
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাদী দল-বিএনপি। দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহন করেন প্রথমবারের মতো সংসদে যাওয়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের একমাসের মধ্যেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এমন কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন, যা বাংলাদেশে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। এছাড়াও এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন যা দেশের রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের আমলাদের ওপর প্রভাব ফেলার পাশাপাশি জনগণের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানি প্রদান : ১৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের সরকারি সম্মানি প্রদান কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেছেন। এর ফলে দেশের হাজার হাজার মসজিদের ইমামণ্ডমুয়াজ্জিন এবং মন্দির, বিহার ও গির্জার সেবকরা প্রথমবারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রীয় ভাতার আওতায় এলেন।
খাল খনন : প্রধানমন্ত্রী গতকাল সোমবার দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা থেকে দেশের ৫৩টি খালের খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি নিয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-৩ শাখা থেকে এক পত্রের মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড : বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে অন্যতম একটি প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। নির্বাচনের আগে ও পরে এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে নানা অপ-প্রচার চালানোর চেষ্টা করেছে বিভিন্ন মহল। ফলে দেশের জনগণের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রাপ্তির বিষয়ে। সব উদ্বেগ দূর করে তারেক রহমান ১০ মার্চ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। যার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই দ্রুত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় দেশের মানুষ।
শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না : সংসদীয় দলের প্রথম সভায় বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দলটির কোনো এমপি শুল্কমুক্ত গাড়ি বা সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। শপথের পর অনুষ্ঠিত সভায় এ নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা গণমাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে।
কৃষক কার্ড : বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে আরেকটি প্রতিশ্রুতি ছিল ‘কৃষক কার্ড’। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আগামী ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ নাগাদ দেশের আটটি জেলার ৯টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৫ হাজার কৃষক এই কার্ড পাবেন।
১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত : ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেছেন, ‘সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো দরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করা।’
ই-হেলথ কার্ড : সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই জনগণের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য ও আধুনিক করতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
ট্রাফিক গিগন্যাল মেনে চলা : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ভিআইপি প্রটোকল ছাড়া চলাচল এবং ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী। রাজধানীতে জনদুর্ভোগ এড়াতে প্রধানমন্ত্রী যাত্রাপথে সড়কের দুই ধারে পুলিশের অবস্থানের যে নিয়ম, তাও বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এমনকি যানজটের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তার গাড়িবহরের সংখ্যা কমিয়ে ১৩-১৪টি থেকে কমিয়ে চারটি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্তে রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে যানবাহনের গতি বেড়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত জনগণের মন কেড়েছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় : বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজ দফতরে (সচিবালয়ের ২০১ নম্বর কক্ষ) ৫০ শতাংশ লাইট ও ৫০ শতাংশ এসি ব্যবহার কমিয়ে একটি ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছেন। তার এই সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ অপচয় রোধে জনগণকে দারুণভাবে উৎসাহিত করছে বলে মনে করে রাজলৈনিতক বিশ্লেষকরা ও দেশের সাধারণ মানুষ।
সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক : প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক হলে মন্ত্রীদের সচিবালয় থেকে আসতে যানজট সৃষ্টি হয়, ভিআইপি চলাচলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির মুখে পড়ে। সেসব কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী বেশির ভাগ সময় সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা অতীতে কোনো প্রধানমন্ত্রীকে করতে দেখা যায়নি।
সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি না ব্যবহারের সিদ্ধান্ত : প্রধানমন্ত্রী তার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করে নিজের গাড়ি, চালক ও কেনা জ্বালানি ব্যবহার করছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেশের চলমান দুর্নীতি ও অনিয়মকে অনুৎসাহিত করবে বলে মনে করছে সাধারণ মানুষ।
জাকাত বোর্ড পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে জাকাত ব্যবস্থাপনাকে কীভাবে আরো কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করা যায় সেই সম্ভাবনা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। কার্যকর জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কীভাবে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব, তা নিয়ে দেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের নেতৃত্বে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক ও আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ এবং শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্ট আলেমণ্ডওলামাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
মাননীয় সম্বোধনে আপত্তি : সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক ‘মাননীয়’ প্রধানমন্ত্রী সম্বোধন করলে ‘মাননীয়’ না বলার অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই বিনয় দেশকে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার হাত থেকে রক্ষা করবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়া : অতীতে জাতীয় সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি ও সরকারি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার নজির থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিএনপি দলীয় সদস্যদের সরকারী প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই সিদ্ধান্তকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছে দেশের জনগণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণ দেখছে নতুন এক বাংলাদেশকে। দেশের মাটিতে পা রেখেই তারেক রহমান বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তার প্ল্যান বাস্তবায়নে প্রতিনিয়তই নিচ্ছেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এত সাহসী পদক্ষেপ এর আগে বাংলাদেশে কোনো সরকারপ্রধান নিতে পারেননি। শুধু তা-ই নয়; বিশ্বেও তার কিছু পদক্ষেপ নজিরবিহীন।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি রাজনীতির ধারা পরিবর্তন করতে চাইছেন। জাতির জন্য ভবিষ্যতে অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, আমাদের দেশের প্রচলিত সেই নিয়ম ভাঙতে চাইছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতার দাপট নয়, ইতিবাচক ধারার রাজনীতি চালু করতে চাইছেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এদিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টার আগেই সচিবালয়ে প্রবেশ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ কাজ না থাকলেও তিনি সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে চলে আসছেন। এমনকি ছুটির দিন শনিবারেও তার কার্যালয়ে বসছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই নিয়মানুবর্তিতা এখন অভ্যাস বদলে দিচ্ছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। সচিবরাও এখন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে অফিসে হাজির হওয়ার চেষ্টা করছেন। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে সবার আগে অফিসে এসে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। এতে অনেক কর্মকর্তার পুরোনো অভ্যাস বদলাতে শুরু করেছে। অপরদিকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমাদের হাতে বিলাসিতা করার মতো সময় নেই। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখাতে হবে, অন্যথায় আপনাদের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। এই মন্ত্রিসভায় আপনার টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে আপনার দক্ষতা এবং কাজের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করবে। আপনি যদি জনগণের জন্য ফলাফল দিতে না পারেন, তবে আপনি এমন একটি আসন দখল করে আছেন, যা আপনার চেয়ে যোগ্য কারও প্রাপ্য।