ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইরানের সুপ্রিম লিডার সৈয়দ মুজতবা খামেনি

ইরানের সুপ্রিম লিডার সৈয়দ মুজতবা খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সংস্থা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মুজতবা হোসাইনি খামেনিকে ইসলামি বিপ্লবের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। রোববার রাতে ৮৮ জন আলেমের সমন্বিত এই পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে এই পদে নিয়োগ দেয়। ৫৬ বছর বয়সী মুজতবা খামেনি সম্প্রতি শহিদ হওয়া সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনির পুত্র। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের তৃতীয় সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সচিবালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা এবং সদস্যদের চূড়ান্ত ভোটের মাধ্যমে আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনিকে পবিত্র ইসলামি শাসন ব্যবস্থার নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিবৃতিতে ইরানের বীর ও মুক্তিকামী জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলা হয়, আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনির শাহাদাতের মাধ্যমে প্রাজ্ঞ ও অটল নেতৃত্বের একটি যুগের অবসান ঘটল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক সন্ত্রাসী হামলায় আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি শহিদ হন। ওই হামলায় সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারান। এরপর থেকেই ইরানের সর্বোচ্চ পদের উত্তরাধিকার নিয়ে জল্পনা চলছিল।

ইসলামি বিপ্লবের নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মুজতবা হোসাইনি খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি এই নির্বাচনকে ইরানি জাতির জন্য সম্মান ও কর্তৃত্বের এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এদিকে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ এবং ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর এক যৌথ বিবৃতিতে নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি তাদের অবিচল আনুগত্য ও সমর্থন ঘোষণা করেছে। সোমবার প্রকাশিত এই বিবৃতিতে দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন নেতৃত্বের অধীনে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের কমান্ডাররা মুজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নিয়ে তার প্রতিটি আদেশ পালনের শপথ নিয়েছেন। আইআরজিসি আলাদা এক বিবৃতিতে মুজতবা খামেনির প্রতি ‘পূর্ণ শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং অটল আনুগত্য’ প্রকাশ করেছে। তারা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ নেতার পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। দেশের বিচার বিভাগ এবং সংসদীয় নেতৃত্বও এই নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে। স্পিকার এই আনুগত্যকে ‘ধর্মীয় ও জাতীয় দায়িত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি জানিয়েছেন, বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে দেশকে সঠিক দিশা দেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা নতুন নেতার রয়েছে।

কে এই মুজতবা খামেনি : ১৯৬৯ সালে পবিত্র মাশহাদ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি। তিনি ইসলামি বিপ্লবের শহিদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র, যিনি ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনির ইন্তেকালের পর দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

মুজতবা খামেনি তার কৈশোর ও প্রাথমিক জীবন অতিবাহিত করেন তেহরানে। তিনি প্রখ্যাত ‘আলাভি স্কুল’ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার জন্য সুপরিচিত।

মুজতবা খামেনির প্রারম্ভিক যৌবনকাল ছিল আধুনিক ইরানের ইতিহাসের অন্যতম উত্তাল সময়। মাত্র সতেরো বছর বয়সে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সম্মুখ সমরে অংশ নেন এবং তেহরানের ২৭তম মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ ডিভিশনের ‘হাবিব ইবনে মাজাহের’ ব্যাটালিয়নের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে এবং ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি তার প্রতিশ্রুতিকে আরও গভীর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৮৯ সালে তিনি উচ্চতর সেমিনারি (হাওজা) শিক্ষা শুরুর জন্য পবিত্র কোমে চলে যান। ১৯৯২ সালের শুরু পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন এবং এরপর তেহরানে ফিরে এসে পরবর্তী পাঁচ বছর তার ধর্মীয় শিক্ষা চালিয়ে যান। ১৯৯৭ সালে তিনি জোহরা হাদ্দাদ আদেলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির দুই পুত্র- মোহাম্মদণ্ডবাকের ও মোহাম্মদ আমিন এবং এক কন্যা- ফাতেমা। উল্লেখ্য, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি অবৈধ সামরিক আগ্রাসনে তার স্ত্রী গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শাহাদাত বরণ করেন; একই হামলায় ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতাও শহিদ হন।

বিয়ের পর আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি তার উচ্চতর সেমিনারি শিক্ষাসম্পন্ন করতে পুনরায় পবিত্র কোম নগরীতে ফিরে যান। তিনি কোমের বিশিষ্ট আলেমদের তত্ত্বাবধানে ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) এবং উসুলে ফিকহ-এর উন্নত পর্যায়ের পাঠ গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি সেমিনারির সর্বোচ্চ পর্যায়ের লেকচারগুলোতে (দর্স-ই-খারেজ) অংশ নেন, যেখানে সিনিয়র আলেমরা স্বাধীন বিচারবিভাগীয় যুক্তি বা ইজতিহাদ নিয়ে আলোচনা করেন।

কোমের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মতে, আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি তার বুদ্ধিবৃত্তিক কঠোরতা, সূক্ষ্মতা এবং চিন্তার স্বাধীনতার মাধ্যমে নিজেকে অনন্য করে তুলেছেন। তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজ প্রথাগত সেমিনারি বিজ্ঞানে, বিশেষ করে ফিকহ, উসুলে ফিকহ এবং ইলমে হাদিস বা বর্ণনা বিজ্ঞানে উদ্ভাবনী আলোচনায় অবদান রেখেছে। বছরের পর বছর ধরে কোম তার লেকচারগুলো হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করেছে, যা তার ক্লাসগুলোকে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল সেমিনারি ক্লাসে পরিণত করেছে।

ধর্মীয় পাণ্ডিত্য এবং সামাজিক কাজের বাইরেও তিনি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আবাসন উন্নয়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্প ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে সমর্থন প্রদান। আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গেও শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং তাদের আদর্শের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর শহিদ নেতা সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এছাড়াও ২০২০ সালে শহিদ হওয়া ইরানের প্রখ্যাত সন্ত্রাসবাদবিরোধী কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানির সঙ্গেও তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল।

তবে ব্যক্তিগতভাবে আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি প্রচারবিমুখ হিসেবে পরিচিত। নিজের প্রচার এড়িয়ে তিনি ইসলামি বিপ্লবের বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা, বিশেষ করে ইমাম খোমেনি এবং ইমাম খামেনির উত্তরাধিকারকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন। দেশের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত না থাকার তার সচেতন প্রচেষ্টা তাকে ইরানি সমাজে ব্যাপক শ্রদ্ধা এনে দিয়েছে এবং জ্যেষ্ঠ আলেম, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পণ্ডিত ও সাধারণ জনগণের আস্থা জয় করতে সাহায্য করেছে। কয়েক দশকের পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ, দেশের শাসনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা এবং ধর্মীয় মহলে দীর্ঘদিনের সংযোগ নিয়ে আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি এখন ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির বিরুদ্ধে এক নৃশংস যুদ্ধ শুরু করেছে। দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিবৃতি এবং তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, নতুন নেতা তার শহিদ পূর্বসূরির গৌরবময় উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করবেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত