো বের করে আনতে সক্ষম হব। কিন্তু কোনোভাবেই সেটি যাতে মতবিভেদের পর্যায়ে চলে আসে। মতবিভেদ হলে জাতিকে বিভক্ত করে কী হতে পারে আমরা দেখেছি। আজ সেজন্যই অনেকের মুখে অনেক হতাশার কথা আমরা শুনি; কিন্তু তারপরও আশার কথা হচ্ছে- তাদের কাছে ভবিষ্যতের চিন্তাও আছে, পরিকল্পনাও আছে।’
তারেক রহমান দেশে ফিরেই বলেছিলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, মার্টিন লুথার কিং এর নাম শুনেছেন না আপনারা? নাম শুনেছেন তো আপনারা? মার্টিন লুথার কিং, তার একটি বিখ্যাত ডায়লগ আছে, আই হ্যাভ এ ড্রিম। আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সকলের সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে আমি বলতে চাই, আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি। তিনি বলেন, ‘আজ এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য যদি সেই প্ল্যান, সেই কার্যক্রম, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয়। এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন, এই সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি যত মানুষ উপস্থিত আছেন, প্রত্যেকটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে। এরপর তিনি বলেন, আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন, আপনারা যদি আমাদেরকে সহযোগিতা করেন, ইনশাআল্লাহ আমরা ’আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। ১৫ মিনিটের বক্তৃতা শেষ করে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাত নেড়ে সবাইকে স্বাগত জানান।
দলীয় সূত্রমতে, তারেক রহমানের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এবং সেই সময় খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন তিনি সেগুলোর দেখভাল করেছিলেন। তবে দলের রাজনীতিতে তার শক্ত প্রভাব শুরু হয়ে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এরপর ২০০৯ সালে দলের সম্মেলনে তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পরপরই তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করে বিএনপি। সবশেষ সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকে তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।