
নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীস্থ টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের নারী প্রধান পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, পাইলটিং পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রতিটি খানার তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও তালিকা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়।
ওয়ার্ড কমিটি সরেজমিনে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, পরিবারের ব্যবহৃত আসবাব ও গৃহস্থালী সামগ্রী (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি), রেমিট্যান্স প্রবাহ ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং সংগৃহীত তথ্য ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক যাচাই-বাছাইকৃত তালিকা উপজেলা কমিটি কর্তৃক অধিকতর যাচাইপূর্বক উপকারভোগীর তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাইলটিং পর্যায়ে সারাদেশে মোট ৬৭৮৫৪টি নারী প্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
পাইলটিং পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র্য সূচক মান নির্ণয়ের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বিত্ত শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ৫১৮০৫টি থানার (Household) তথ্য যাচাইয়ে ৪৭৭৭৭টি খানার তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। প্রাপ্ত তথ্য হতে ডাবল ডিপিং (একই ব্যাক্তির একাধিক ভাতা গ্রহণ), সরকারি চাকরি, পেনশন ইত্যাদি কারণে চূড়ান্তভাবে ৩৭৫৬৭টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদানের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সমগ্র প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র্য সূচক মান এর ভিত্তিতে সম্পন্ন করায় উপকারভোগী নির্বাচনে কোনরূপ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের অবকাশ নেই।
ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি নারী প্রধান পরিবার একটি করে আধুনিক ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। স্পর্শবিহীন (Contactless) চিপ সম্বলিত এই কার্ডে QR Code (বার কোডের তথ্যসহ) ও NF (Near Field Communication) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে কার্ডটি নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে। কোন একটি পরিবারের ০৫ জন সদস্যের জন্য ০১টি ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। তবে যৌথ/একান্নবর্তী পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা ০৫ এর অধিক হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড প্রদান করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহ প্রধান যদি অন্য কোনো সরকারি ভাতাণ্ডসহায়তা পান সেক্ষেত্রে সেই সকল বিদ্যমান সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের অন্যান্য ভাতা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় যোগ্য উপকারভোগীগণ পাইলটিং পর্যায়ে মাসিক ২৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রাপ্ত হবেন এবং পরবর্তী সময়ে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
পাইলটিং পর্যায়ে কোন পরিবারের কোন সদস্য সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন/ভাতা/অনুদান/পেনশন পেয়ে থাকলে, নারী পরিবার প্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারী হিসেবে চাকরিরত থাকলে উক্ত পরিবার ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না। এছাড়াও পাইলটিং পর্যায়ে কোন পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে বা বিলাসবহুল সম্পদ (যেমন: গাড়ি, এসি) থাকলে বা ০৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে উক্ত পরিবার ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দকৃত অর্থ হতে ফ্যামিলি কার্ড ভাতা জি-টু-পি (Government to Person) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর পছন্দ অনুযায়ী তার মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক একাউন্টে জমা হবে। তথ্য সংগ্রহকালীন সময়েই উপকারভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক একাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে করে কোন প্রকার বিলম্ব, ভুল একাউন্টে জমা বা কোন প্রকার হস্তক্ষেপ ব্যতীত উপকারভোগীগণ ঘরে বসেই সরাসরি সরকার হতে ভাতা প্রাপ্ত হবেন। পাইলটিং পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী জুন/২০২৬ সময়ের জন্য ৩৮.০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যার মধ্যে ২৫.১৫ কোটি টাকা (৬৬.০৬%) সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান এবং ১২.৯২ কোটি টাকা (৩৩.৯৪%) কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন সিস্টেম প্রণয়ন, কার্ড প্রস্তুতি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে।
জাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করার উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে জাকাত ব্যবস্থাপনাকে কীভাবে আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করা যায়, সেই সম্ভাবনা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জাকাত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বৈঠকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি জানান, বৈঠকে কার্যকর জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কীভাবে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও বৈঠকে জাকাত বোর্ড পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের নেতৃত্বে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক ও আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ এবং শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্ট আলেমণ্ডওলামাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জানান, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কারা থাকবেন, আগামী দশদিনের মধ্যে সেই নাম প্রস্তাব করবে ধর্ম মন্ত্রণালয়। জাকাত ব্যবস্থাপনা ও জাকাত বোর্ড পুনর্গঠনের বিষয়ে এই কমিটি শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের সুপারিশ পেশ করবে। গত শনিবার আলেমণ্ডওলামা ও এতিমদের সম্মানে এক ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সুষ্ঠু জাকাত ব্যবস্থাপনা আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, ধর্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ ও আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।
তামাকের ‘প্রকাশ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ’ করার প্রস্তাব দেওয়া হবে - তথ্যমন্ত্রী : তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনের নামকরণে ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটির বদলে ‘প্রকাশ্যে ব্যবহার নিষেধ’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি জাতীয় সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করবেন। তিনি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটির মধ্যে একটি ঢিলেঢালা ভাব থাকে, যা ‘প্রকাশ্যে নিষেধ’ শব্দটির মাধ্যমে কঠোর আইনি অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা সেমিনার কক্ষে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ: সরকারের সাফল্য, প্রতিশ্রুতি ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় মন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ কে আইনে পরিণত করার আশা প্রকাশ করেন। তামাকবিরোধী সংগঠন ‘আত্মা’ (অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স) এবং ‘প্রজ্ঞা’ (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন বলেন, সমাজে তামাকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে সচেতনতা থাকলেও ডাক্তার গোলাম মহিউদ্দিন ফারুকের উপস্থাপনায় উঠে এসেছে যে এখনো তামাকজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। মন্ত্রী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলেই বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসিতে স্বাক্ষর করেছিল। তিনি বলেন, ‘আমি ২০০৫ সালে যখন সংসদ সদস্য ছিলাম, তখনই ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৫’ পাস হয়। আমি সেই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে গর্বিত।’