
আলোচিত দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে মনবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ৭ এপ্রিল তাদের হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রোববার এ আদেশ দেয়। প্রসিকিউশন কার্যালয় জানায়, জুলাই-অগাস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞ এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুমের অভিযোগে দুটি মামলায় ‘প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট’ জারির মাধ্যমে ওই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। গতকাল সকালে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম ট্রাইব্যুনাল-২ এ আবেদনটি দাখিল করেন। প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদকে গুমের মামলায় এবং সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের সাবেক জিওসি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ফেনীতে জুলাই হত্যাযজ্ঞের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
মামুন খালেদকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মিরপুর মডেল থানাধীন দেলোয়ার হত্যা মামলায় এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পল্টন থানার একটি মানব পাচার মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। বর্তমানে তারা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম রোববার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, এই দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলের আয়নাঘরকেন্দ্রিক গুম, খুন ও নির্যাতনের পাশাপাশি এক-এগারোর সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
‘তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে আয়নাঘরের মতো অমানবিক কর্মকাণ্ড করেছেন। এক-এগারোর সময় সেইফ হাউজের মত জায়গা সৃষ্টি করে সেখানে মানুষকে ধরে নির্যাতন করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অসংখ্য অভিযোগ এরইমধ্যে আমাদের কাছে এসেছে।’
এক-এগারোর সময় দেওয়া আইনি দায়মুক্তি এসব বিচারের ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা সৃষ্টি করবে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘আমরা কোনো দায়মুক্তিতে বাধ্য নই। ট্রাইব্যুনাল স্বাধীনভাবে তদন্ত করবে। মানবতাবিরোধী কোনো অপরাধের অভিযোগ যদি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হয়, স্বাধীনভাবে বিচারকার্য চলবে। কোনো ইনডেমনিটি আমাদের কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।’ তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে এখনই সব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে না। ৭ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পর তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
আলোচিত দুই এসনা কর্মকর্তা : ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হত।
সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হত। বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পরে চার তারকা জেনারেল হন) মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি কার্যত সেই প্রভাবশালী কমিটি (গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি) পরিচালনা করতেন, যাদের নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও সে সময় আটক করা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। বন্দি অবস্থায় তারেক রহমানকে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০০৮ সালের জুনে লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠানো হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে সেই দায়িত্বে রাখে। অবসরের সময় হয়ে গেলে তার চাকরির মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পাশাপাশি শুরু করেন জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা। ২০১৮ সালে তিনি এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার দুদিন পর ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি এক সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক ছিলেন। পরে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার এক মামলায় তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড পাঠায় আদালত।
ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ রয়েছে শেখ মামুনের বিরুদ্ধে। এক-এগারোর সময় তার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
সিগন্যালস কোরের কর্মকর্তা হিসেবে শেখ মামুন ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ডিজিএফআইতে পরিচালক (এফএসআইবি) হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০০৮ সালের জুনে তিনি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো-সিআইবির পরিচালকের দায়িত্ব পান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে শেখ মামুন মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে ডিজিএফআইতে ফিরে আসেন। প্রায় দেড় বছর তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন। পরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) উপাচার্য এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) কমান্ড্যান্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে এই তিন তারকা জেনারেল।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের মে মাসে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্ত্রীসহ শেখ মামুন খালেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আদালত। তখন দুদক তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদসংক্রান্ত বিষয়ে অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছিল।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ৯ এপ্রিল : ট্র্যাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি জানান, জুলাই আন্দোলনের মধ্যে রংপুরের আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় পূর্বনির্ধারিত তারিখ আগামী ৯ এপ্রিলই দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘এই মামলায় ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে একজন আসামির সরাসরি সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলেও, পরবর্তী দুদিনের ভিন্ন দুটি ঘটনায় তার সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ মিলেছে।’
‘ওই আসামিকে নতুন দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে তদন্তের গোপনীয়তার স্বার্থে ওই আসামি বর্তমানে দেশে আছেন কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা যানে না।’
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদণ্ডখালেদ ‘আওয়ামী লীগের দোসর ও দুষ্কৃতকারী’- চিফ প্রসিকিউটর : প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ এবং আরেক সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর’ এবং ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, তাদের অতীতের বহু কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে গতকাল রোববার দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। এর আগে আজ সকালে ট্রাইব্যুনাল ২-এ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যা ও শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ আনা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৭ এপ্রিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে হাজির করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা এরমধ্যেই জেনেছেন যে আমাদের এক-এগারো এবং পরবর্তী সময় আমাদের ফ্যাসিস্ট সরকার আওয়ামী লীগের দুইজন দোসর, অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত। যারা এই দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন বিনষ্ট করবার জন্যে এবং আয়নাঘরসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে খুন, গুম ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত; সেই রকম দুইজন দুষ্কৃতকারী কর্মকর্তা একজন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, আরেকজন হচ্ছেন শেখ মামুন খালেদ। আপনারা দেখেছেন, এরইমধ্যে তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এবং তারা অন্য মামলায় পুলিশি হেফাজতে বা রিমান্ডে আছেন। তাদের অতীতের যে কর্মকাণ্ড, তাদের বহু কর্মকাণ্ড, আমাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায়িত অপরাধের মধ্যে পড়ে।’ অভিযুক্ত দুই আসামির সব অভিযোগ এখনই প্রকাশ করার সুযোগ নেই উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আজকে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে এই দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।