ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বদর অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা

বদর অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা

দ্বিতীয় হিজরির রমজানের ৮ তারিখ রাসূলে খোদা (সা.) মদীনা হতে রওনা হন। আমর ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদীনায় নামাযের ইমামতি ও বিভিন্ন কর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব দিয়ে রেখে যান। পরে (মদীনা হতে মক্কার পথে ৩০/৪০ মাইল দূরত্বে) রাওহা নামক স্থানে পৌঁছে আবু লুবাবাকে মদীনার প্রশাসক বানিয়ে মদীনায় ফেরত পাঠান।

হযরত (সা.) মুহাজির ও আনসারদের মধ্য হতে ৩১৫ জন লোক নিয়ে যাত্রা করেন। তাদের মধ্যে ৭৪ জন ছিলেন মক্কা থেকে আগত মুহাজির, বাকিরা মদীনাবাসী আনসার। কিছু লোককে বয়স খুব কম হওয়ার কারণে ফেরত পাঠান।

মুহাম্মদ ইবনে সাআদ বলেন, রাসূলে খোদার (সা.) ৮ জন সাহাবী নানা ঝামেলায় জাড়িয়ে পড়ায় বদরযুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। রাসূলে পাক তাদেরও গণিমতের ভাগ দেন। মুহাজিরদের মধ্যকার ১ জন ছিলেন হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.)। নবীজি তাঁকে তার পত্নী নবীকন্যা রোকাইয়ার শশ্রƒষা করার জন্য হুকুম দেন। রোকাইয়া অসুস্থ ছিলেন। ওসমান (রা.) মদীনায় থেকে যান এবং হযরত রোকাইয়া (রা.) ইন্তেকাল করেন। এ যুদ্ধে মুসলমানদের উটের সংখ্যা ছিল মোট ৭০টি। কয়েকজন মিলে পালাক্রমে উটে সওয়ার হতেন। রাসূলে খোদা (সা.), আলী ইবনে আবি তালেব ও মারসাদ ইবনে আবি মারসাদ গানাবী পালা করে একটি উটে সওয়ার হতেন। যখনই রাসূলে খোদার পায়ে হাঁটার পালা আসত, উভয়ে সবিনয়ে বলতেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি নামবেন না। আমরা পায়ে হেঁটে চলব। রাসূলে খোদা (সা.) বলতেন, পায়ে হাঁটায় তোমাদের দু’জনের জোর আমার চেয়ে বেশি নয়। আমিও সওয়াব লাভের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে কম মোহতাজ নই।

মুহাম্মদ ইবনে সাআদ বলেন, এ যুদ্ধে মুসলমানদের মাত্র দু’টি ঘোড়া ছিল। একটি মিকদাদ ইবনে আমরের। আরেকটি মারসাদ ইবনে আবি মারসাদ গানাবীর। ইবনে ইসহাক বলেন, যুবাইর ইবনে আওয়ামেরও একটি ঘোড়া ছিল। বর্ণিত আছে, সাদা রঙের যুদ্ধের মূল পতাকাটি রাসূলে খোদা মাসাআব ইবনে ওমাইর-এর হাতে দেন। এছাড়া রাসূলে পাকের সম্মুখভাগে কালো রঙের আরও দুটি পতাকা ছিল।

রাসূলে পাক (সা.) সাফরা এলাকায় পৌঁছার পর সাফরার ডান দিকে দাফেরান এলাকার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তাঁর (প্রেরিত সংবাদ সংগ্রাহকদের মাধ্যমে) কুরাইশদের যাত্রার খবর তার কাছে পৌঁছে। তিনি জানতে পারেন, কুরাইশরা তাদের বাণিজ্য কাফেলা রক্ষার জন্য মক্কা থেকে বের হয়েছে। হযরত তখন সাথীদের বিষয়টি অবহিত করে তাদের পরামর্শ চাইলেন।

তখন আবু বকর (রা.) দাঁড়িয়ে খুব সুন্দর বক্তব্য রাখলেন। এরপর উমর (রা.) দাঁড়ালেন এবং খুব সুন্দর বক্তব্য রাখলেন। এরপর মিকদাদ ইবনে আমর দাঁড়ালেন এবং বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ আপনাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তদনুযায়ী পদক্ষেপ নিন, আমরা আপনার সঙ্গে থাকব, খোদার কসম এমন কথা বলব না, যা বনি ইসরাঈল বলেছিল। অর্থাৎ ‘তুমি যাও এবং তোমার খোদার সাহায্য নিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে থকব।’ (সূরা মায়েদা : ৫-২৪); বরং বলব যে, আপনি এগিয়ে যান আপনার খোদার সাহায্যে যুদ্ধ করুন আর আমরাও আপনার সঙ্গে থেকে লড়াই করব। সেই সত্তার শপথ, যিনি সত্য সহকারে আপনাকে প্রেরণ করেছেন, যদি আমাদের (হিজর, ইয়ামেন বা হাবশার সেই দূর দেশের) বারাক আল-গেমাদের নিয়ে যান, তবুও খুব চপল ও স্বাচ্ছন্দ্যভাবে আপনার সঙ্গে থাকব। তার বক্তব্য শুনে নবীজি খুব খুশি হন এবং তার জন্য দোয়া করেন। এরপর তিনি লোকদের উদ্দেশ্য করে বলেন : তোমাদের মতামত বল। হযরতের কথার উদ্দেশ্য ছিল আনসাররা। কাফেলার অধিকাংশ ছিল তারাই। সাআদ ইবনে মাআয বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! মনে হয় আমাদের উদ্দেশ্য করেই বলেছেন? বললেন- হ্যাঁ। তিনি বললেন- আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। আপনাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, যা কিছু এনেছেন, সব সত্য। আমরা (আপনার আদেশ) শোনা ও আনুগত্য করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি। কাজেই যা কিছু ইচ্ছা করেছেন, কার্যকর করুন। সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, যদি এই বিশাল সাগরের ওপর আমাদের নিয়ে পাড়ি দেন, আপনার সঙ্গে তা পাড়ি দিয়ে যাব। আমাদের মধ্যে একজনও তার বরখেলাফ করবে না। যদি আগামীকালই দুশমনের মুখোমুখি হন, অসন্তুষ্ট হব না। কেননা, যুদ্ধে আমরা দৃঢ়চিত্ত এবং লড়াইয়ের মযদানে অবিচল। হয়তো আল্লাহতায়ালা আমাদের দ্বারা আপনার সামনে এমন বীরত্বের প্রকাশ ঘটাবেন, যা দেখে আপনার চক্ষু উজ্জ্বল হবে। আল্লাহর রহমত ও বরকতের ছায়ায় আমাদের যেখানে নিয়ে যেতে চান, নিয়ে যান।

হযরত এরশাদ করলেন, যাত্রা কর, তোমাদের জন্য সুসংবাদ যে, আল্লাহ এই দু’দলের (বাণিজ্য কাফেলা বা কুরাইশ বাহিনীর) যে কোনো একটি হস্তগত হওয়ার ওয়াদা আমাকে দিয়েছেন।

আল্লাহর কসম! এখন যেন আমি তাদের নিহত হওয়ার স্থানগুলো দেখতে পাচ্ছি। এর পরপর রাসূলে পাক দাফেরান থেকে রওনা হন এবং বদরের নিকট তাঁবু ফেলেন।

রাসূল খোদা (সা.) বিকেলবেলা আলী ইবনে আবি তালেব, যুবাইর ইবনে আওয়াম ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে সংবাদ সংগ্রহের জন্য বদরের পানির কূপগুলোর কাছে পাঠালেন। তারা কুরাইশদের একটি পানি বহনকারী উটের মুখোমুখি হলেন। বনি হাজ্জাজের গোলাম আসলাম ও বনি আস-এর গোলাম আবু ইয়াসার উটটিতে সওয়ার ছিল। তারা উভয়কে আটক করে রাসূলে পাকের (সা.) খেদমতে নিয়ে আসেন। রাসূলে পাক (সা.) উভয়ের কাছে কুরাইশদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তারা বলল: এই বালির টিলার পেছনে দূরবর্তী প্রান্তর দেখতে পাচ্ছেন, সেখানে তারা আছে। জিজ্ঞেস করলেন: তাদের সংখ্যা কত? বলল: আমরা জানি না। বললেন: প্রতিদিন খাবারের জন্য কয়টি (উট) জবাই করে থাকে? বলল: কোনদিন ৯টি আর কোন দিন ১০টি। রাসূলে পাক (সা.) বললেন: তাদের সংখ্যা ৯০০ থেকে ১০০০ এর মাঝামাঝি। জিজ্ঞেস করলেন : কুরাইশদের গণ্যমান্য লোকদের মধ্যে কে কে সঙ্গে আছে? তারা বলল : উতবা ইবনে রবিআ, শায়বা ইবনে রবিআ, আবুল বাখতারী ইবনে হিশাম, হাকীম ইবনে হাযাম, নওফেল ইবনে খোয়াইলাদ, আবু জাহল ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালাফ... প্রমুখ। শুনে নবীজি লোকদের দিকে ফিরে বললেন- মক্কা তার কলিজাটাই বের করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত