ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মানব ইতিহাসের গতিনির্ণায়ক মক্কা বিজয়

মানব ইতিহাসের গতিনির্ণায়ক মক্কা বিজয়

৮ম হিজরীর ১০ রমজান রাসূলে খোদা (সা.) মদীনা হতে মক্কা অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন। তার সঙ্গে ছিল ১০ হাজার যোদ্ধা। এই অভিযানে তিনি প্রায় বিনা যুদ্ধে মক্কা জয় করেন। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে মানব ইতিহাসের গতি পরিবর্তন হয় এবং ইসলাম বিশ্বের বুকে বিজয়ী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ যুদ্ধাভিযানের পটভূমি রচিত হয়েছিল হুদাইবিয়ার সন্ধিভঙ্গের মধ্য দিয়ে।

হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়েছিল ২ বছর আগে হিজরী ৬ সালে। মহানবী (সা.) মুসলমানদের নিয়ে মক্কায় উমরা পালনের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন মদীনা হতে। কিন্তু কুরাইশরা তার মক্কায় প্রবেশে বাধা দেয়। অনেক কূটনৈতিক টানাপড়নের পর মক্কার অদূরে হুদাইবিয়া নামক স্থানে ১০ বছর মেয়াদি এক শান্তি ও অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল উভয় পক্ষ পরস্পরের মিত্রদের ওপর হামলা করবে না। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২১ মাসের মাথায় কুরাইশরা চুক্তি লংঘন করে অত্যন্ত নিষ্ঠুর পন্থায়। হুদাইবিয়ার সন্ধিকালে খোজাআ গোত্র রাসূলে খোদার (সা.)-সঙ্গে মৈত্রিবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। আর বনু বকর গোত্র মৈত্রি স্থাপন করেছিল কুরাইশদের সঙ্গে। জাহেলী যুগে দীর্ঘকাল খোজাআ ও বনু বকর গোত্রের মধ্যে রক্তপাত চলছিল। তবে রাসূলে পাকের (সা.) আগমনে বিশেষ করে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর এ রক্তপাত কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল। এই সুযোগে কুরাইশদের মিত্র বনু বকর গোত্র প্রতিশোধ গ্রহণের মওকা পেয়ে যায়। বনু বকর গোত্রের নওফেল ইবনে মুআবিয়া গোপনে কুরাইশদের সাহায্য নিয়ে অতর্কিতে হামলা চালায় খোজাআ গোত্রের ওপর। খোজাআ গোত্রের লোকেরা মক্কার হেরেমে আশ্রয় নিয়েও হত্যাকাণ্ডের হাত থেকে নিস্তার পায়নি।

খোজাআ গোত্রের নেতা বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা ৪০ জন অশ্বারোহী নিয়ে মদীনায় আসে। রাসূলে খোদার (সা.) খেদমতে এসে আক্রান্ত হওয়ার করুণ কাহিনি বর্ণনা করে চুক্তি অনুযায়ী তার সাহায্য কামনা করে। রাসূলে পাক (সা.) তাকে সাহায্যের আশ্বাস দেন। বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা ফিরে যাবার পরপর কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান মদীনায় আসে।

আবু সুফিয়ান মসজিদে নববীতে হাজির হয়ে রাসূলে খোদার (সা.) সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু রাসূল (সা.) তার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। এরপর আবু সুফিয়ান এক এক করে হযরত আবু বকর (রা.) ওমর (রা) ও আলী (রা.)-এর কাছে গিয়ে অনুরোধ করে, তোমরা আমার জন্য রাসূলের কাছে সুপারিশ কর। অবস্থা বেগতিক দেখে আবু সুফিয়ান নিজের প্রাণের নিরাপত্তা সম্পর্কে শংকিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে নিজেই মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে: ওহে জনতা! আমি আপনাদের মাঝে আশ্রয় গ্রহণ করলাম। এ কথা বলেই নিজের বাহন উষ্ট্রীর ওপর চড়ে মক্কায় ফিরে যায়।

এর পরপর মহানবী (সা.) মুসলমানদের নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হন। ১০ হাজার মুসলমানের সবাই যুদ্ধের সাজে সজ্জিত। নবীজি যখন ‘যুল হুলাইফা’ বা ‘জুহফা’য় পৌঁছেন তখন আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব মক্কা হতে হিজরত করে মদীনায় চলে আসছিলেন। এমন সময় পথে সাক্ষাৎ পেয়ে তিনি রাসূলে পাকের সঙ্গী হয়ে যান।

রাসূলে পাক (সা.) যখন ‘মাররুয যাহরানে’ পৌঁছেন তখন সন্ধ্যা নেমে আসে। তিনি সঙ্গীদের হুকুম দিলেন প্রত্যেকে আলাদাভাবে (রাতের রান্না-বান্নার জন্য) আগুন জ্বালো। মুহূর্তে ১০ হাজার জায়গা হতে বিশাল প্রান্তর জুড়ে আগুন জ্বলে ওঠল। এ ছিল শত্রুপক্ষকে প্রভাবিত, ভীতসন্ত্রস্ত করা ও শক্তি প্রদর্শনের এক অভিনব রণকৌশল। তখনও মক্কার কুরাইশরা রাসূলে পাকের (সা.) যুদ্ধাভিযান সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি।

আবু সুফিয়ান, হাকীম ইবনে হাযাম ও বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা তিনজন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ঐ রাতে চক্কর দিতে বেরিয়েছিল। এদিকে রাসূলে পাক (সা.)-এর খচ্চরের ওপর সওয়ার হয়ে হযরত আব্বাসও (রা.) চক্কর দিচ্ছিলেন। আকস্মিকভাবে দু‘জনের সাক্ষাতের পর হযরত আব্বাস (রা.) এর প্রস্তাবক্রমে অনেকটা বাধ্য হয়ে আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করে। শুধু তাই নয়, তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে নবীজি ঘোষণা করনে, আজকের অভিযান চলাকালে যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি আপন ঘরে দরজা বন্ধ করে অবস্থান করবে সেও নিরাপদ। আর যে ব্যক্তি মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ। মহান রণকুশলীর এই ঘোষণায় মক্কার কুরাইশরা কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলার চিন্তা করেনি এবং বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয়ের পথ সুগম হয়।

মক্কার অদূরে ‘যীতূয়া’ এলাকায় পৌঁছে রাসূলে পাক (সা.) তার বাহিনীকে কয়েক দিক থেকে মক্কায় প্রবেশের হুকুম দেন। তারা রাসূলে পাক (সা.) যেসব পয়েন্ট নির্দেশ করেছিলেন, সেখান দিয়ে বিনা যুদ্ধে মক্কায় প্রবেশ করেন। শুধু একটি পয়েন্টে কতিপয় মুশরিকের প্রতিরোধের কারণে খালেদ ইবনে ওয়ালীদের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সঙ্গে সামান্য যুদ্ধ হয়।

মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলে খোদা (সা.) কুরাইশদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। কিন্তু ৬ জন পুরুষ ও ৪ জন নারীর ব্যাপারে নির্দেশ দেন, কাবাঘরের গিলাফে আত্মগোপন করলেও এদের হত্যা কর। এরা নবীজির সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও ইসলামের চরম শত্রুতা করেছিল। অবশ্য এদের মধ্যে কয়েকজন পরে ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের প্রাণদণ্ডও প্রত্যাহার করা হয়।

রাসূলে খোদা (সা.) মক্কায় পৌঁছে লোকেরা ধীরশান্ত হওয়ার পর মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন। স্বীয় উষ্ট্রীর ওপর সওয়ার অবস্থায় কাবাঘরের ৭ বার তাওয়াফ করেন এবং হাতের লাঠির সাহায্যে হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করেন। তাওয়াফ শেষে কাবাঘরে প্রবেশ করেন এবং তাতে কবুতর আকৃতির কাষ্টনির্মিত একটি ভাস্কর্য দেখতে পান। নিজ হাতে তা ভেঙে বাইরে নিক্ষেপ করেন। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন যে, কাবাঘরের আশপাশে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। রাসূলে পাকের নির্দেশে সেগুলো ভেঙ্গে চুরমার করা হয়। তিনি মূর্তিপূজা উৎখাত, মানুষের মানুষে সাম্য, আল্লাহর একত্ববাদ ও জাহেলী প্রথা উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে ভাষণ দান করেন এবং মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। রমযান মাস শেষ হওয়ার ১০ দিন আগে শুক্রবার ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়ের স্মরণি এই মক্কাবিজয় সম্পন্ন হয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত