ঢাকা সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভূমধ্যসাগরে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু, ১০ জনই সুনামগঞ্জের

ভূমধ্যসাগরে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু, ১০ জনই সুনামগঞ্জের

নৌকায় চড়ে ইউরোপের উদ্দেশে সাগর পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন সত্যি হলো না। লিবিয়ার ‘গেম ঘর’ থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এই প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার পর সরকারের কাছে ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য আসে। এছাড়া বেশ কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করে গ্রিসের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে।

বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে পাঁচজন জগন্নাথপুর উপজেলার, চারজন দিরাই উপজেলার এবং একজন দোয়ারাবাজার উপজেলার।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘসময় সমুদ্রে ভেসে থেকে তাদের মৃত্যু হয়েছে। সুনামগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘যেহেতু তারা বৈধ পথে যাননি, তাই সরকারিভাবে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল না। তবে আমরা স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে তথ্য সংগ্রহ করতে, যাতে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জীবিত উদ্ধার হওয়া একজন জানান, একটি ছোট নৌকায় তারা ৪৩ জন ছিলেন, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। তাদের একটি বড় নৌকায় পাঠানোর কথা বলে শেষ মুহূর্তে ছোট নৌকায় তুলে দেয় পাচারকারীরা। যাত্রাপথে তাদের কোনো জিপিএস বা যোগাযোগের ডিভাইস দেওয়া হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভাসতে থাকায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মৃতদের লাশ সাগরে ছুড়ে ফেলা হয়। পাচারকারী চক্রের অনেকের বাড়ি সিলেটে বলেও তিনি দাবি করেন।

প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানান, বাংলাদেশ মিশন এরইমধ্যে গ্রিসের কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহযোগিতা এবং নিহতদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার উপায় খোঁজা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মানুষের জীবনকে টাকা বা সম্পদের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। মানুষ যখন স্বেচ্ছায় অবৈধ পথে যায়, সেখানে সরকারের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।’

উল্লেখ্য, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী তবরুক থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তবরুকসহ লিবিয়ার বিভিন্ন ‘গেম ঘরে’ এখনও অনেক বাংলাদেশি আটক থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রাকে দালালেরা ‘গেম’ বলে। লিবিয়ার যেসব জায়গায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রাখা হয় এবং পরে নৌকায় তোলা হয় সেই জায়গাগুলোকে দালাল ও অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ‘গেম ঘর’ বলে।

গ্রিসে যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের ১০ যুবকের মৃত্যুতে জেলাজুড়ে শোকের ছায়া : লিবিয়া থেকে নৌকায় গ্রিসে যাওয়ার পথে সাগরে পথ হারিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অন্তত ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জের অন্তত ১০ জন রয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন হাওর অঞ্চলের অনেক যুবকদের। তবে সেই প্রবাস পাড়ি দেওয়ার পথটি এরইমধ্যে অনেকেই দালালের মাধ্যমে বেঁচে নিচ্ছেন। ফলে উন্নত জীবন তো দূরের কথা সেই প্রবাসে যেতে গিয়ে কেউ মাফিয়া চক্রের পাল্লায় পড়েছেন, কেউবা কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরছেন আবার কেউবা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছেন সমুদ্রের গভীর নোনাজলে।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের ৭০ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল গনি। ৩ ছেলে ৪ মেয়েকে নিয়ে সাজানো সংসার। তবে গণির ছোট ছেলের বায়না পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে দূর প্রবাসে পাড়ি দেবে। নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধ বাবা ঋণ করে ১২ লাখ টাকা জোগাড় করে ছেলেকে দালালের মাধ্যমে গ্রিসে পাঠালেও সেই ছেলের মৃত্যু হয় সমুদ্রের মধ্যে। সেই শোকে কাতর হয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে বাড়ি সামনে বসে অঝোরে কাঁদছেন বৃদ্ধ বাবা।

আব্দুল গনি জানান, জায়গা বিক্রি করে টাকা দিলাম। দালালকে অনেক অনুরোধ করলাম ছেলে যেন ভালো মতে পৌঁছে, কিন্তু সেটা আর হলো না। এখন একটাই চাওয়া শেষবারের মতো ছেলের নিথর দেহটা দেখতে চাই। তবে একই গ্রামের আরও দুই যুবক কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়াসহ (২২) একই উপজেলার ৫ যুবকের মৃত্যু হয়।

মূলত অবৈধভাবে গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরের পথ ভুলে খাবার আর বিশুদ্ধ পানির অভাবে একে একে মৃত্যু হয় সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের ৫, জগন্নাথপুরে ৪ ও দোয়ারাবাজার একজনসহ তিন উপজেলার ১০ যুবকের। এতে জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত দিরাইয়ের এক যুবকের মামা মো. আরশাদ বলেন, সংসারের হাল ধরতে দালালের মাধ্যমে আমার ভাগনে গ্রিসের পথে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু সেটা আর হলো না। গ্রিসে যাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হলো। নিহত মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না আত্মীয় রাহুল মিয়া বলেন, দালালকে ১২ টাকা ঋণ করে দিয়ে আমাদের সন্তানদের মরতে হলো। আমরা এখন কী নিয়ে বাঁচব? দালালদের শাস্তি চাই।

দিরাইয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকার বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানানো হয়েছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। যারা অবৈধভাবে গ্রিস যেতে চেয়েছিল তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।

লিবিয়ার বন্দিশালায় দুই বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু, লাশের অপেক্ষায় পরিবার : লিবিয়ায় বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরের দুই যুবক নিহত হয়েছেন। এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে তাঁদের মৃত্যু হলেও পরিবারের কাছে তা গোপন রাখা হয়েছিল। নিহত দুই যুবকের লাশ দ্রুত দেশে আনার দাবি করেছে পরিবারগুলো।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত