
ইরানে আগ্রাসন শুরু করে ডুবোচরে আটকা পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নানাভাবে এই যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও নমনীয় হচ্ছে না তেহরান। শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে চায় আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দেশ।
এমতাবস্থায় মিত্র দেশগুলোর কাছে সাহায্য চাচ্ছেন ট্রাম্প, কিন্তু কেউ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে আগ্রহী নয়। এমনকি পশ্চিমা সামরিক জোট-ন্যাটোও মার্কিন প্রেসিডেন্টের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না। ইরানের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিশ্বের জ্বালানি পরিবহণের করিডোরখ্যাত হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে ন্যাটো মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন ট্রাম্প। একে একে সবাই তার দাবি প্রত্যাখ্যান করছে। ট্রাম্পের জন্য নতুন এক ধাক্কা হিসেবে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে ‘প্রায় সাতটি’ দেশের সহায়তা চেয়েছিলেন। তিনি ন্যাটোকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, যদি মিত্র দেশগুলো এই সামুদ্রিক পথটি উন্মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করতে অস্বীকার করে—যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে- তবে এই জোটকে ‘খুবই খারাপ ভবিষ্যতের’ মুখোমুখি হতে হবে। গতকাল সোমবার ব্রাসেলসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুল বলেন, ‘আমি দেখছি না যে ন্যাটো এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা হরমুজ প্রণালির দায়িত্ব নিতে পারে। যদি তেমনটি হতো, তবে ন্যাটোর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিত।’ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ আকাশপথ বন্ধ থাকায় অসংখ্য ফ্লাইট বাতিল, পুনঃনির্ধারণ এবং পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। একইসঙ্গে, এই সংকট জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দামের ব্যাপক বৃদ্ধি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্পের সহায়তার আহ্বানে ব্রিটেন-জার্মানি-গ্রিসের না : যুক্তরাজ্য কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারির পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে নিজ দেশের না জড়ানোর বিষয়ে ওই মন্তব্য করেছেন তিনি। একদিন আগে সতর্ক করে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাজ্যসহ মিত্র দেশগুলো যদি এই অঞ্চলে সামরিক সহায়তা প্রদান না করে, তাহলে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের এমন হুমকির পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং নিজেদের ও মিত্রদের রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাই যুক্তরাজ্যের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, ব্রিটেন নিজেকে কোনো ব্যাপক সংঘাতের অংশ হতে দেবে না এবং ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাবে।
এদিকে, ইরানের যুদ্ধের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে জার্মানি। জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, জার্মানি এই যুদ্ধে অংশ নেবে না এবং সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার কোনও অভিযানেও যোগ দেবে না। তিনি বলেন, যতদিন এই যুদ্ধ চলবে, জার্মানি কোনোভাবেই এতে অংশ নেবে না। এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি সচল রাখার কোনও প্রচেষ্টাতেও আমাদের অংশগ্রহণ থাকবে না। একইভাবে গ্রিসও হরমুজ প্রণালিতে কোনও ধরনের সামরিক অভিযানে জড়াবে না বলে জানিয়েছেন গ্রিক সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে দোটানায় ট্রাম্প : ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ দু’সপ্তাহে গড়িয়েছে। আর এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন যুদ্ধের সূচনাকারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন প্রশ্ন, তিনি কি যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন- নাকি ক্রমেই বিস্তৃত ও তীব্র হয়ে ওঠা এই সংঘাত থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার পথ খুঁজবেন।
যুদ্ধ শুরু করার সময় ট্রাম্প প্রশাসন যে ঝুঁকিগুলোকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছিল, বাস্তবে সেগুলোর প্রভাব এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধ চালিয়ে গেলে একদিকে দুর্বল হয়ে পড়া ইরানের ওপর আরও চাপ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, তবে এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সামরিক পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
যুদ্ধের ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বাড়ছে এবং মার্কিন সেনাদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, কারণ তিনি নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন যুদ্ধের মধ্যে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, যদি যুক্তরাষ্ট্র এখনই যুদ্ধ থেকে সরে আসে, তাহলে ট্রাম্পের ঘোষিত বেশিরভাগ লক্ষ্যই অপূর্ণ থেকে যাবে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ইরানকে যেন আর কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না দেওয়া। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে এখন পর্যন্ত ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে।
এই সংঘাতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইরান। তবে দেশটির ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এখনও টিকে আছে এবং নেতৃত্বে নতুন শক্তি উঠে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনও সাইবার হামলা, সমুদ্রপথে মাইন পাতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২,১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইরানের নাগরিক। জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১,৩০০ জন বেসামরিক মানুষ। এদিকে যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের সাহস থাকলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ পাঠাক- ইরানের চ্যালেঞ্জ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সেই দাবি নাকচ করেছে। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সাহস থাকলে’ পারস্য উপসাগরে জাহাজ পাঠিয়ে দেখতে পারে সেটার কী পরিণতি হয়। তুরস্কের রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাইনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি আইআরজিসি নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এর ওপর ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প কি বলেননি যে- তিনি ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করেছেন? তাহলে সাহস থাকলে তিনি তার জাহাজ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠাতে পারেন।’
ইসরায়েলে শব্দের ১২ গুণ গতির ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ নিক্ষেপ ইরানের : ইরানি সশস্ত্র বাহিনী তাদের অপারেশন ‘ট্রু প্রমিজ-৪’ অভিযানের ৫৪তম ধাপ শুরু করেছে। এই ধাপে ইসরায়েলি ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে দেশটি। এতে নানা ধরনের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যার মধ্যে ছিল সিজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রও। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া আরোপিত যুদ্ধের পর এই প্রথম সিজ্জিল ব্যবহার করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, আইআরজিসি গত রোববার জানায়, প্রতিশোধমূলক এই অভিযান ‘ইয়া জাহরা’ কোডনেম বা সাংকেতিক নামে পরিচালিত হয়েছে। এ অভিযানে সুপার-হেভি খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্র (দুটি ওয়ারহেডসহ), খাইবার, গদর, ইমাদসহ বহু ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত সিজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রটি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করে, তার পর প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ব্যবহার করে ইসরায়েলি রেজিমের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সিজ্জিলের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ মিটার এবং প্রস্থ ১ দশমিক ২৫ মিটার। এর ওজন ২৩ হাজার ৬০০ কেজি এবং এটি ৭০০ কেজি ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এতে প্রচলিত বিস্ফোরক যেমন বহন করা যায়, তেমনি পারমাণবিক ওয়ারহেডও বহনের ক্ষমতাও রয়েছে।
এর গতিবেগ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য খুব বেশি নেই। তবে তেহরান অতীতে জানিয়েছে, মধ্য ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা হলে এটি প্রায় সাত মিনিটে তেল আবিবে পৌঁছাতে সক্ষম। উড্ডয়নের সব পর্যায়েই সিজ্জিল দিক পরিবর্তন করতে পারে (ম্যানুভারেবল)। ফলে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে এটিকে প্রতিহত করা কঠিন। এমনকি ইসরায়েলের বহুল পরিচিত আয়রন ডোম ব্যবস্থাও এটিকে সহজে ঠেকাতে পারে না। এই উচ্চ ম্যানুভার ক্ষমতার কারণেই এর ডাকনাম হয়েছে ‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’ বা ‘ড্যান্সিং মিসাইল।’ ইরান থেকে ইসরায়েলের দূরত্ব ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার ধরলে বলা যায়, প্রতি মিনিটে এই ক্ষেপণাস্ত্র ২৪৩ কিলোমিটার বা প্রতি সেকেন্ড ৪ হাজার ৫০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। যা কি না শব্দের গতির চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি দ্রুত। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এর সর্বোচ্চ গতি শব্দের গতির ১৩ গুণ বা মাক ১৩ পর্যন্ত হতে পারে।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে কখনোই বিশ্বাস করে না ইরান : ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আলোচনার সময় তার দেশ কখনোই যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করেনি। তিনি জানান, অত্যন্ত সজাগ থেকে এবং প্রতিপক্ষের প্রতি চরম অবিশ্বাস নিয়েই আলোচনা চালানো হয়েছে। বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধগুলো ইতিহাসের পাতায় কলঙ্ক হয়ে থাকলেও ইরান এটি প্রমাণ করেছে যে, তারা আলোচনায় বসতে দ্বিধাবোধ করে না।
যুদ্ধে না জড়াতে তৃতীয় পক্ষকে সতর্ক করল ইরান : ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। তেহরান জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ইরানের অন্তত ২০০টি শহরে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ইরান তাদের সব সামরিক ও কৌশলগত শক্তি ব্যবহার করে পাল্টা আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপে হামলার পর ইরানের পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করতে দেবে না। এই জলপথটি বন্ধ করে দেওয়াকে তারা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের একটি বড় অংশ হিসেবে দেখছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই সংকটে যদি তৃতীয় কোনো দেশ সরাসরি জড়িয়ে পড়ে বা প্রতিপক্ষকে সহায়তা করে, তবে তাদেরও চরম পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। ইরানের এই কঠোর অবস্থান মূলত প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি একটি আগাম সতর্কবার্তা।
আমিরাতে ইরানের হামলা, দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা : সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশ-প্রতিরোধী ব্যবস্থা এখন ইরান থেকে উড়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের হুমকি মোকাবিলা করছে। এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে যে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, তা আসলে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনগুলোকে সেদেশের আকাশ-প্রতিরোধী ব্যবস্থার প্রতিহত করার শব্দ। খবর বিবিসির।
এর আগে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল সাময়িক ভাবে স্থগিত রাখার কথা জানায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। সোমবার ভোরে বিমানবন্দরের কাছেই একটি ড্রোনের আঘাতে জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে যায়। এর কিছুক্ষণ পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায় যে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
৬০টির বেশি ড্রোন ধ্বংসের দাবি সৌদির : সৌদি আরব গতকাল সোমবার ভোরে ৬০টির বেশি ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একাধিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে এসব ড্রোন সফলভাবে বাধা দেয়।
ইরানি হামলার নিন্দা জানাল সৌদি-আমিরাত : সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চলমান ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা এসব হামলাকে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি বলে উল্লেখ করে বলেছেন, এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার দুই নেতা টেলিফোনে কথা বলেন। আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং এর ফলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়। দুই নেতা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের ধারাবাহিক হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি একটি গুরুতর উত্তেজনা সৃষ্টি করছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। তারা বলেন, এসব হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌম অধিকারের লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক নিয়মেরও পরিপন্থী।
দুই নেতা বলেন, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) সদস্য দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগানো হবে বলেও জানান তারা।
যুদ্ধ বন্ধে ‘প্রস্তুত নয়’ ইরান, তবে আলোচনা চলছে- ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে, তবে ইরান এখনও কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। গত রোববার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি।’ আলোচনার ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত না জানালেও তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় না তারা এখনও (চুক্তির জন্য) প্রস্তুত। তবে তারা খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে।’
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান বর্তমানে একটি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে আছে। তবে তিনি নিজেই চুক্তির বিষয়ে কিছুটা দ্বিধা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই যে আমি এখনই কোনো চুক্তি করতে চাই কি না। কারণ প্রথমত, আপনি কার সঙ্গে কথা বলছেন সেটাই নিশ্চিত নয়; তাদের অধিকাংশ নেতৃত্বই তো নিহত হয়েছে।’
ট্রাম্প আলোচনার দাবি করলেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরাসরি তা অস্বীকার করেছেন। সিবিএস-এর ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমেরিকানদের সঙ্গে কথা বলার কোনো কারণ আমরা দেখছি না। যখন তারা আমাদের ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, তখনও আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনায় ছিলাম।’
ইরানের ড্রোন কারখানায় হামলার দাবি ট্রাম্পের : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ড্রোন কারখানাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানান তিনি। খবর আল জাজিরার।
ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন জায়গাগুলোতে ‘আক্রমণ’ করছে যেখানে ইরান আমেরিকা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানোর জন্য ড্রোন তৈরি করছে। তিনি বলেন, ইরানের কাছে খুব কম অস্ত্রশক্তি অবশিষ্ট আছে। আমরা তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছি। ট্রাম্প আরও বলেন, একইভাবে ড্রোন অনেক কমে গেছে, তাদের যা আছে তা প্রায় ২০ শতাংশ। গতকাল পর্যন্ত আমরা এমন জায়গাগুলোতে আঘাত করেছি যেখানে তারা এগুলো তৈরি করে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের ইতি টানতে চুক্তি করতে চায় বলে দাবি করলেও তেহরান এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার কোনো কারণ দেখছে না তার দেশ। গত রোববার সম্প্রচারিত সিবিএস টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ‘ফেস দ্য নেশনে’ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহী নয়। আমরা যথেষ্ট স্থিতিশীল ও শক্তিশালী। আমরা শুধু আমাদের জনগণকে রক্ষা করছি। আরাঘচি আরও বলেন, আমরা বুঝতে পারছি না কেন আমাদের আমেরিকানদের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কারণ আমরা যখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করছিলাম, তখনই তারা আমাদের ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।