ঢাকা রোববার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মার্কিন যুদ্ধজাহাজের কাছে তাজা গুলির মহড়া ইরানের

মার্কিন যুদ্ধজাহাজের কাছে তাজা গুলির মহড়া ইরানের

গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের কাছে তাজা গুলির মহড়া দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। আজ রোববার থেকে দুইদিনের এ মহড়া শুরু করবে দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি)। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও অত্যাধুনিক রণতরী আব্রাহাম লিঙ্কনকে মোতায়েনের পর মহড়া দিতে যাচ্ছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনকে উস্কানি ও উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখছে তেহরান।

ইরান এ মহড়া দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড কড়া সতর্কতা দিয়েছে। তারা বলেছে, ইরান যদি ঝুঁকিপূর্ণ কোনো মহড়া দেয় তাহলে তারা এটি সহ্য করবে না। ঝুঁকিপূর্ণ মহড়া হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে, তাদের যুদ্ধজাহাজের খুব কাছ দিয়ে বিমান বা ড্রোন উড়ানো এবং যুদ্ধজাহাজের কাছে ইরানি নৌবাহিনীর স্পিডবোড আসা।

গত এক মাস ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সহায়তার অজুহাতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ ও সেনা জড়ো করেছে মার্কিনিরা।

এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিচ্ছেন, ইরানকে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। তিনি বলেছেন, ইরান যদি সময় মতো চুক্তি না করে তাহলে দেশটিতে হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরান পাল্টা হুমকি দিয়েছে। দেশটি বলেছে তাদের ওপর ছোট বা বড় যেকোনো হামলাই চালানো হোক না কেন, এর জবাবে তাৎক্ষণিক এবং শক্তিশালী হামলা চালানো হবে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। একই সঙ্গে মিসাইলের আঘাত হানার দূরত্বও কমানোর দাবি করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু গতকাল শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন তারা তাদের মিসাইল ও প্রতিরক্ষা নিয়ে কখনও আলোচনা করবেন না।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইউরোপকে দায়ী করলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট : ইরানের সম্প্রতি সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইউরোপীয় দেশগুলো উত্তেজনা উসকে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে এমনটাই দাবি জানিয়েছেন পেজেশকিয়ান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ইউরোপীয় নেতারা ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সুযোগ নিয়ে বিভাজন উসকে দিয়েছেন। তাদের কারণে কিছু নিরীহ মানুষ এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে।

পেজেশকিয়ান আরও বলেছেন, এটি শুধু একটি সামাজিক বিক্ষোভ ছিল না। ইরানের অর্থনৈতিক সংকটকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি শক্তিগুলো দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং দেশটিকে ‘ভাঙনের পথে’ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা অব্যাহত রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প সামরিক বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করছেন, যদিও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া দুই সপ্তাহব্যাপী দেশজুড়ে বিক্ষোভের সূচনা হয় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের পর বিক্ষোভ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এই দমন-পীড়নে অন্তত ৬ হাজার ৫৬৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬ হাজার ১৭০ জন বিক্ষোভকারী এবং ২১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তুরস্কের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ১০০, যার মধ্যে ২ হাজার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন রণতরীর সামনেই ইরানের মহড়া : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মার্কিন রণতরী আব্রাহাম লিংকনসহ বেশ কিছু সামরিক সরঞ্জাম ওই অঞ্চলে মোতায়েন করার প্রতিবাদে এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনে ইরান হরমুজ প্রণালিতে দুই দিনব্যাপী সরাসরি গুলিবর্ষণসহ নৌ-মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে। আজ রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া এ মহড়াকে কেন্দ্র করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চরম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে।

ইরানের এ ঘোষণার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করেছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ওপর দিয়ে ইরানি ড্রোন বা বিমানের উড্ডয়ন কিংবা দ্রুতগামী ইরানি স্পিডবোটের মাধ্যমে সংঘর্ষের উসকানি দেওয়ার মতো যে কোনো ‘অনিরাপদ’ কর্মকাণ্ড তারা কোনোভাবেই সহ্য করবে না।

কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের অব্যাহত হুমকি এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে কূটনৈতিক পর্যায়েও তৈরি হয়েছে এক ধরনের ধোঁয়াশা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তার দেশ একটি ‘ন্যায্য ও সঠিক’ আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান দাবিগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল এবং মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিয়ে কোনো অবস্থাতেই কোনো সমঝোতা হবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর চাপ ও সামরিক সমাবেশের মুখে ইরানের এই অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত