
জীবন মানে সংগ্রাম, যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বিজয় লাভের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ধৈর্য। ধর্মীয় জীবনে ধৈর্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ধৈর্য মানে ‘হারা না মানা’। জীবনযাত্রায় নানা সমস্যা, বাধা-বিপত্তি আসবে, বিপদ আপদে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে; যারা বিপদ-আপদের কাছে হার মানবে, নিস্তেজ হতাশ পড়বে, তাদের জীবনে ব্যর্থতার একেকটি অধ্যায় লেখা হবে। আর যারা চরম বিপদের মুহূর্তে অস্থিরতা দেখাবে না, শান্তভাবে কৌঁসুলি হবে, ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে, জীবনযুদ্ধে তারাই বিজয়ী হবে। ইসলাম এমন মানুষই চায়।
পৃথিবীতে এমন কোনো সফল মানুষ নেই, যার জীবনে কোনো না কোনো বিপদ আসেনি এবং তিনি ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেই বাধা অতিক্রম করেননি। পৃথিবীর বুকে আলোচিত প্রতিষ্ঠিত লোকদের কানে কানে জিজ্ঞেস করলে তারা নিশ্চয়ই বলবেন, ‘প্রথম জীবনে আমরা নানা ব্যর্থতা, বিপদ-বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলাম; সেই বিপদ-বিপর্যয়ে হার মানিনি, ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি, হয়তো যা চেয়েছিলাম তা পাইনি; কিন্তু এমনকিছু পেয়েছি যা জীবনে কল্পনাও করিনি।’ এই বয়ান পৃথিবীর সব প্রতিষ্ঠিত মানুষের কাছ থেকেই শুনতে পাবেন। এ ক্ষেত্রে মহাপুরুষদের অভিজ্ঞতা আরও বিস্ময়কর। হযরত সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! মানুষের মধ্যে কারা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীসে নবীজি বললেন, নবীগণ। এরপর তাদের নিকটবর্তী সৎকর্মশীলরা। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যরা।’ অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষকে তার ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়।
ইসলাম চায় মানুষের মধ্যে ধৈর্যের গুণের উন্মেষ হোক। কারণ, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে ধৈর্যের গুণে গুণান্বিত হতে হবে। এমনকি যে যতখানি ধৈর্যশীল হবে, সে ততখানি সফলকাম হবে। এজন্য কোরআন মজীদে অসংখ্য আয়াতে ধৈর্যের গুণ অর্জনের কথা বলা হয়েছে। সূরা ওয়াল আসর-এ বলা হয়েছে ‘সকল মানুষ লোকসানের মধ্যে নিমজ্জিত; তবে তারা নয়, যারা ঈমানের বলে বলিয়ান, সৎকর্ম আঞ্জাম দেয় এবং যারা সত্যের পথে পরস্পরকে উপদেশ দেয় এবং যারা পরস্পর ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়।’ কোরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াত পর্যালোচনায় যে সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলো যারা আল্লাহর উপর সুদৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারী তারাই, যারা জীবনযুদ্ধে ধৈর্যের পারাকাষ্ঠা দেখাতে পারে এবং তারাই সফলকাম, তারাই বিজয়ী। আল্লাহ পাক বলেন, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৪৬) শুধু তাই নয়, যারা ঈমানের পথে ধৈর্যধারণ করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ। বলা হয়েছে ‘...তাদেরই ধৈর্যের কারণে জান্নাতের সুউচ্চ প্রাসাদে পুরস্কৃত করা হবে।’ ( সূরা আল ফুরকান, আয়াত-৭৫)
মোমিন জীবনে ধৈর্য ও অবিচলতার উৎকর্ষ সাধনের বাস্তব প্রশিক্ষণের মাসব্যাপী আয়োজন রমজান। নবী করীম (সা.) বলেছেন, রমজান হলো ধৈর্যের মাস। আর ধৈর্যের সরাসরি প্রতিদান হলো জান্নাত। রমজানে মাসব্যাপী এই ধৈর্যের পরীক্ষা হয় দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। দুনিয়ার প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণের মূল উদ্দীপক পেটের ক্ষুধা আর যৌন ক্ষুধা। এই দুই ক্ষুধা নিবারণের জন্যই জীবনযুদ্ধ চলছে অবিরাম গতিতে। রমজানের রোজায় এই দুটি আকর্ষণের মুখে লাগাম পরানো হয়।
একশ্রেণির মানুষের জীবন দর্শন হলো, ‘দুনিয়া কা মজা লে লও দুনিয়া তোমারী হ্যায়।’ রমজানের সিয়াম সাধনা এই দর্শন প্রত্যাখ্যান করে বলে, ‘দুনিয়া কু লাত মারো দুনিয়া সালাম করে।’ হে মানুষ পানাহারের বা যৌন আকর্ষণের ক্ষুধা তোমাকে গ্রাস করতে পারবে না; বরং তুমিই এই দুই ক্ষুধার মুখে লাগাম পরাবে। এর জন্যই রমজানে ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা নাগাদ মাসব্যাপী পানাহার ও যৌন ক্ষুধা পরিহারের অনুশীলন হয়, যাতে এর নিয়ন্ত্রণ রোজাদারের সম্পূর্ণ হাতের মুঠোয় চলে আসে।
এই নিয়ন্ত্রণই জীবনে সাফল্য এনে দেবে। আল্লাহপাক বলেন, ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমে (তাহলে সাহায্য পেয়ে যাবে; কারণ ) আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ -(সূরা বাকারা, আয়াত- ১৫৩)
আল্লাহ পাক পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, আমি অবশ্যই তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আপনি ধৈর্যশীলদের শুভসংবাদ দিন; যারা তাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তার দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৫৫,১৫৬)।