
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের সর্বত্র ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। বিরতিহীনভাবে চলছে হামলা। গতকাল বুধবার রামাল্লা থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি জানান, ইসরায়েলে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
স্পষ্টত, ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে অথবা ইন্টারসেপ্ট করতে গিয়ে এমন শব্দ আসতে পারে বলে জানান তিনি। বেত শেমিশ এলাকায় পরিচালিত হামলাটি আগের চেয়ে বেশ বড় আকারের বলে জানায় আলজাজিরা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে বড় পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক ছোড়া হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো এই হুমকি প্রতিহত করতে কাজ করছে। সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জনগণকে আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশ করতে এবং পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ‘কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়ার পরই নিরাপদ স্থান থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।’ হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য বলা হয়েছে নির্দেশনায়। আলজাজিরার প্রতিবেদক জানিয়েছেন, কেন্দ্রস্থল এবং উত্তরাঞ্চলে হামলার পরিধি বিস্তৃত হলেও প্রায় পুরো ইসরায়েলেই এই সতর্কতা জারি করেছে সরকার। এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গতকাল বুধবার জানিয়েছে, তারা লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ছোড়া বেশ কিছু প্রজেক্টাইল শনাক্ত করেছে। এগুলোর বেশিরভাগই প্রতিহত করা হয়েছে, তবে একটি আঘাত হেনেছে বলে স্বীকার করেছে তারা। ইরানি হামলা শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই এই হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। প্রতিরোধ সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা ভোরে ইসরায়েলের মেতুলা শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর রকেট নিক্ষেপ করেছেন। হাইফার নৌ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরপরই এই নতুন হামলার কথা জানান তারা।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আঘাত : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে সফলভাবে হামলা চালিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিবৃতি অনুযায়ী, ইরান সীমান্ত থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে ভারত মহাসাগরের গভীরে এই হামলা চালানো হয়।
আইআরজিসি জানিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি যখন একটি জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজ থেকে জ্বালানি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলায় তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘কাদির-থ্রি-এইট-জিরো’ এবং ‘তালাইয়েহ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। হামলায় একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার এবং একটি জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তারা। প্রত্যক্ষদর্শী বা বিভিন্ন সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, হামলার সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে এবং জাহাজগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে অকেজো হয়ে পড়ে।
কাতারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ : নতুন করে হামলা হয়েছে কাতার, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোাতে। কাতারে আবার বিকট বিস্ফোরণের শব্দ হয়েছে; সেটি ইরানি হামলার কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরান থেকে কাতারের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের মধ্যে একটি প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও অন্যটি আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম সামরিক স্থাপনা, যেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনাসদস্য অবস্থান করেন। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে; ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। গতকাল হামলা হয়েছে সৌদি আরবেও। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আল-খারাজে দুটি ক্রুজ মিসাইল প্রতিহত করার কথা বললেও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে কিছু জানায়নি। এর কিছুক্ষণ আগে ইরান থেকে যাওয়া নয়টি ড্রোন প্রতিহত করার কথা বললেও কোনো ড্রোন আঘাত হেনেছে কিনা, তা জানানো হয়নি।
আবার আক্রান্ত কুয়েত : নতুন করে হামলা হয়েছে কুয়েতেও। হামলায় হতাহতের খবর দিয়েছে সংবাদমাধ্যম। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল বুধবার ভোরে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা বেশ কিছু ‘শত্রুভাবাপন্ন আকাশযান’ তাদের বাহিনী প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকাশপথে এই ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আবাসিক ঘরবাড়ির ওপর গিয়ে পড়েছে, যার ফলে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় বিস্তারিত আর কোনো তথ্য প্রদান করেনি। কুয়েতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এদিন সকালে ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক কিশোরীর মৃত্যুর খবর জানানোর পরই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা এলো।
