
জ্বালানি তেল সরবরাহ ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান তেল ডিপোগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। বার্তায় বলা হয়, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে কিছু ক্ষেত্রে ডিলারদের হঠাৎ বেড়ে যাওয়া চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। এর ফলে জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ডিপোগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গায় অবস্থিত প্রধান স্থাপনা, খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশাল ডিপো। মন্ত্রণালয় জানায়, এসব জ্বালানি ডিপো কেপিআইভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণে উল্লিখিত স্থাপনাগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
চট্টগ্রামে জাহাজ থেকে খালাস হচ্ছে ২৭ হাজার টন ডিজেল : ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে এসেছে জাহাজ ‘এমটি জিউ চি’। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। এটি এরই মধ্যে খালাস প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাশাপাশি এমটি লিয়ান হুয়ান হু নামের আরেকটি জাহাজ ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আজ রাতে চট্টগ্রাম বন্দরের ডলপিন জেটিতে বার্থিংয়ের কথা রয়েছে। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সোমবার ডিজেল নিয়ে দুটি জাহাজ আসছে। এতে দেশে জ্বালানির মজুত বাড়ছে।
পর্যাপ্ত মজুত আছে, ভোজ্যতেলের দাম একটুও বাড়বে না- বাণিজ্যমন্ত্রী : বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তেলের দাম একফোঁটা বা একটুও বাড়ার সম্ভাবনা নেই। এ মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। গতকাল সোমবার ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। এরপর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কয়েকদিন বাজারে যে সংকট হয়েছে, এর কারণ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটা করেছে অনেকে। যে কারণে সাময়িকভাবে কিছু জায়গায় সরবরাহের চাপ তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, গত কয়েকদিনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কোথাও কোথাও ভোজ্যতেলের সংকট বা লিটারে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রির খবর প্রকাশ হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে এ বৈঠক হয়। বৈঠকে আমদানিকারক ও রিফাইনারি মালিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য বসেছিলাম। বৈঠকে আমরা জানতে পেরেছি বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। কোথাও কোথাও ভোক্তাদের আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার প্রবণতার কারণে সাময়িকভাবে কিছু দোকানে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রী নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে বলেন, রাজধানীর একটি বাজারে গিয়ে দেখেছি রাস্তার পাশে বড় দোকানগুলোতে ভোজ্যতেল পর্যাপ্ত রয়েছে এবং বোতলের গায়ে নির্ধারিত দামই লেখা আছে। তবে বাজারের ভেতরের একটি দোকানে সীমিত তেল মজুত রেখে প্রতি লিটারে দুই থেকে তিন টাকা বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল। ভোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। বাজারে যেহেতু পণ্য আছে, তাই অযথা প্রতিযোগিতা করলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে পারে। এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মতো ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও কোনো সংকট নেই। জ্বালানি তেল, গ্যাস বা ভোজ্যতেল- কোনোটিতেই সংকট নেই। তাই এসব পণ্যের সঙ্গে ‘সংকট’ শব্দটি যুক্ত করে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি না করার আহ্বান জানাচ্ছি।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্যও সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তেলের দাম এক ফোঁটাও বাড়বে না প্রশ্নের জবাবে বলেন, তেলের দাম এক ফোঁটাও বাড়বে না। ভোক্তারা নিশ্চিন্তে বাজার করতে পারেন।
বাজারে অনিয়ম হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার তদারকি করছে এবং জেলা প্রশাসনও নিয়মিত অভিযান চালাবে।
জ্বালানি তেলে অনিয়ম রোধে ডিসিদের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ : জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি রোধে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল সোমবার এ নির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। ডিসিদের কাছে পাঠানো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি তেলের বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধের লক্ষ্যে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি, খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধ ও পাচাররোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে অনুরোধ জানানো হলো। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য ডিসিদের নির্দেশনা দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
জ্বালানি তেলের যথাযথ সরবরাহে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন : বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের যথাযথ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক মনিটরিং এবং কন্ট্রোল সেল গঠন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে এ সেল গঠন করা হয়। বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত এক স্মারকে বিষয়টি জানা গেছে। এতে বলা হয়, সেলের মেয়াদ চলতি (মার্চ) মাস থেকে আগামী মে পর্যন্ত। আজ শুরু হওয়া এর কার্যক্রম প্রতিদিন চালু থাকবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ছুটির দিনেও চলবে। অফিস সময়ের পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।
সেলের দায়িত্ব সম্পর্কে জানানো হয়, আঞ্চলিক সেলগুলো প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সে অঞ্চলের ডিপোগুলোর পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুত, সরবরাহ ও বিক্রয় পরিস্থিতিসহ অঞ্চলে বিদ্যমান ডিজেলের খুচরা বাজার পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় সেলে পাঠাবে। আঞ্চলিক সেলগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সেলের প্রস্তুত করা পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুত প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কাছে পাঠানো হবে।
এদিকে, স্মারকে দেশের সব তেল ডিপো থেকে নির্বিঘ্নে জ্বালানি তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্বালানি তেলের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণে নিয়োজিত বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তাদের সার্বিক সহায়তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। স্মারকে আরও বলা হয়, কৃষিসেচ মৌসুম চলাকালে ডিলার ও এজেন্টের অনুকূলে ডিপো থেকে সরবরাহ করা জ্বালানি তেলের পরিমাণ ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য বা প্রতিবেদন আঞ্চলিক সেল থেকে নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে ই-মেইল বা ফ্যাক্সযোগে অবহিত করা হবে।