
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিকে জয়ী করতে সকলকে ‘একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ মাঠে এক নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান এই আহ্বান করেন। তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ হয়েছিল। তরুণ-যুবক যারা তারা আপনারা বইয়ের পাতায় পড়েছেন, মরুব্বি যারা আছে, আমাদের বয়সী যারা আছে তারা দেখেছেন, জানেন সেই যুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, সেই যুদ্ধে বহু মানুষ শহিদ হয়েছিল। পরবর্তীতে ২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে এই দেশের ছাত্র-জনতাসহ সব শ্রেণির পেশার মানুষ। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, সেই একাত্তর সালের যুদ্ধই হোক, ২৪-এর আন্দোলনই হোক, কে পাহাড়ি মানুষ, কে সমতলের মানুষ, কে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষ এটি; কিন্তু কেউ দেখেনি। রাজপথে সবাই পাশাপাশি আন্দোলন করেছে, একাত্তর সালে যুদ্ধে সবাই একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে। কে মুসলাম, কে খ্রিষ্টান, কে অন্য ধর্মের মানুষ কেউ দেখেনি। এবারও ১২ তারিখে নির্বাচনে আমাদের সবাইকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ একসঙ্গে থাকতে হবে। তারেক রহমান এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, আমরা যদি একসঙ্গে থাকি, আমরা যেভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আমরা যদি একসঙ্গে থাকি আমরা যেভাবে স্বৈরাচার বিদায় করেছি, আমরা যদি ইনশাআল্লাহ সামনের দিনে একসঙ্গে থাকি তাহলে অবশ্যই এই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশের দিকে নিয়ে যেতে পারব। তিনি বলেন, সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হয় তাহলে স্লোগান হবে একটাই। সেটা হলো- করব কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। সবার মনে রাখতে হবে, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তারেক রহমান বলেন, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই জনগণের শাসন কায়েম করা সম্ভব হবে, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আসুন, আমাদের আজকে শপথ হোক, আমরা এই বাংলাদেশকে জনগণের বাংলাদেশে পরিণত করব, আমরা বাংলাদেশকে জনগণের বাংলাদেশে রূপান্তরিত করব। শেষ কথার এককথা, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।
জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ্য করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, একটি দল স্বৈরাচার দলটির (আওয়ামী লীগ) মতো ভাষা ব্যবহার করছে। তারা বলে, বিএনপি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। আমার প্রশ্ন-২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাদেরও দুজন সদস্য বিএনপি সরকারে ছিলেন। বিএনপি যদি এত খারাপই ছিল, তাহলে ওই দুজন ব্যক্তি কেন পদত্যাগ করে সরে আসেননি? তারেক রহমান আরও বলেন, ?‘ওই দুজন সদস্য বিএনপি সরকারে থাকা অবস্থায় পদত্যাগ করেননি। কারণ তারা জানতেন খালেদা জিয়া কঠোর হস্তে দুর্নীতি দমন করেছেন।’ ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুরে বহু সমস্যা রয়ে গেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘নদীভাঙন সমস্যা আছে, কর্মসংস্থানের সমস্যা আছে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ব্রিজ, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, কালভার্টের সমস্যা রয়ে গেছে। যেগুলো দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সংস্কার বা নতুন করে করার দরকার ছিল। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। না হওয়ার কারণ ভোটের অধিকার ছিল না। যদি ভোটের অধিকার থাকত, তাহলে জনগণের সমস্যা সমাধান হতো। যেহেতু নিশিরাতে তথাকথিত নির্বাচন হয়েছিল, তাই তখন সত্যকারের জনপ্রতিনিধি ছিল না। তাই যুবক সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি’ তিনি বলেন, ‘তরুণ-যুবকরা চায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। দেশে মিল-ফ্যাক্টরি হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য হবে, যাতে তারা নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরি করতে পারে। মানুষ চায় অসুস্থ হলে যেন চিকিৎসা সুবিধা পায়।’
ময়মনসিংহে কৃষকদের অনেক সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘ময়মনসিংহের মাছের পোনা অনেক সরবরাহ করা হয়। আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে কী করে মাছের পোনার বিষয়টি শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ না রেখে বিদেশেও রপ্তানি করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত ফ্রি করেছিল। সেই মা-বোনেরা শিক্ষিত হয়েছে। এখন আমরা যে কোনো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, দেখব সমান সংখ্যক মেয়ে লেখাপড়া করছে। আজ জনসংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি নারী। আমরা দেশকে যদি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে দেশের জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সেজন্য খেটে-খাওয়া নারী, গৃহিণী ও মা-বোনদের একটি ফ্যামিলি কার্ড দিতে চাই। যাতে এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের কাছে অল্প হলেও সুবিধা পৌঁছাতে পারে। এতে তারা প্রতি মাসের কয়েকটি দিন হলেও স্বাচ্ছন্দ্যে অতিবাহিত করতে পারবে।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘একইভাবে মৎস্য চাষি, খেত-খামারে চাষবাস করেন এরকম কৃষক ভাইদের পাশেও আমরা দাঁড়াতে চাই। সেজন্য কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। কারণ, দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষক। কৃষক ভালো থাকলে বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে কীভাবে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হয়। বিএনপির অভিজ্ঞতা রয়েছে কীভাবে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে হয়, কীভাবে শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হয়। বিএনপির অভিজ্ঞতা রয়েছে কীভাবে মানুষকে নিরাপদে রাখতে হয়।’
মাদক সমস্যা সমাধান করতে হলে যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই যুবকদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য আমরা ময়মনসিংহ বিভাগের জেলা হাসপাতালগুলো বড় করতে চাই। বিএনপি সরকার গঠন করলে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী মাসের ১২ তারিখ কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে চলে আসলে চলবে না, ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে।’
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন- একটি রাজনৈতিক দল, যারা এখন পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের মুখের ভাষা ব্যবহার করে বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলছে। তাদের দাবি, বিএনপি নাকি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। আমার প্রশ্ন হলো, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারে ওই দলটিরও তো দুইজন সদস্য (মন্ত্রী) ছিলেন। বিএনপি যদি এতোই খারাপ হতো, তবে তারা কেন তখন পদত্যাগ করে চলে আসেননি?
বক্তব্যের মাঝপথে তারেক রহমান ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি সংসদীয় আসনের ধানের শীষের প্রার্থীদের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ৪টা ২৬ মিনিটে উপস্থিত জনতাকে সালাম জানিয়ে বক্তব্য শুরু করেন এবং ৪টা ৫২ মিনিটে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে বক্তব্য শেষ করেন। এরপর তার গাড়িবহর গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়।
তারা হলেন- ময়মনসিংহ-১ আসনের সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, ময়মনসিংহ-২ আসনের মোতাহের হোসেন তালুকদার, ময়মনসিংহ-৩ আসনের এম ইকবাল হোসেইন, ময়মনসিংহ-৪ আসনের আবু ওয়াহাব আখন্দ ওয়ালিদ, ময়মনসিংহ-৫ আসনের জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ-৬ আসনের আখতারুল আলম, ময়মনসিংহ-৭ আসনে মাহবুবুর রহমান, ময়মনসিংহ-৮ আসনে লুতফুল্লাহেল মাজেদ, ময়মনসিংহ-৯ আসনে ইয়াসের খান চৌধুরী, ময়মনসিংহ-১০ আসনে আখতারুজ্জামান বাচ্চু, ময়মনসিংহ-১১ আসনের ফকর উদ্দিন আহমেদ, নেত্রকোনা-১ আসনের কায়সার কামাল, নেত্রকোনা-২ আসনের আনোয়রুল হক, নেত্রকোনো-৩ আসনের রফিকুল ইসলাম হেলালী, নেত্রকোনা-৪ আসনের লুৎফুজ্জামান বাবর, নেত্রকোনা-৫ আসনের আবু তাহের তালুকদার, জামালপুর-১ আসনের রশিদুজ্জামান মিল্লাত, জামালপুর-২ আসনের সুলতান মাহমুদ বাবু, জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, জামালপুর-৪ আসনের ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম, জামালপুর-৫ আসনের শাহ মো. ওয়ারেস আলী মামুন, নেত্রকোনা-১ আসনের কায়সার কামাল, নেত্রকোনা-২ আসনের আনোয়রুল হক, নেত্রকোনো-৩ আসনের রফিকুল ইসলাম হেলালী, নেত্রকোনা-৪ আসনের লুৎফুজ্জামান বাবর, নেত্রকোনা-৫ আসনের আবু তাহের তালুকদার, শেরপুর-১ আসনের সানসিলা জেবরিন, শেরপুর-২ আসনের মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী, শেরপুর-৩ আসনের মাহমুদুল হক রুবেল।
ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে : ভোর বেলা ভোট কেন্দ্রের সামনে লাইন করে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘ভোট শুরু হবে, সঙ্গে সঙ্গে ভোট দেওয়া ইনশাআল্লাহ শুরু করবেন। কিন্তু ভোট দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসলে চলবে না।’ ‘কি করা লাগবে? ভোট কেন্দ্রের সামনে থাকতে হবে। কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিয়ে আসবে। কেনো একথাটা বললাম, বহু বছর হয়ে গেছে আমরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। যেহেতু আমরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। এর আগে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ভোট লুটপাট করে নিয়ে গিয়েছে। এবার আমাদের সজাগ থাকতে হবে। যাতে করে কেউ আমাদের ভোট লুটপাট করে নিয়ে যেতে না পারে।’
উপস্থিত জনগণের উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেন, ‘পারবেন তো পাহারা দিয়ে সর্তক থাকতে।’ সমস্বরে সবাই হ্যাঁ বললে তারেক রহমান বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ’।
নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, সকলের জন্য স্বাস্থ্য কার্ড, বেকার সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থাসহ সরকার গঠন করলে কী কী করতে চান তার একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধানের শীষের প্রার্থীদের জন্য ভোট চান তিনি।