
যুদ্ধের ইতি টানতেই হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। তিনি জানিয়েছেন, চুক্তি হোক বা না হোক, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে চলমান সামরিক অভিযান আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ করতে চায়। বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে কোনো সমঝোতা ছাড়াই ওয়াশিংটন এই যুদ্ধের ইতি টানবে। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এরইমধ্যে তার প্রধান সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে। তার ভাষায়, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই ছিল এই অভিযানের উদ্দেশ্য এবং সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরানে আমাদের মিশন খুব শিগগিরই শেষ হবে। আমরা দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সেখান থেকে বেরিয়ে আসব।’ তবে বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্রাম্পের মন্তব্যে অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। একদিকে তিনি বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না; অন্যদিকে দাবি করেন, দেশটির শাসনে এরইমধ্যে পরিবর্তন ঘটে গেছে।
এমনকি তিনি ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন। ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও বড় ধরনের দাবি করেছেন ট্রাম্প। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে, এমনকি টেলিযোগাযোগ ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইরানের পুনর্গঠন নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে, পুনর্গঠনে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগতে পারে। ‘আমরা তাদের অনেক পেছনে ঠেলে দিয়েছি’- এমন মন্তব্যও করেন তিনি। আলোচনার প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি আলোচনায় আসে, ভালো। না এলেও আমাদের কিছু যায় আসে না।’
শত্রুরা নতজানু না হওয়া পর্যন্ত হামলা করবে ইরান : ইরান বলেছে, মার্কিন-ইহুদিবাদী শত্রুদের নতজানু না করা পর্যন্ত দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিশালী হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরানের খাতামুল আম্বিয়া সামরিক ঘাঁটির কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইব্রাহিম জুলফাকারি বলেছেন, মার্কিন-ইহুদিবাদী শত্রুদের বিরুদ্ধে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সফল অভিযানের ধারাবাহিকতায় ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-ফোর’-এর তরঙ্গ পরিচালিত হচ্ছে। তিনি জানান, ‘এই অঞ্চলের পাঁচটি মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের দক্ষিণ, মধ্য ও উত্তরে অবস্থিত হাইফা, কিরিয়াত শমোনা, তেল আবিব, বীরশেবা, ডিমোনা, আল-খারজ, জুফির এবং ভিক্টোরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ড কেন্দ্র, ড্রোন হ্যাঙ্গার, রসদ, সহায়তা, অস্ত্রাগার এবং সন্ত্রাসী সৈন্যদের বিশেষ করে মার্কিন ও ইহুদিবাদী পাইলটদের গোপন আস্তানাগুলোকে ইমাদ, কিয়াম ও খোররামশাহর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অ্যাটাক ড্রোন দিয়ে কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।’
স্থলহামলার কথা মুখেও আনবেন না- মার্কিন জেনারেল : এক মার্কিন সিনিয়র সেনা-কর্মকর্তা তার দেশের সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানে স্থল হামলার কথা মুখেও আনবেন না। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন স্থল-অভিযানের কমান্ডার হিসেবে অভিজ্ঞতার অধিকারী মার্কিন সিনিয়র সেনা-কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার স্টিভ এন্ডারসন বলেছেন, এমনকি ইরানে স্থল-সেনা পাঠানোর কথা বলাটাও এক চরম বিপর্যয়ের কারণ হবে। ‘এম এস নাও’ নামের একটি সংবাদ চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এন্ডারসন বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পরামর্শদাতারা বৃহত্তম ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি করেছেন আমাদের দেশকে। তারা বাজেভাবে এই যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ব্রিগেডিয়ার এন্ডারসন আরও বলেন, আমরা এখনও ইরানকে ভালোভাবে চিনি না, তারা পরাজয়ের ষোলকলা আমাদের জন্য বয়ে আনতে ও আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় গোবেচারা হয়ে- পড়া ট্রাম্প ইরানের দ্বীপগুলোতে বিশেষ করে খার্গ দ্বীপে স্থল-হামলার পাঁয়তারা করছেন, যাতে হরমুজ প্রণালী নিয়ে দর কষাকষির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার অর্জন করা যায়। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি ভুল ট্রাম্পের জন্য কাজ আরও কঠিন করে তুলবে এবং হাজার হাজার মার্কিনির জীবন বিপদাপন্ন হবে।
