
রমজানের সিয়াম সাধনার একটি বলিষ্ঠ অনুষঙ্গ আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা। দান-সদকার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কাছে যেমন প্রিয়ভাজন হতে পারে, তেমনি মানুষের সমাজেও সম্মানের আসনে অলঙ্কৃত হয়। হাদীস শরীফে দান সদকার এ মহাত্ম্যের কথা আরও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে।
নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, দানশীল ব্যক্তি আল্লাহর নিকটবর্তী, জান্নাতের নিকটবর্তী, মানুষের নিকটবর্তী এবং জাহান্নাম থেকে দূরে। আর কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহ থেকে দূরে, জান্নাত থেকে দূরে, মানুষের থেকে দূরে এবং জাহান্নামের নিকটে। এমনকি দানশীল অজ্ঞ ব্যক্তিও আল্লাহর কাছে কৃপণ আবেদ (ইবাদতকারী, বুজুর্গ) ব্যক্তির চেয়ে অধিক প্রিয়। -(মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৫১৯৪)
রমজানে যে কোনো নেক আমলের সওয়াব অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি। এই হিসাব একটি হাদীস সূত্রে পাওয়া। নবী করিম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো নফল ইবাদত (বা ফরজ নয় এমন সৎকর্ম) সম্পাদন করবে, বিনিময়ে তাকে অন্য সময়ে ঐ ধরনের কোনো ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব দেওয়া হবে। (মনে করুন, রমজানে কেউ ১০ টাকা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করল, তাহলে সওয়াবের পরিমাণ হবে অন্য সময়ে ১০ টাকা জাকাত আদায়ের সমপরিমাণ সওয়াব। নবীজি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন) কেউ যদি রমজানে কোনো ফরজ আমল করবে বা আল্লাহর ও রাসূলের পক্ষ হতে নির্ধারিত নির্দেশিত কোনো কাজ করবে, তার বিনিময়ে অন্য সময়ে ৭০টি ফরজ আমল করার সওয়াব রোজাদার পাবে। এখানে থেকে রমজানে দান সদকার সওয়াব কী পরিমাণ তা অনুমান করা যায়। এই হিসাব হাদীসের। দান সদকার সওয়াবের একটি হিসাব দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন মজীদে। সাধারণের কাছে বোধগম্য এ সম্পর্কিত উপমাটি বেশ মনমুগ্ধকর। আল্লাহ পাক বলেন, ‘যারা নিজেদের ধনৈশ্বর্য আল্লাহর পথে ব্যর করে তাদের উপমা একটি শস্যবীজ, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে এক শত শস্যদানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরও বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ -(সূরা বাকারা, আয়াত-২৬১)।
একেবারে সহজ হিসাব। মনে করুন, একটি টাকা দান করা মানে একটি ধান রোপণ করা। সেই ধান থেকে সাতটি শীষ বের হল আর প্রত্যেক শীষে ১০০ করে দান হলো। তাতে একে সাতশ হয়ে গেল। আল্লাহ পাক বলছেন, অঙ্ক এখানে শেষ নয়। এই বদলা, এই পুরস্কার আরও বাড়বে, আল্লাহ যাকে চাইবেন আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহর কাছে তো কোনো কিছুর কমতি নেই। বান্দার দান যখন ইখলাসের ভিত্তিতে হবে, অর্থাৎ নামদাম কুড়ানো বা লোক দেখানোর মনোভাব থেকে মুক্ত হবে এবং দানের পর খোঁটা দেয়া, কারও মনে কষ্ট দেওয়ার প্রবণতা থাকবে না, তখন দানের মর্যাদা অনেক অনেক বৃদ্ধি পায়।
ছোট্ট শিশুর বাবা, ভাই বা দাদা কোনো মিষ্টান্ন খাবার এনে তার হাতে দিল। পরক্ষণে শিশুর দিকে হাত পেতে বলল, আমাকেও একটুখানি দাও। অভিজ্ঞতা হচ্ছে, প্রায় সব শিশুই হাত গুটিয়ে বলবে, না দিমু না, এটি আমার। আবার এমন শিশুও আছে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনজনকে একটি অংশ দিতে রাজি হবে। ধন-সম্পদের বেলায় মানুষের অবস্থা এর ব্যতিক্রম নয়। মানুষ মনে করে, ধন সম্পদ আমার কষ্টার্জিত, আমারই পাওনা, নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে দেব কেন? আল্লাহ বলেন, সম্পদ মানুষের অর্জিত নয়, বরং আমারই দান। সম্পদ অর্জনের জন্য মানুষ কষ্ট করেছে সত্য; কিন্তু দান করেছি আমি নিজে। সূরা বাকারার শুরুতে মুমিনের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহপাক বলেন, আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। অর্থাৎ জীবিকা আল্লাহর দেওয়া। একই মার্কেটে একই পুঁজি নিয়ে দুজন ব্যবসা করছে তাতে একজন লাভবান হয় আরেকজন দোকান ভাড়াও জোগাড় করতে পারে না। ছোটবেলা থেকে একই ক্লাসে লেখাপড়া করে বড় হয়েছে। কর্মজীবনে গিয়ে দেখা যায়, ছাত্রাবস্থায় পিছিয়ে থাকা বন্ধুটি বিরাট অর্থবিত্তের মালিক, অথচ যে বুদ্ধিমান ছিল সে আর্থিক দৈন্যতার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। একসময় প্রতিবেশী ছিল দিনমজুর, এখন তার ছেলেমেয়েরা বিরাট মান সম্মান অর্থ সম্পদের মালিক, অথচ অভিজাত হিসেবে পরিচিত খান্দানী ঘরের সন্তানরা ভবঘুরে হয়ে জীবন কাটায়। এর একমাত্র কারণ, সম্পদ মানুষের অর্জিত নয়, বরং আল্লাহর যাকে ইচ্ছা প্রাচুর্য দান করেন। এ কথা বোঝার পর আমাদের মনের দুয়ার খুলে যাওয়া উচিত। দুহাতে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার চেতনায় উজ্জীবিত হওয়া চাই। হাদীস শরীফে বর্ণিত, রমজানে রাতে জিবরাঈল (আ.) নবীজির কাছে আসতেন। তখন জিবরাঈল (আ.) ও নবী করিম (সা.) পরস্পর কোরআন পড়ে শোনাতেন। এ সময় নবীজির দানশীলতা প্রবাহমান বাতাসের চেয়েও গতিশীল হয়ে যেত। আল্লাহ পাক আমাদের উদার মন, পবিত্র জীবন ও মানুষের খেদমতে প্রফুল্লতা দান করুন।