
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভাবনীয় মাত্রায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করেছে, ধ্বংস করেছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা। তা সত্ত্বেও, ইরান তার ‘অসম’ ও বিদ্রোহী কৌশলের মাধ্যমে এখনো টিকে রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইরান কার্যত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করেছে, যার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। অন্যদিকে, কোনো সুস্পষ্ট বিজয় বা কার্যকর এক্সিট স্ট্র্যাটেজি না থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে পাল্টা হুমকি দিয়েছে তেহরানও। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হওয়া মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমস। মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এরই মধ্যে সাড়ে তিন হাজার নাবিক ও মেরিন সেনাকে বহনকারী ইউএসএস ত্রিপোলি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে এবং পেন্টাগন এর পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিষয়ে দেশটিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তেহরান টাইমস। ‘ওয়েলকাম টু হেল’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে মার্কিন সেনাদের একটি ছবি প্রকাশ করে লেখা হয়েছে, ‘ওয়েলকাম টু হেল’। ইরানের মাটিতে যেসব মার্কিন সেনা পা রাখবে তারা কফিনে করে ফিরে যাবে বলে উল্লেখ করা হয়। এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কূটনীতির বাইরে আরও সামরিক বিকল্প দেওয়ার জন্য পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে ১০ হাজার পর্যন্ত অতিরিক্ত স্থলসেনা মোতায়েনের কথা বিবেচনা করছে। যেসব সেনারা এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঠিক কোথায় মোতায়েন করা হবে তা স্পষ্ট নয়। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, তারা ইরান এবং এর গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের নাগালের মধ্যে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র স্থল হামলা চালালে আমিরাতকে তছনছ করা হবে : ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে স্থল হামলা চালায় তাহলে আমিরাতকে তছনছ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাদের বিশ্বাস, এই স্থল হামলা হবে আমিরাত থেকে। এ কারণে আমিরাতকেই তারা সরাসরি শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে ব্যাপক পাল্টা হামলা চালাবেন। সংবাদমাধ্যম মিডেল ইস্ট আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা এমন হুমকি দিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর যৌথ হামলার পর যুদ্ধ এক মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রেখেছে। এখন এই প্রণালী খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থল হামলার পরিকল্পনা করছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মার্কিনিদের স্থল হামলার টার্গেট হবে খার্গ দ্বীপ। যেখান থেকে ইরান তাদের ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে। আর মার্কিনিদের স্থল হামলা শুরু হতে পারে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো থেকে। যেগুলোতে যুদ্ধের প্রথম থেকেই অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে আমিরাত এখনই তাদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান এখন বুঝতে পেরেছে আমিরাত শুধুমাত্র মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি দিয়েই বসে নেই। তারা এরচেয়েও বেশি সাহায্য করছে। এ কারণে ইরান সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমিরাতের প্রতি আর সহনশীল তারা থাকবে না।
তিনি বলেছেন, ‘ইরানের গোয়েন্দারা বিশ্বাস করে আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করতে নিজেদের কিছু আকাশ শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে।’ এই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, ওমানে ইসরায়েল হামলা চালিয়ে ইরানের ওপর দায় চাপিয়েছে। অপর এক কর্মকর্তা বলেছেন, নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য ও রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী তারা জানতে পেরেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল হামলা অত্যাসন্ন। অর্থাৎ যে কোনো সময় হামলা হতে পারে। আর এ হামলা চালানো হবে আমিরাত থেকে।
মধ্যরাতের পর ইসরায়েলে পাঁচ দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের : ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চল লক্ষ্য করে দফায় দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। গত শনিবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শনিবার মধ্যরাতের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে অন্তত পাঁচ দফা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। তবে সর্বশেষ দফায় রোববার দুপুরের পর চালানো হামলায় ইসরায়েলে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, জেরুজালেম এবং মধ্য ইসরায়েলে সাইরেন বাজিয়ে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে বাসিন্দাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ইরান থেকে ধেয়ে আসা ওই ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর ইসরায়েলের দিকে ছোড়া আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র জনশূন্য উন্মুক্ত স্থানে আঘাত হেনেছে। সামরিক ‘প্রটোকল’ অনুযায়ী সেটিকে আঘাত হানতে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আইডিএফ। একই সময়ে লেবানন থেকেও উত্তর ইসরায়েলে বেশ কিছু রকেট ছোড়া হয়েছে। আইডিএফ বলছে, লেবানন থেকে ছোড়া কয়েকটি রকেট ধ্বংস করা হয়েছে এবং বাকিগুলো খোলা জায়গায় পড়েছে। ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে জেরুজালেম ও মধ্য-ইসরায়েলে সাইরেন বাজানোর কিছুক্ষণ পরই উত্তর-ইসরায়েলে আগাম সতর্কবার্তা জারি করা হয়। আইডিএফ বলেছে, ইরান থেকে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ শনাক্ত করার পর ওই সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হামলার আশঙ্কায় মধ্য-ইসরায়েল, জেরুজালেম, শফেলা এবং লোহিত সাগর লাগোয়া ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায়ও সাইরেন বাজানো হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোথাও সরাসরি আঘাত কিংবা ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিশোধ নিতে বাহরাইন ও আমিরাতের অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় ইরানের হামলা : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় হামলা চালিয়েছে, একই দিনে ইসরায়েল ইরানের দুটি ইস্পাত কারখানাকে লক্ষ্যবস্তু করে আঘাত হানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৈশ্বিক অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৯ শতাংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। এই ঘটনাটি চলমান যুদ্ধের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে- যেখানে চোখের বদলে চোখ কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, ইরান তার ভূখণ্ডে যেসব স্থাপনায় হামলা হচ্ছে, তার প্রতিক্রিয়ায় একই ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সম্পৃক্ত স্বার্থকে লক্ষ্য করে। বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, যদি ইরান একই গতিতে হামলার জবাবে হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠবে। এরই মধ্যে ইরানের ওপর হামলার সংখ্যা বাড়ছে এবং সংঘাত ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে।
সৌদি ঘাঁটিতে ইরানি হামলা - মার্কিন নজরদারি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত : সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ আগাম সতর্কতা ও কন্ট্রোল বিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। খবরে বলা হয়, গত শুক্রবার প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হন এবং কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনলাইনে প্রকাশিত নতুন ফুটেজে দেখা গেছে, হামলায় একটি বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি বিমানও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন ও আরব কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে একই তথ্য জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। এ ধরনের বিমান উন্নত রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে শত শত কিলোমিটার দূর থেকে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে পারে এবং আকাশ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক চিত্র সরবরাহ করে।
ইসরাইলে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালাল হুথি : ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি ইসরায়েলের ওপর দ্বিতীয় দফায় ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক টেলিভিশন ভাষণে জানান, ইসরায়েলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তু লক্ষ্য করে একঝাঁক ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে।
গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে গত ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে এটি ইসরায়েলে হুথিদের দ্বিতীয় দফার আক্রমণ। এর আগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ইয়েমেন থেকে আসা একটি মিসাইল আকাশেই ধ্বংস করার দাবি করেছিল। ইয়াহিয়া সারি তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন, ইসরায়েল যতক্ষণ না তাদের ‘আগ্রাসন ও হামলা’ বন্ধ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আগামী দিনগুলোতেও হুথিদের এই সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে হুথিদের এই সরাসরি অংশগ্রহণ যুদ্ধকে নতুন একটি আঞ্চলিক মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইসরায়েলে একযোগে রকেট ও ড্রোন হামলা হিজবুল্লাহর : ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে রকেট ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। লেবানন থেকে ছোড়া এসব রকেটের কারণে গতকাল রোববার ভোর থেকে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে। এ ঘটনায় হিজবুল্লাহ একাধিক বিবৃতি দিয়ে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছে। খবর আল জাজিরার। তাদের দাবি অনুযায়ী, স্থানীয় সময় ভোর ৫টার দিকে তারা মেতুলা শহরে রকেট হামলা চালায়। এরপর সকাল ৬টা ২০ মিনিটে শ্তুলা গ্রামেও রকেট নিক্ষেপ করা হয়। হিজবুল্লাহ আরও জানায়, তারা অধিকৃত গোলান মালভূমির রাওইয়া সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি সকাল ৬টা ২৫ মিনিটে গাজার গ্রামের একটি স্থাপনাকেও লক্ষ্য করে রকেট ছোড়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন ৩৫০০ মার্কিন সেনা : কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সাড়ে তিন হাজার নাবিক ও মেরিন সেনাকে বহনকারী ইউএসএস ত্রিপোলি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে এবং পেন্টাগন এর পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক সংক্ষিপ্ত পোস্টে বলেছে, ইউএসএস ত্রিপোলি (এলএইচএ ৭) জাহাজে থাকা মার্কিন নাবিক ও মেরিনরা ২৭ মার্চ মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বাধীন এলাকায় পৌঁছেছেন। এই মার্কিন সেনাদের মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের বিষয়টি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৃহত্তর মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ।
অনলাইন নিউজ পোর্টাল ওয়াইনেটনিউজ ডটকম শনিবার জানিয়েছে, এই বাহিনী নৌভিত্তিক হামলা এবং স্থল অভিযান উভয়ই পরিচালনা করতে সক্ষম। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের ইউনিটগুলো সাধারণত দ্রুত মোতায়েনের জন্য ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে কৌশলগত স্থান সুরক্ষিত করা, লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া বা উপকূলীয় লক্ষ্যবস্তুতে সম্ভাব্য হামলা অন্তর্ভুক্ত। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কূটনীতির বাইরে আরও সামরিক বিকল্প দেওয়ার জন্য পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে ১০ হাজার পর্যন্ত অতিরিক্ত স্থলসেনা মোতায়েনের কথা বিবেচনা করছে। প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাহিনীতে সম্ভবত পদাতিক সৈন্য এবং সাঁজোয়া যান থাকবে এবং এটি ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় পাঁচ হাজার মেরিন সেনা এবং হাজার হাজার প্যারাট্রুপারের সঙ্গে যুক্ত হবে, যাদেরকে এরই মধ্যে ওই অঞ্চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ঠিক কোথায় এই বাহিনী মোতায়েন করা হবে তা স্পষ্ট নয়। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, তারা ইরান এবং এর গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের নাগালের মধ্যে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার হুমকি ইরানের : ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। বুশেহর প্রদেশে হামলায় একটি পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়েছে এবং খুজেস্তান প্রদেশে একটি পানি সরবরাহ কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে এসব হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলার হুমকি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। ইরানের ১০ হাজার ঘনমিটার (১ কোটি লিটার বা ২৬ লাখ গ্যালন) ধারণক্ষমতার একটি পানি সরবরাহ কেন্দ্র ইসরায়েল এবং মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এই যুদ্ধে ইরানের অনেক বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হলেও এই পানি সরবরাহ কেন্দ্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানে টানা কয়েক সপ্তাহ স্থল হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র : ইরানে টানা কয়েক সপ্তাহ স্থল হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে। তারা বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার সেনাকে জড়ো করা হয়েছে। আর এসব সেনাকে দিয়ে কয়েক সপ্তাহব্যাপী ইরানে স্থল হামলা চালানো হতে পারে। তবে এটি অন্য সাধারণ স্থল হামলার মতো হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, স্থল হামলার যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে সেটি ‘যুদ্ধে নতুন ধাপ’ সৃষ্টি করতে পারে। যেটি মার্কিন সেনাদের জন্য যুদ্ধ শুরুর সময়ের চেয়ে আরও বেশি বিপজ্জনক হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেছেন, এই স্থল হামলা অন্য সাধারণ স্থল হামলার মতো হবে না। এর বদলে ইরানে স্পেশাল ফোর্স এবং কামান সেনারা রেইড দেবে। তবে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ড্রোন, মিসাইল এবং গুলির মুখে পড়তে পারেন বলে সতর্কতা দিয়েছেন এই কর্মকর্তারা। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউজে যোগাযোগ করেছিল ওয়াশিংটন পোস্ট।
কিসে হামলা হতে পারে : স্থল হামলার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে খার্গ দ্বীপকে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত একটি দ্বীপ। যেখান থেকে ইরান তাদের ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। হরমুজ দিয়ে যেন নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল করতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে এই দ্বীপটি টার্গেট করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, সম্ভাব্য এ স্থল হামলার মেয়াদ কয়েক সপ্তাহ হতে পারে। তবে আরেকটি সূত্র বলেছেন, এটি কয়েক মাস ধরে চলতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৩ মার্কিন সেনা নিহত ও প্রায় ৩০০ জন আহত হয়েছেন।