ঢাকা রোববার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ফিলিং স্টেশনগুলোতে হাহাকার

ফিলিং স্টেশনগুলোতে হাহাকার

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ঘিরে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট বা দাম বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গত কয়েকদিন ধরে তেল নিতে ভিড় করছেন ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের চালকরা। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবারের পর গতকাল শনিবারও ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেক মানুষ। সরকার থেকে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় গতকাল পাম্পে তেল সরবরাহ না করায় সংকট আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন পেট্রোলপাম্প মালিকরা।

রাজধানীর বনানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা সালেহ আক্তার বলেন, কাল কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাইনি। তাই আজ (গতকাল) সকাল সকাল বের হয়েছি, পরে বেলা বাড়লে যদি তেল না পাই। কিন্তু বেলা ১১টা পর্যন্ত কয়েকটা পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। সবাই বলছে গত দুদিন অতিরিক্ত তেল ওঠানোর কারণে পাম্পে তেল শেষ। তিনি বলেন, সরকার বলছে মজুত আছে, কিন্তু ফিলিং স্টেশনে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এ অভিযোগ শুধু সালেহ আক্তারের নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই ফিলিং স্টেশন ঘুরেও তেল পাননি। কেউ কেউ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরে গেছেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, কিছু ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকায় সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও গাড়ির দীর্ঘ সারি পাম্পের সীমানা ছাড়িয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত চলে গেছে। সংসদ ভবনের পাশের তালুকদার পাম্পের সামনে জুলাই জাদুকর হয়ে জিয়ার মাজারের লেকের কোণা পর্যন্ত লাইন গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে আসাদ গেটের ফিলিং স্টেশনের লাইন গেছে প্রিপারেটরি স্কুল পর্যন্ত। এদিকে শাহবাগের মেঘমা পাম্পের লাইন গেছে পিজি হাসপাতাল পর্যন্ত। প্রত্যেকটা লাইন প্রায় এক মেইলের মতো দীর্ঘ হয়েছে। তাও আবার দুই লাইনে। একটা গাড়ির আরেকটা মোটরসাইকেলের। পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান, গুজব বা আশঙ্কার কারণে গত দুই দিনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তেল বিক্রি হয়েছে। ফলে অনেক পাম্পে মজুত দ্রুত শেষ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হক বলেন, আতঙ্কের কারণে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিয়েছেন। এতে করে অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় তেলবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় পাম্পে তেলে সরবরাহ করা হয় না। তবে মার্চ-এপ্রিল এবং মে মাসে সেচের জন্য এই নিয়ম শিথিল করা হয়। এইবার এত বড় সংকটের সময়ও এক নিয়ম শিথিল না করায় বিপদে পড়েছি আমরা। রমনা পেট্রোল পাম্পের মালিক নাজমুল হক আরও বলেন, গ্রাহক ভাবছে আমরা ইচ্ছাকৃত তেল দিচ্ছি না অথচ দুপুর ২টা ৩৯ মিনিটে তেল শেষ হয়ে যায়। গ্রাহকেয়া ক্ষেপে যায়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে চেক করে কনফার্ম করে আমার পাম্পে তেল নেই। আমরা সকাল থেকেও বলছি পাম্পে তেলে ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার কোনও উদ্যোগ নেয়নি। এ বিষয়ে জানতে জ্বালানি সচিব ও বিপিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গত শুক্রবার বিকালে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প পরিদর্শনে যান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। পরে তিনি বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। অস্থির হওয়ার কোনো কারণ নেই। গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল মজুত না করার জন্যও তিনি সাধারণ মানুষকে পরামর্শ দেন। একইদিন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে গুজব বা নেতিবাচক প্রচারে প্রভাবিত হয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত তেল না কেনার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল বিক্রির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী মোটরসাইকেল সর্বোচ্চ দুই লিটার এবং প্রাইভেটকার সর্বোচ্চ ১০ লিটার পর্যন্ত অকটেন বা পেট্রোল নিতে পারবে।

প্রাইভেটকার, জিপ ও মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে প্রতি ট্রিপে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত তেল নেওয়ার সুযোগ থাকবে। মিনিবাস ও লোকাল বাস ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ১০০ থেকে ১২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল নিতে পারবে। সব মিলিয়ে, গুজব ও আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা এবং সরকার থেকে আজকে শনিবার তেল সরবরাহ না করার কারণে রাজধানীর অনেক পেট্রোল পাম্পে সাময়িকভাবে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে।

তেল সংকট এড়াতে বিকল্প উৎস চিন্তা ভোগান্তি কমাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে তেল পাম্পে ভিড় করছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, দেশের তেলের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে এবং ভবিষ্যতের সংকট এড়াতে বিকল্প উৎসের কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি জানান, আগামী ৯ মার্চ দেশে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছাবে, ফলে সরবরাহে কোনো ঘাটতির আশঙ্কা নেই।

মন্ত্রী জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গুজব বা আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করা উচিত নয়। কেউ প্রয়োজনের বেশি তেল কিনলে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হবে। তেলের সরবরাহে অনিয়ম বা অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ এড়াতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানান, জনভোগান্তি কমাতে আগামীকাল থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু হবে, যা বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অভিযান পরিচালনা করবে। মন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সরকার সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, ৯ তারিখ আরও ২টি ভেসেল আসছে -জ্বালানি মন্ত্রী : জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে উপস্থিত সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। ৯ মার্চ আরও ২টি ভেসেল আসছে জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আগামীকাল (আজ) থেকে ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট কাজ শুরু করবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্যানিক কাজ করছে তার কোনো যুক্তি নেই। তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার। তিনি আরও বলেন, আজকে এই সমস্যাটা সৃষ্টি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জন্য এবং স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি উদ্বিগ্নতা মানুষের মধ্যে বেড়েছে। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমরা রেশরিংটা করেছি এই জন্যই যে, একটা অনিশ্চয়তা আছে। যুদ্ধটা কতদিন চলবে? সেই জন্য আমরা একটা রেশন করেছি। কিন্তু মানুষ এই রেশনটাকে ভয় পেয়ে স্টক করা শুরু করেছে। আসলে আমাদের তেলের কোনো অভাব নেই। শুধু তাই না, আগামী ৯ মার্চ তারিখে আরও ২টা ভ্যাসেল আসছে সুতরাং তেলের কোনো সমস্যা নেই। আমি সবার কাছে অনুরোধ করব, বিশেষ করে মিডিয়ার কাছে অনুরোধ করব জনগণকে এই মেসেজটা দেওয়া যে, তাড়াহুড়া করে তেল কেনার দরকার নেই। আমাদের কাছে মজুদ আছে। আমরা পেট্রোল পাম্পে তেল দিচ্ছি এবং চলবে। এটা এটার জন্য লাইন দিয়ে সারারাত জেগে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষ গেলে তেল পাবে।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পাম্প ম্যানেজমেন্ট আছে, আমরা নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল দিচ্ছি। এখন কোনো পাম্প যদি জলদি বিক্রি করে ফেলে তারপরে তো আর ওই দিন তেল পাবে না। তার পরের দিন ওয়েট করতে হবে। সেটার জন্য আমরা মনিটর করছি। আমরা দেখব যাতে এরকম কম হয়, সে বিষয়টা দেখব। আমরা কালকে থেকে আমরা মোবাইল কোড নামায়ে দেব। সব রকমের ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। মোটরসাইকেলে বর্তমানে যে দুই লিটার করে তেলের রেশনিং করা হচ্ছে, তাতে চালকদের একদিন পরপরই পাম্পে যেতে হচ্ছে। রেশনিংয়ের এই পরিমাণ আরেকটু বাড়ানো যায় কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না, বাড়ানো সম্ভব নয়। আমি তো আগেই বলেছি যে আমাদের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। কিন্তু যুদ্ধ কবে থামবে, তা আমরা কেউ জানি না। তাই আগে থেকেই নিজেদের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সঞ্চয় রাখতে হবে। আমরা মূলত সেই সঞ্চয়টাই করছি। সুতরাং আমাদের ঘাটতি পড়ার কোনো সুযোগ নেই। তবুও যেহেতু যুদ্ধ চলছে, আমাদের খুব হিসাব করে চলতে হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত