ঢাকা শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বদর রণাঙ্গনে ঘোরতর লড়াই

বদর রণাঙ্গনে ঘোরতর লড়াই

আসওয়াদ ইবনে আব্দুল আসাদ ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির ফিতনাবাজ লোক। সে কুরাইশ বাহিনীর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ঘোষণা দিল, আমরা আল্লাহ্র সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেছি যে, মুসলমানদের চৌবাচ্চা হতে পানি পান করব অথবা তা ধ্বংস করে দেব, যদি এ পথে নিহতও হই। হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব তার সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য মুসলিম বাহিনী থেকে বের হলেন। যখন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন, তখন হামযা এক প্রচণ্ড আঘাত হানলেন। তাতে আসওয়াদের এক পা কেটে রান থেকে আলাদা হয়ে গেল, সে হাউযের কাছেই ছিল, চিৎ হয়ে পড়ে গেল, তখনও সে হাউযের দিকে হেঁচড়ে গড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল; যাতে তার শপথ পূরণ করতে পারে। হামযাও তার পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং তাকে হত্যা করেন।

এরপর কুরাইশ বাহিনীর মধ্যে থেকে উতবা ইবনে রাবিয়া, তার ভাই শায়বা ইবনে রাবিয়া ও ছেলে ওয়ালীদ ইবনে উতবাসহ বেরিয়ে এসে মল্লযুদ্ধের জন্য প্রতিপক্ষ আহ্বান করল। মুসলিম বাহিনীর মধ্যে থেকে আনসারদের তিনজন হারেস পুত্র আউফ ও মুআওয়ায এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বেরিয়ে সামনে গেলেন। ওরা জিজ্ঞাস করল : তোমরা কে? তারা বললেন : আমরা আনসার সম্প্রদায়ের লোক। তারা বলল: তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো কাজ নেই। এরপর কুরাইশ মুখপাত্র চিৎকার দিয়ে বলল : হে মুহাম্মদ! আমাদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য আমাদের গোত্রের আমাদের সমমর্যদার লোক পাঠাও। হজরত আপন চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আলী ইবনে আবু তালিব ও উবায়দা ইবনে হারেসকে ঐ তিনজনের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য পাঠালেন। তারা ওদের কাছে পৌঁছলে জিজ্ঞেস করল : তোমরা কারা? প্রত্যেকে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর শুনে বলল : হ্যাঁ! আমাদের সম্মানিত সমকক্ষ বটে। উবায়দা ইবনে হারেস অন্য দুজনের চাইতে বয়স্ক ছিলেন। তিনি উতবার সঙ্গে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। হামযা শায়বার সঙ্গে আর আলী ওয়ালীদ ইবনে উতবার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেন। হামযা ও আলী তাদের প্রতিদ্বন্ধিকে একটুও অবকাশ দিলেন না। তাদের হত্যা করলেন আর ওবায়দা ও উতবা উভয়ে পরস্পরকে এমন প্রচণ্ড আঘাত করল যে, উভয়ে মাটিতে পড়ে গেল। কোনো দিকে যাওয়ার শক্তি তাদের ছিল না। হামযা ও আলী উতবার ওপর হামলা করে তার গর্দান দ্বিখণ্ডিত করে ফেললেন আর উবাইদাকে ধরাধরি করে শিবিরে নিয়ে আসলেন। এ পরিস্থিতিতে উভয় বাহিনী পরস্পরের দিকে অগ্রসর হয় এবং পরস্পরের খুবই নিকটবর্তী হয়। নবী করীম (সা) যোদ্ধাদের সারি সুবিন্যস্ত করে ছাউনিতে ফিরে যান। তিনি নিজে এবং আবু বকর সিদ্দিক সে ছাউনিতে ছিলেন। তাদের সঙ্গে আর কেউ ছিলেন না। রাসূল (সা) মোনাজাত করতে থাকেন, যাতে আল্লাহ তাআলা তার ওয়াদাকৃত সাহায্য ও বিজয় দান করেন। তিনি মোনাজাতে একথাও আরজ করেন যে, পরওয়ারদেগার! যদি মুসলমানদের এ দলটি আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে তোমার ইবাদত করার আর কেউ থাকবে না। আবু বকর তখন বলছিলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা আপনার দোয়া ও মোনাজাত কবুল করেছেন। তিনি তার ওয়াদা পূরণ করবেন। এ অবস্থায় রাসূলে পাক একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আবার জাগ্রত হন এবং বলেন : হে আবু বকর! সুসংবাদ নাও যে, তোমার জন্য আল্লাহ্র সাহায্য এসে গেছে। এই তো জিবরাঈল তার ঘোড়ার লাগাম ধরে টানছেন আর ঘোড়ার দাঁতের ওপর ধুলোবালির ছাপ দেখা যাচ্ছে।

ইবনে ইসহাক বলেন : এ সময় হজরত উমর ইবনে খাত্তাবের গোলাম ‘মেহজা’ এর উপর একটি তীর বিদ্ধ হয় ও তিনি শহিদ হন। বদর যুদ্ধে তিনিই ছিলেন মুসলমানদের পক্ষে প্রথম শহিদ। এরপর হাউজের কাছে পানি পানরত অবস্থায় বনি আদি বিন নাজ্জার গোত্রের হারেসা ইবনে সুরাকার গলায় একটি তীর বিদ্ধ হয় এবং তিনিও শহিদ হন। অতঃপর রাসুল (সা) ছাউনি হতে বেরিয়ে আসেন এবং মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করেন। তিনি বলেন : সেই সত্তার শপথ করে বলছি, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আজ যে কেউ ধৈর্য ও অবিচলতার সঙ্গে দুশমনের ওপর হামলা করবে এবং যুদ্ধ থেকে পিছটান দেবে না, সে যদি নিহত হয় তাহলে আল্লাহ তাকে বেহেশতে দাখিল করবেন। বনি সালমা গোত্রের ওমাইর ইবনে হুমাম তখন হাতের মুঠোর খেজুর নিয়ে খাচ্ছিলেন। তিনি রাসূলে পাকের মুখের বাণী শোনামাত্র বলে উঠলেন : বাহ্ বাহ্! আমার ও বেহেশতের মধ্যে ব্যবধান শুধু এতটুকু যে, ঐ দলটি আমাকে হত্যা করবে? তিনি খেজুরগুলো ছুড়ে মারেন এবং তরবারি হাতে নিয়ে এমন প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করেন যে, শেষ পর্যন্ত শহিদ হন। আউফ ইবনে হারেস বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোনো কাজটি আল্লাহ্কে তার বান্দার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি খুশী করে? বললেন: শিরস্ত্রাণ ও বর্ম ব্যতিরেকে দুশমনের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। তখন তিনি গায়ের বর্মটি খুলে ফেলেন এবং হাতে তরবারি নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত তিনিও শহিদ হন। বর্ণিত আছে, ঐ সময় রাসূলে পাক (সা) এক মুষ্টি কংকর তুলে নেন এবং কুরাইশদের লক্ষ্য করে বলেন : ‘শাহাতিল উজূহ’ ‘তোমাদের চেহারা কদাকার হয়ে যাক।’ তিনি কঙ্করগুলো তাদের দিকে নিক্ষেপ করলেন আর সাথীদের নির্দেশ দিলেন, হামলা কর। এরপর প্রচণ্ড যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী পরাজয় বরণ করে।

বদরের ময়দানে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। তাদের মধ্যে মোট ১৪ জন শহিদ হন। ৬ জন মুহাজিরদের পক্ষ হতে আর ৮ জন আনসারদের মধ্যে থেকে। বদর যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল ৯৫০ জন। তন্মধ্যে নিহত হয় ৭০ জন। আর বন্দি হয় ৭০ জন। নিহত ও বন্দিদের অধিকাংশই ছিল নেতৃস্থানীয় লোক। আল্লাহ্ পাক তাদের পরাজিত লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং রাসুলাল্লাহ্ (সা)-কে সম্মানিত করেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত