
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সেই ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’ এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, মার্কিন ঘাঁটির সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও একের পর এক হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন সাহায্যের জন্য ইউক্রেন, ফ্রান্স কিংবা ইতালির মতো বিকল্প দেশগুলোর দিকে হাত বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
পত্রিকাটি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা এই আঞ্চলিক যুদ্ধে এখন খোদ মার্কিন মিত্ররাই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সুরক্ষা কবচের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ আরব রাজপরিবার এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ক্ষোভ ও সংশয় দানা বাঁধছে।
ইরানি হামলার মুখে মার্কিন প্রযুক্তির ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বজুড়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই সৌদি আরব এখন ইউক্রেনের শরণাপন্ন হয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানি মডেলের ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে চায় রিয়াদ। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিরক্ষা সহায়তার জন্য ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। শুধু তাই নয়, ইতালি সরকারের কাছেও ড্রোন-বিধ্বংসী ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে অনুরোধ পাঠিয়েছে বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইডো ক্রোসেত্তো গত সপ্তাহে সে দেশের আইনপ্রণেতাদের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংকটের বিবর্তন নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, এখন সময় এসেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করার। ওমান ডেইলি পত্রিকা এই খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে।
সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইনকে যুক্তরাষ্ট্র প্রধান অ-ন্যাটো সহযোগী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছে। আমিরাতও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে এই তকমাগুলো খুব একটা কাজে আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উপসাগরীয় অঞ্চলের গবেষণা সংস্থা গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামণ্ডএর সিনিয়র ফেলো আব্দুল আজিজ আলঘাশিয়ান বলেন, এখন এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে গ্যারান্টি বলতে আসলে কোনও গ্যারান্টিই নেই।
তবে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে বলেছেন, মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কেলি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন। ইরানের হামলা প্রমাণ করে যে আমাদের দেশ ও মিত্রদের জন্য এই হুমকি নির্মূল করা কতটা জরুরি ছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে এই অভিযান শুরু করেছেন। তাত্ত্বিকভাবে সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর কাছে এটি আকর্ষণীয় মনে হলেও তারা যুদ্ধের চেয়ে কূটনীতিকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছিল। তাদের প্রধান ভয় ছিল যে ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা সফল না হলে সেখানে একটি অস্থিতিশীল বা ব্যর্থ রাষ্ট্র তৈরি হবে, যা পুরো অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ইরানে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের প্রতিনিধি জানিয়েছেন। এর পাল্টা জবাবে ইরান ছয়টি উপসাগরীয় দেশে ৩ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে।
ইরানি হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমানবন্দর, হোটেল এবং পানি শোধনকেন্দ্রের মতো বেসামরিক স্থাপনা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই অভিবাসী শ্রমিক।
অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও আকাশচুম্বী। বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিমান চলাচলের কেন্দ্র কাতার ও আমিরাত তাদের ফ্লাইট উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে। পর্যটকরা স্থল সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। জ্বালানি শিল্পে নেমে এসেছে ধস। কাতার তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। ইরানের হামলার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করতে পারছে না আরব দেশগুলো। আমিরাতি ভাষ্যকার নাদিম কোটেইচ বলেন, ইরান ঠিকই তাদের তেল পাঠাচ্ছে, কিন্তু আরব দেশগুলো হামলার ভয়ে এই পথ ব্যবহার করতে পারছে না। এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই মিত্রতা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরেও এখন সমালোচনা হচ্ছে। নির্বাসিত সৌদি বিরোধী দলের মুখপাত্র মরিয়ম আলদোসারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধ করা উচিত। এগুলো কেবল ইসরায়েলকে রক্ষা করতে ব্যবহার করা হচ্ছে, আর বিনিময়ে আমাদের বেসামরিক নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে।
আমিরাতি ধনকুবের খালাফ আল-হাবতুর সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, কে আপনাকে আমাদের অঞ্চলকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে টেনে নেওয়ার অধিকার দিয়েছে? ট্রিগার টানার আগে কি আপনি আমাদের ক্ষতির কথা ভাবেননি?
অবশ্য ভিন্নমতও রয়েছে। আমিরাতের প্রতিমন্ত্রী রিম আল-হাশিমি এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্ব। সংকটের মুহূর্তে এই বন্ধুত্ব নড়বড়ে হওয়ার নয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এলিজাবেথ ডেন্ট নামে একজন সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত একটি সীমিত সম্পদ। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে উৎপাদন সংকটে আগে থেকেই এসবের দীর্ঘ সিরিয়াল পড়ে আছে।
এমন সংকটেও আত্মবিশ্বাস দেখানোর চেষ্টা করছে আরব দেশগুলো। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও অস্ত্র মজুত রয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান আহতদের দেখতে হাসপাতালে গিয়ে শত্রুদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমিরাতের চামড়া অনেক মোটা এবং এর মাংস অনেক তিতা। আমরা কোনও সহজ শিকার নই।