ঢাকা বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রাখা হবে না, শাসন হবে জনগণের

* পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে চাইলে আমরাও কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব * গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদী, আর ‘না’ মানে গোলামি * জামায়াত ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করবে * মোস্তাফিজকে আইপিএলে খেলতে না দেওয়া ‘চরম অপমানজনক’
সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রাখা হবে না, শাসন হবে জনগণের

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির পেছনে মূলত দুটি দুষ্টচক্র দায়ী একটি চাঁদাবাজি, অন্যটি সিন্ডিকেট। আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি, আল্লাহ যদি আমাদের সুযোগ দেন, তাহলে প্রথমেই চাঁদাবাজের হাত শক্ত করে ধরে ফেলব, এরপর সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেব। কোথাও কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রাখা হবে না। শাসন হবে জনগণের শাসন। গতকাল মঙ্গলবার সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আয়োজনে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।

তিনি বলেন, আমরা জামায়াতে ইসলামের বিজয় চাই না, আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। ১৮ কোটি মানুষ মুক্ত হলে আমরাও মুক্ত। আর ১৮ কোটি মানুষ যদি বিপদে পড়ে যায়, তাহলে আমরাও বিপদে পড়ে যাব।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সামনে দুটি বিষয় আছে একটি গণভোট, আরেকটি সাধারণ নির্বাচন। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদী, আর ‘না’ মানে গোলামি। আপনারাই বলুন গোলামি না আজাদি? গোলামি না আজাদি? ইনশাআল্লাহ, এ দেশের মানুষ আজাদি চায়। আমাদের যুবসমাজ আজাদি চায়। বুক পেতে দিয়ে তারা লড়াই করে প্রমাণ করেছে অন্যায়, দানবীয় শক্তি কিংবা আধিপত্যবাদের কাছে বাংলাদেশের যুবসমাজ কখনও মাথা নত করবে না। তিনি বলেন, সাতক্ষীরাকে সাড়ে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। সৎ মায়ের সন্তানের মতো আচরণ করা হয়েছে। আমরা আপনাদের কাছে আহ্বান জানাই সাতক্ষীরার চারটি আসন, ইনশাআল্লাহ যদি আপনারা আমাদের উপহার দেন, তাহলে ন্যায় ও ইনসাফ কায়েমের জন্য, জনগণের সরকার কায়েম করার জন্য, দ্বীনদার সরকার প্রতিষ্ঠা এবং মদিনার শাসনামলের মতো সুশাসন কায়েম করার জন্য আমরা সারাটা সময় চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। আপনাদের সমস্যাগুলো আপনাদের সঙ্গেই আলোচনা করে সমাধান করা হবে। উপর থেকে কিছুই চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ যদি তার মেহেরবানিতে আপনাদের ভালোবাসা ও সমর্থনে সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তাহলে কোনো শিক্ষিত চোরের হাত আপনাদের কোনো অংশ খেয়ে ফেলতে পারবে না। খেতে দেওয়া হবে না।

জামায়াত আমির বলেন, দেশের যুবকরা এরইমধ্যে রায় দিয়ে জানিয়েছেন আমরা ইনসাফের পক্ষে, পরিবর্তনের বাংলাদেশের পক্ষে। পাঁচটি সর্ববৃহৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই তা প্রমাণ করেছে। যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা তোমাদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিতে চাই না। আমরা চাই তোমাদের হাতকে দেশ গড়ার কারিগরের হাত হিসেবে গড়ে তুলতে। সম্মানের কাজ সৃষ্টি করে সেই কাজ তোমাদের হাতে তুলে দিতে চাই, যেন তোমরা আত্মগর্বের সঙ্গে বলতে পারো আমরা এই দেশের গর্বিত নাগরিক। সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। চারটি আসনের প্রার্থীদের হাতে নির্বাচনি প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দিয়ে উপস্থিত জনতাকে তাদের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।

পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে চাইলে আমরাও কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব : ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল একদিকে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে, অন্যদিকে মায়েদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। অনেকে পুরাতন ফ্যাসিবাদের অ্যাপ্রোন গায়ে দিতে চায়। আপনাদের কালো হাত আর তুলবেন না। আপনারা পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে চাইলে আমরাও ছেড়ে দেব না। কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব।’ জামায়াত আমির বলেন, ‘জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ নয়, বরং বন্ধ মিল-কারখানা চালু করার পাশাপাশি নতুন শিল্প গড়ে তোলা হবে। দেশবাসী যদি আমাদের দায়িত্ব দেয়, আমরা জনগণের সঙ্গে বসে ডায়ালগের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করব।’ মঙ্গলবার খুলনা সার্কিট হাউসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খুলনা মহানগর ও জেলা শাখা আয়োজিত নির্বাচন জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের জুলুমণ্ডনির্যাতনের কথা উল্লেখ করে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দেশবাসী আমাদের নিরাপত্তা দিয়েছিল। মায়েরা-বোনেরা আমাদের খাবার জোগাড় করেছিল। আমরা আপনাদের কাছে ঋণী। সরকারে গিয়ে আমরা দেশবাসীর সে ঋণ শোধ করতে চাই। মা, মাটি ও মানুষ আমাদের হাতে নিরাপদ।’ একটি দলের জুলুমণ্ডনির্যাতনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ঘাড়ে হাত, পিঠে চাবুক মারতে পারবেন; কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থান পাবেন না।’

জামায়াত ক্ষমতায় এলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে : গত সোমবার রাতে মাগুরা জেলা জামায়াত আয়োজিত মাগুরা আদর্শ ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে একটি ফ্যাসিস্ট সরকার এই জাতিকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি ধ্বংসপ্রায়। বিচার বিভাগ কার্যত ভেঙে পড়েছে। সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক, বিমা, করপোরেট সেক্টর ও শিল্প খাত সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ব্যাপক লুটপাটের মাধ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্র ও জনগণ আজ চরম ক্ষতির মুখে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রতি বছর নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জনগণের সামনে পেশ করতে বাধ্য থাকবেন। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষের জন্যই আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব। আইনের চোখে সবাই সমান থাকবে। যে অপরাধে একজন পিয়নের বিচার ও শাস্তি হবে, একই অপরাধ করলে প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেও একই বিচার ও একই শাস্তি কার্যকর হবে, ইনশা আল্লাহ।

মোস্তাফিজকে আইপিএলে খেলতে না দেওয়া ‘চরম অপমানজনক’ : ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি অপরাধ ও অন্যায় করা হয়েছে সাতক্ষীরায়। দেশের আর কোনো জেলায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়নি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) খেলতে না দেওয়ার ঘটনাকে দেশের ক্রিকেটের জন্য ‘চরম অপমান’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরিবর্তনের স্রোত দেখে তাদের মাথা গরম হয়ে গেছে : জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে স্রোত তৈরি হয়েছে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে, পরিবর্তনের পক্ষে, বস্তাপচা রাজনীতির বিপক্ষে, দুর্নীতির বিপক্ষে, ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে, জুলুমতন্ত্রের বিপক্ষে, মা-বোনদের বেইজ্জত করার বিপক্ষে আর ইজ্জত দেওয়ার পক্ষে। কিছু মানুষের এ অবস্থা দেখে মাথা গরম হয়ে গেছে।’

যশোর ও সাতক্ষীরায় জনসভায় যোগদানের পর বিকেলে খুলনায় ঐতিহাসিক সার্কিট হাউস মাঠে নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। খুলনার ছয়টি আসনের ১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি।

জনসভায় বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের একটি বন্ধু সংগঠন ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছে, এটা মায়েদের হাতে দেবেন। তারা এক দিকে দিচ্ছেন ফ্যামিলি কার্ড, আরেক দিকে আমার মায়ের গায়ে হাত দিচ্ছেন। এ দুটি একসঙ্গে চলে না। দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে- এ দেশের মানুষ, মাটি ও সম্পদ, ইজ্জত কার কাছে নিরাপদ। সেটা এখন আর কারও কাছে বুঝতে বাকি নেই।’

খুলনার শিল্প ও কৃষি নিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘খুলনা অঞ্চলে একসময় কৃষি ও ইন্ডাস্ট্রি সমানতালে পাল্লা দিত। দুটিই এখন শেষ। জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে, লবণাক্ত পানির কবলে পড়ে, দফায় দফায় বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ঢোকার কারণে আজ এখানকার কৃষকদের বিধ্বস্ত অবস্থা।

শিল্পের কথা তো আগেই বলেছি। আল্লাহ যদি এই দেশকে খেদমতের দায়িত্ব আমাদের দেন, আমরা কথা দিচ্ছি- আপনাদের সঙ্গে বসে, আপনাদের সঙ্গে ডায়ালগ করে কোন কোন কাজ আগে করলে এ দেশের উন্নয়ন হবে, তা আমরা ঠিক করব।

অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আপনাদের সম্পদ আপনাদের হাতে তুলে দেব। এটা আমাদের বাপ-দাদার সম্পদ হবে না, সম্পদ হবে জনগণের। প্রতিটি সম্পদের বাজেটের জবাব নেওয়ার অধিকার আপনাদের নিশ্চিত করা হবে।’ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও হানাহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘আজ বিভিন্ন জায়গায় হামলা শুরু হয়ে গেছে। মাথা গরম হয়ে গেছে। এখন মাঘ মাস, এখন মাথা গরম হলে চৈত্র মাসে কী করবেন? এখন আরামদায়ক বাতাস আছে, আবহাওয়া আছে- এখন মাথা গরম করাবেন না। জনগণের রায়ের প্রতি আস্থা রাখুন। অতীতে জনগণের রায়কে যারা সম্মান করেনি, তাদের পরিণতি কী হয়েছে, তা থেকে আমাদের সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত