
হযরত নবী করীম (সা) বলেছেন, ‘রমজান এমন এক মাস, যে মাসে মোমিনের রিজিক বৃদ্ধি করা হয়।’ রমজানে মু‘মিনের রিজিক বৃদ্ধি করা হয়- এ বাণীর তাৎপর্য অনেক গভীর ও ব্যাপক। রিজিক বলতে সচরাচার আমরা মনে করি, খাদ্য ও পানীয়; তখন প্রশ্ন জাগে, দিনের বেলা পানাহার ত্যাগ করার সাধনার নাম যেখানে রোজা; সেখানে রমজানে রিজিক বৃদ্ধি পাওয়ার মর্ম কী? তবে রিজিক-এর সঠিক অর্থ সামনে রাখলে আমাদের মনে এ ধরনের প্রশ্নের উদয় হত না।
রিজিক মানে জীবিকা। যাকিছু খেয়ে পরে মানুষ জীবন যাপন করে তার নাম জীবিকা। জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় সব সহায়-সামগ্রি রিজিক বা জীবিকার অন্তর্ভুক্ত। রিজিক মানে খাদ্য ও পানীয় মনে করা হোক, কিংবা জীবিকা নামকরণ করা হোক, সমাজের অর্থব্যবস্থার সাথে তার সম্পর্ক অনেক গভীর ও নিবিড়।
রমজানে মুসলিম সমাজের সদস্য মু‘মিন বান্দারা যখন রোজা রাখে তখন সমাজের অর্থনীতির চাকা নানাভাবে গতিশীল হয়। কারণ, সামর্থ্যবান রোজাদাররা ব্যাপকভাবে গরীব দুঃখীদের মাঝে দান-খায়রাত করে; বিশেষ করে ইসলামের শুরু থেকে সম্পদের যাকাত আদায় করার রেওয়াজ চলে আসছে রমজান মাসে। রমজানে যে কোনো সৎকাজের সওয়াব ৭০ থেকে ৭০০ গুণ বৃদ্ধি পায়, হাদীসের এই ঘোষণাকে বুকে ধারণ করে অর্থশালী মুসলমানরা রমজানেই যাকাত আদায় করে থাকেন, যা সমাজের অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করে। ঈদের কেনাকাটার মহাধুমধাম আমাদের গোটা অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করে। এসব কর্মতৎপরতার ফলশ্রুতিতে বান্দার রিজিক বৃদ্ধি পায়।
‘আমার সামনে হরেক রকম সুস্বাদু খাদ্য মজুদ আছে, অথবা ভোগ-বিলাসের সবরকম সহায় সামগ্রির জোগাড় আছে; কিন্তু অসুখ-অরুচির কারণে কোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করতে পারছি না, শারীরিক যন্ত্রণায় সবকিছু দুর্বিসহ হয়ে গেছে’ নিশ্চয়ই এমন খাদ্য পানীয় বা সহায় সামগ্রিকে জীবিকা নামে আখ্যায়িত করা যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বিজ্ঞান কঠিন খাদ্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকে।
একমাসকাল রোজার মাধ্যমে এই খাদ্যনিয়ন্ত্রণ রোজাদারের মজ্জাগত হয়ে যায়। রোজার মাধ্যমে প্রত্যেক মু‘মিন বান্দা নগদ যে মুনাফা অর্জন করে তা হলো তার স্বাস্থ্য পরিচর্যা। আমাদের অধিকাংশ জটিল রোগের কারখানা, শরীরের রগরেশায় জমে থাকা চর্বি বা মেদ। মাসব্যাপী উপবাস পালন সেই মেদ চর্বি অপসারণ করে; বলতে গেলে শরীরের অতি গোপন কক্ষ বা কোণা কিংবা চিপায় চিপায় ঝাড়ু দেয়। বছরে একবার শরীর নামক মেশিনটির এই সার্ভিসিং-এর গুরুত্ব কেউ অস্বীকার করতে পারে না। এ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে স্বীকার করতে হবে যে, রমজানে মু‘মিন বান্দার রিজিক বৃদ্ধি করা হয়।
যে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য অর্থব্যবস্থা, মানব দেহে রক্ত সঞ্চালনের মতো। শরীরে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হলে জীবন প্রবাহ থেমে যায়, নানা রোগ-শোকের ভাগাড়ে পরিণত হয় দেহ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূলকথা শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি বা স্বাভাবিক করতে হবে। সমাজ ব্যবস্থাকেও সচল গতিশীল করার উপায় হল, সমাজ ও রাষ্ট্রের রক্ত প্রবাহতুল্য অর্থনীতিকে গতিশীল করা। রমজানে ধনীরা যাকাত দেয়, ফিতরা দেয়, গরীব দুঃখীদের প্রতি সদয় হয়, আরো বিভিন্ন প্রকার দান খয়রাত করে, তাতে সমাজের অর্থনীতি সচল হয়।
সমাজে জীবন-জীবিকায় সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার কারণ ধনী গরীবে দূরত্ব, ব্যবধান, শ্রেণি সংগ্রাম। একটি শ্রেণি ভোগের রাজ্যে ডুবে থাকে আরেকটি শ্রেণি দারিদ্র্যের কষাঘাতে অভাবের ঘানি টানে। এখান থেকে জন্ম নেয় জুলুমণ্ডশোষণ, কালোবাজারি, দূর্নীতি, চাঁদাবাজি। রমজানে ত্যাগের চেতনায় পুরো সমাজ যখন উজ্জীবিত হয়, সুন্দর মন ও চরিত্রের সুষমায় সমাজব্যবস্থা যখন জেগে ওঠে, তখন দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মজুতদারি, জুলুম শোষণের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণার সৃষ্টি হয়, যা সমাজের অর্থনৈতিক গতিশীলতায় বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করে।
শোনা যায়, পশ্চিমা দেশগুলোতে তাদের ধর্মীয় উপলক্ষগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেয়া হয়। অথচ আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টা।
প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা, আড়ত মালিকেরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রি মজুদ করে কৃত্রিম চাহিদা ও সংকট সৃষ্টি করে মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়। শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের মজুদদারী সম্পূর্ণ হারাম। মজুদকৃত সম্পদ সম্পূর্ণ দান করে দিলেও এই গোনাহ মাফ হবে না। বাজার সিন্ডিকেট-এর সমস্ত আয় হারাম। এই হারামখোর অনেকে ঈদের আগে আগে যাকাতের শাড়ী-লুঙ্গী বিতরণের মহড়া দিয়ে তাদের কৃত পাপ মোচনের ব্যর্থ চেষ্টা করে।
এসব ক্ষেত্রে ইসলামের হালাল হারামের বোধ ও চেতনা সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা ও মিডিয়ার মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারই পারে এই উদ্যোগ গ্রহণ করতে। মজুতদারি, ওজনে ঠকানো, ব্যবসায় মিথ্যা ও ধোঁকা প্রভৃতির কুফল ও ভয়াবহ পরিণতির কথা কুরআন মজীদ ও হাদীস শরীফে অত্যন্ত দরদমাখা ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলে আমাদের জাতীয় চরিত্রই পাল্টে যাবে, তখন রমজানে মু‘মিনের রিজিক বৃদ্ধি পায় - এ কথা প্রমাণ করার জন্য যুক্তি-বিন্যাসের প্রয়োজন পড়বে না।