আমিরাত উপকূলে জাহাজে ইরানের হামলা : সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে জাহাজে হামলার খবর দিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্র্যাকার। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও গতকাল বুধবার জানিয়েছে, একটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক সতর্কবার্তায় সংস্থাটি বলেছে, ‘আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে ৭ নটিক্যাল মাইল পূর্বে একটি ঘটনার রিপোর্ট পেয়েছে তারা। জাহাজের ক্যাপ্টেন জানিয়েছেন, একটি অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে জাহাজের স্টিল প্লেটিং বা বহিরাবরণ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি জানান, জাহাজে কোনো আগুন লাগেনি বা পানি প্রবেশ করেনি। ওমান উপকূলে আরেকটি জাহাজে হামলার ঘটনার খবর দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই ইউকেএমটিও-র পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
দুবাইয়ে মার্কিন দূতাবাসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাসে হামলার পর দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। দুবাই মিডিয়া অফিসের বরাত দিয়ে এমন খবর প্রকাশ করেছে আলজাজিরা। দুবাই মিডিয়া অফিস মঙ্গলবার রাতে জানায়, ‘দূতাবাসের আশেপাশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা জরুরি টিমের তৎপরতায় দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আলজাজিরার যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, দুইবাইয়ে হামলার পর ধোঁয়া উঠছে। এর আগে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে হামলার খবর পাওয়া গিয়েছিল। ইরাকের রাজধানী বাগদাদের বিমানবন্দরেও একটি মার্কিন স্থাপনায় হামলার খবর এসেছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, একটি ড্রোন বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের লজিস্টিক সাপোর্ট ক্যাম্প লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
৩৫ মার্কিন ড্রোন ধ্বংস করল ইরান : ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আগ্রাসী মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনীর আরও ছয়টি উন্নত ড্রোন ধ্বংস করেছে। এ নিয়ে সাম্প্রতিক যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৩৫টি ড্রোন ধ্বংস করল ইরান। তেহরানে অবস্থিত খাতামুল আম্বিয়া ঘাঁটি এবং ইস্ফাহান, কাসর শিরিন, তাব্রিজ ও খুজেস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মঙ্গলবার ছয়টি শত্রু ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিমানবাহিনী এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট আমেরিকাণ্ডইসরায়েলের আর্কিও নাইনটিন, হেরন, হার্মেস, অরবিটারসহ বিভিন্ন মডেলের পঁয়ত্রিশটি উন্নত ড্রোন ধ্বংস ও ভূপাতিত করেছে। একটি সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শত্রুপক্ষের ৬৮০ জন নিহত- ইরান : আইআরজিসি মঙ্গলবার রাতে জানিয়েছে, তাদের হামলায় শত্রুপক্ষের এ পর্যন্ত ৬৮০ জন নিহত হয়েছেন। বাহিনীর মুখপাত্র বলেছেন, আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত থাকবে। আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাঈনি চলমান ট্রু প্রমিজ ফোর সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করে বলেন, পরবর্তী হামলা হবে আরও বেদনাদায়ক, আরও ভয়ঙ্কর। সম্প্রতি আমরা ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছি, যা ট্রু প্রমিজ থ্রি-র চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এসব ক্ষেপণাস্ত্র এরইমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত যে শক্তি নিয়ে আঘাত হেনেছি, সে সম্পর্কে শত্রুরা আগে কল্পনাও করতে পারেনি এবং তারা বিস্মিত হয়েছে। অনেক বড় বিজয় আমাদের অতি সন্নিকটে অপেক্ষা করছে উল্লেখ করে মুখপাত্র আরও বলেন, ইরানের শত্রু সম্পর্কে সচেতন ইরানি জনগণকে আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি, শহীদ পাকপুর থেকে শুরু করে আমাদের অন্য সহযোদ্ধারা শহিদ হলেও শত্রুকে পরাস্ত না করা পর্যন্ত আমরা প্রতিশোধ নেওয়া অব্যাহত রাখব। তিনি বলেন, শত্রুরা মনে রাখার মতো উপযুক্ত শিক্ষা পাবে এবং প্রতি মুহূর্তে ইসরায়েল ও আমেরিকার জন্য জাহান্নামের দরজা প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর হবে।
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের ধারণা ভুল ছিল : ওয়াশিংটনের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউজের মার্কিন নেতারা এখন ধীরে ধীরে এটা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে, ইরানিদের ব্যাপারে তারা আগে যা ভেবেছিলেন তার বিপরীতে দীর্ঘ যুদ্ধ এবং কঠিন সামরিক চাপ সহ্য করতে প্রস্তুত ইরানিরা। এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি লিখেছে, ইরানের সামরিক কাঠামো এবং সরকার ব্যবস্থা এমন যে, তেহরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের হত্যার পরও ইরানিরা মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশে সমন্বিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ থেকে তাদের সহ্য ক্ষমতা, সমন্বয় ও শৃঙ্খলার প্রমাণ পাওয়া যায়, যেটাকে ট্রাম্প প্রশাসন হাল্কা করে দেখেছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান এ পর্যন্ত শত শত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে এবং বিশ্বের জ্বালানি বাজারে দ্রুত এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে তেলে দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া, বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি সরবরাহের স্থান হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের তেল সরবরাহকারী জাহাজের বিমা কোম্পানিগুলো এর পরিণতির ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। ফরেন পলিসি লিখেছে, ইরানের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ক্রমেই প্রকাশ পাচ্ছে। যার অর্থ হচ্ছে- চাপ, ব্যয় এবং সামরিক সক্ষমতার ভারসাম্য ইরানের অনুকূলে গড়াচ্ছে।
হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র- ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল : মার্কিন সংবাদপত্র ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান থেকে ছোঁড়া ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল বহর মোকাবিলা করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো চরম হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের ক্রমাগত ‘ব্যালিস্টিক মিসাইল’ এবং ‘ড্রোনের ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ প্রতিহত করার সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান তার অত্যাধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই অঞ্চলে মার্কিন ও তাদের মিত্রদের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়েছে, প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো বিপুল সংখ্যক অগ্রসরমান লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারলেও সবকটি সফলভাবে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, মার্কিন ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ইরানের কম খরচের ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন সামরিক সামর্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান রাশিয়ার মতোই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত হামলা চালানোর কৌশল অবলম্বন করছে। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো একসঙ্গে এতগুলো লক্ষ্যবস্তু সামাল দিতে গিয়ে ‘ওভারহুইলমড’ বা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ছে। ইরানের এই হামলাগুলো মূলত কাতার, বাহরাইন এবং আমিরাতের মতো দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে, যা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আরও একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস : আরও একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান। গতকাল বুধবার দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানি সেনাবাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট যুদ্ধবিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত করে। এর আগে সোমবার ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার জানিয়েছিল, ইরানের স্থানীয়ভাবে তৈরি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমান ও পাইলটদের নির্বাসন (ইজেকশন) সম্পর্কিত নানা ছবি প্রকাশিত হচ্ছে।
ইরানে সহস্রাধিক বেসামরিক নাগরিক নিহত : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, ইরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৯৭ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৮১ জন ১০ বছর বয়সী শিশু। এদিকে, আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪০২ জনে, যাদের মধ্যে ১০০ জনই শিশু। এইচআরএএনএ আরও জানিয়েছে, কেবলমাত্র গত ২৪ ঘণ্টায়ই অন্তত ১০৪টি হামলা হয়েছে। এসব হামলা করা হয়েছে সামরিক ঘাঁটি, মেডিকেল সেন্টার এবং আবাসিক এলাকায়।
ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজে হিজবুল্লাহর হামলা : ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের (আইএআই) সদরদপ্তর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে লেবাননের সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। একই সঙ্গে ইসরায়েলের ড্রোন নিয়ন্ত্রণকারী একটি সামরিক ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, মনুষ্যবিহীন ড্রোনসহ যুদ্ধের অস্ত্র, স্যাটেলাইট ও মহাকাশ কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা এবং বেসামরিক পণ্য তৈরি করে ইসরায়েলের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক কোম্পানি আইএআইর সদরদপ্তরে ড্রোন হামলা চালায় হিজবুল্লাহ।
ইরানের এখনও ব্যাপক সক্ষমতা রয়েছে- ইসরায়েল : ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলা চলছে। উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট এই হামলা অব্যাহত থাকলেও দেশটির এখনও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ব্যাপক সক্ষমতা রয়েছে বলে স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। ইসরায়েলের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেছেন, ‘?আমরা ইরানের কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র ধ্বংস করেছি। ইরানি এসব ব্যবস্থা ইসরায়েলি সীমান্তের জন্য বড় ধরনের হুমকি ছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থায় হামলা অব্যাহত রাখব এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ক্ষমতা কমিয়ে ফেলব। তবে দেশটির এখনও উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্ভেদ্য নয়।’