ইসরায়েলি-মার্কিন স্থাপনায় আইআরজিসির ‘বিধ্বংসী’ হামলা : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এবং ইরানের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে মঙ্গলবার রাতে এক বিশেষ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি জোটের বিরুদ্ধে তারা এক বিশাল ও বিধ্বংসী সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। ‘ইয়া ফাতিমা আল-জাহরা’ কোড নামে পরিচালিত এই অপারেশন ছিল ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-ফোর’-এর ৮৮তম পর্যায়। এই অভিযানে ইসফাহানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি মার্কিন-ইসরায়েলি ‘এমকিউ-নাইন’ ড্রোন সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস হওয়া মোট ড্রোনের সংখ্যা ১৪৭-এ পৌঁছেছে। এছাড়া বন্দর আব্বাস ও মিনাব অঞ্চলে আইআরজিসির নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আরও দুটি ‘লুকাস’ ড্রোন ধ্বংস করা হয়। অভিযানে পারস্য উপসাগরের কেন্দ্রে ‘হালফং এক্সপ্রেস’ নামের একটি ইসরায়েলি কন্টেইনার জাহাজে ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে সরাসরি আঘাত করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে সামরিক ঘাঁটির বাইরে আত্মগোপন করে থাকা মার্কিন মেরিন সেনাদের একটি গোপন আস্তানায় ড্রোন দিয়ে নির্ভুল হামলা চালায় আইআরজিসি। অভিযানের ৮৮তম ধাপে বাহরাইনের মানামা বিমানবন্দরের আশপাশে মোতায়েন মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ‘হাওক’ অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েতের ‘জাবের আল-আহমাদ’ ঘাঁটিতে থাকা দুটি উন্নত আগাম সতর্কীকরণ রাডার ড্রোন হামলায় অকেজো হয়ে পড়েছে। এদিকে, বুধবার সকালে কুয়েতের সরকারি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। কুয়েতের বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুধবার বিমানবন্দরটি ইরানি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। ফলে জ্বালানি ট্যাংকে ভয়াবহ আগুন ধরে গেছে। কুয়েত নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানবন্দরটি ইরান ও দেশটির সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। হামলায় জ্বালানি মজুত করার ট্যাংকগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এর ফলে সেখানে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেখানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল।
ইসরায়েলি শিল্পকেন্দ্রে ইরানি সেনাবাহিনীর হামলা : আইআরজিসির পাশাপাশি ইরানের সেনাবাহিনীও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত যোগাযোগ ও শিল্প কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে একটি মার্কিন-ইসরায়েলি গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ইরানের কুয়েশম অঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি মার্কিন-ইসরায়েলি ‘লুকাস’ স্পাই ড্রোন সফলভাবে শনাক্ত ও ধ্বংস করেছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান- সিমেন্স, টেলিকম এবং এটিএন্ডটি-র কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে একঝাঁক ড্রোন হামলা চালান তারা। বেন গুরিয়ান বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত সিমেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল সফটওয়্যার সেন্টার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন নিয়ে কাজ করে। এটি মূলত অস্ত্র উৎপাদন লাইন এবং সামরিক ব্যবস্থার ডিজাইনে ব্যবহৃত হয়। হাইফাতে অবস্থিত মার্কিন গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র এটিএন্ডটি টেলিকমিউনিকেশন সেন্টার ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য উন্নত নেটওয়ার্কিং, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং এআই প্রযুক্তি সরবরাহ করে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিতেই এই কৌশলগত কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এদিকে, নতুন একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী। ভিডিওতে দেখা গেছে, সম্ভাব্য স্থল হামলা মোকাবিলায় দেশটির কমান্ডোদের একটি বিশেষ ইউনিট যুদ্ধের জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রেস টিভি প্রচারিত ভিডিওতে ইরানি সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনীকে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ের মহড়া দিতে দেখা গেছে। ভিডিওর শুরুতে ইংরেজি এবং হিব্রু ভাষায় ‘কাম ক্লোজ’ বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে। একে যেকোনো ধরনের মার্কিন অভিযানের বিরুদ্ধে তেহরানের পক্ষ থেকে একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরব আমিরাতে ড্রোন হামলা, বাংলাদেশি নিহত : সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজাইরা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুধবার আল-রিফা এলাকায় একটি খামারে ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ফুজাইরা সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, আমিরাতের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সফলভাবে একটি ড্রোন (ইউএভি) আটকে দেয়। এরপর সেটির ধ্বংসাবশেষ আল-রিফা এলাকার একটি খামারে গিয়ে পড়ে। এদিকে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, এ ঘটনায় এক বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। সংবাদটি নিয়ে গুজব বা অসমর্থিত কোনো তথ্য ছড়িয়ে যেন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা। তারা শুধু সরকারি মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইসরায়েলে দিনরাত হামলা চালাচ্ছে হিজবুল্লাহ : লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে মঙ্গলবার ও বুধবার দখলদার বাহিনীর ওপর মুহুর্মুহু হামলা চালিয়েছেন হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ যোদ্ধারা। ‘খাইবার-টু’ অপারেশন সিরিজের আওতায় উত্তর ইসরায়েল এবং দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি ট্যাংক, সেনা ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়। আল-মায়াদিন জানায়, দক্ষিণ লেবাননের বেত লিফ শহরে অগ্রসরমান ইসরায়েলি সাঁজোয়া বাহিনীকে লক্ষ্য করে এক ভয়াবহ অতর্কিত হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। যোদ্ধারা আগে থেকে পেতে রাখা শক্তিশালী মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং হালকা ও মাঝারি অস্ত্র দিয়ে সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে সাহায্য করতে আসা অতিরিক্ত বাহিনীর ওপর গাইডেড মিসাইল হামলা চালানো হয়। এতে ইসরায়েলের নাহাল ব্রিগেডের একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারসহ বহু সেনা হতাহত হন।
তাছাড়া, হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছেন। এর মধ্যে উত্তর উপকূলে অবস্থিত সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি ঘাঁটি স্টেলা মারিস বেসে অত্যাধুনিক মিসাইল দিয়ে আঘাত করা হয়। হাইফা শহরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত নেশার বেসে ড্রোন এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রকেটের সম্মিলিত হামলা চালানো হয়। উত্তর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ও বিমান নজরদারি পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র মেরন ও বিরিয়া বেসে-ও রকেট হামলা চালানো হয়েছে। আক্কা শহরের পূর্বে অবস্থিত সেনা ঘাঁটি টেফেন বেস-ও ড্রোন ও রকেট হামলা থেকে রেহাই পায়নি। এদিকে, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি সাঁজোয়া বহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছেন হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। আল-কান্তারা, আল-তায়েবা এবং রশাফ অঞ্চলে অন্তত তিনটি মেরকাভা ট্যাংক গাইডেড মিসাইল দিয়ে ধ্বংস করা হয়। আল-বায়াদা এবং তায়েবা অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ইসরায়েলি সৈন্যবাহী যান এবং হামভি জিপ ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল- এমন বেশ কিছু উত্তর ইসরায়েলি বসতি- যেমন মেতুলা, আভিভিম, মিজগভ আম, নাহারিয়া, শ্লোমি এবং শুমেরা-তে ব্যাপক রকেট ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। বিশেষ করে আভিভিম বসতিতে সমবেত ইসরায়েলি সেনাদের ওপর কয়েক দফায় রকেট ব্যারেজ ছোড়া হয়। হিজবুল্লাহর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘লেবাননের জনগণ এবং তাদের ঘরবাড়ি রক্ষার স্বার্থে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
২৪ ঘণ্টায় ২৩ দফা হামলা ইরাকি যোদ্ধাদের : ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে গত এক দিনে ২৩টি হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরাকি প্রতিরোধ জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’। বুধবার এক বিবৃতিতে তারা জানান, মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে কয়েক ডজন ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহত হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই ব্যাপক ড্রোন হামলা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে পেন্টাগন জানিয়েছিল, এ অঞ্চলে তাদের ওপর হওয়া যেকোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। প্রেসটিভি জানায়, মঙ্গলবার কুয়েত ও ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছেন ইরাকের ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধারা। কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর কৌশলগত আহমেদ আল-জাবের বিমান ঘাঁটিতে একঝাঁক ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। ঘাঁটিটি মার্কিন বিমান বাহিনীর অন্যতম প্রধান পরিচালনা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইরাকের ইরবিলে অবস্থিত মার্কিন দখলদার বাহিনীর ‘হারিস’ ঘাঁটিতেও একঝাঁক ড্রোন দিয়ে সফল হামলা চালানো হয়েছে।
বিবৃতিতে ইরাকি প্রতিরোধ যোদ্ধারা জানিয়েছে, এই অভিযানগুলো মার্কিন দখলদারিত্বের অবসান এবং আঞ্চলিক সংহতি রক্ষার প্রতিশ্রুতির অংশ। শত্রু পক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ড্রোনগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলার উদ্দেশ্যে কুয়েতের মাটি ব্যবহার করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরাকের প্রতিরোধ সংগঠনগুলো। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললে পুরো অঞ্চলের বিদ্যমান সীমান্ত ব্যবস্থার কোনো তোয়াক্কা করা হবে না। ইরাকের প্রতিরোধ জোটের অন্যতম সদস্য ‘কাতাইব সাইয়্যেদ আল-শুহাদা’ এক বিবৃতিতে জানায়, যদি কুয়েতের ভূমি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো হয় অথবা সিরিয়ার মাটি ব্যবহার করে লেবাননের হিজবুল্লাহকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তবে তাকে ‘সীমান্তের লঙ্ঘন’ হিসেবে গণ্য করা হবে। তারা স্পষ্ট করেন, এমনটা ঘটলে ইরাকি প্রতিরোধ যোদ্ধারাও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করবে। তাদের ভাষায়- ‘চোখের বদলে চোখ এবং দাঁতের বদলে দাঁত নেওয়া হবে।’
ইয়েমেন থেকে ইসরায়েলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইয়েমেনের হুথি আনসার-আল্লাহর যোদ্ধারা বুধবার সকালে দক্ষিণ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দায় স্বীকার করেছেন। ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সমন্বয় করে এ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। এক বিবৃতিতে হুথিরা জানান, ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে মিলে তারা চলতি যুদ্ধে তাদের তৃতীয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি চালিয়েছে। তেহরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি বলেছে, তারা একঝাঁক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ‘ইসরায়েলি শত্রুদের স্পর্শকাতর লক্ষ্যবস্তু’ লক্ষ্য করে তৃতীয় এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। লেবানন, ইরান, ইরাক এবং দখলকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ‘ভয়াবহ’ করে তোলার হুমকি দিয়েছেন হুথিরা।
বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধের হুমকি হুথিদের : ইয়েমেনের সানা থেকে আলজাজিরার সংবাদদাতা ইউসেফ মাওরি জানিয়েছেন, হুথিরা বর্তমানে দক্ষিণ ইসরায়েলে তাদের হামলা জোরদার করছেন। হুথি কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ হলেই শুধু এ হামলা বন্ধ করবেন তারা। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলা ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের অংশ না নেওয়া। হুথিদের প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি জানিয়েছেন, সামরিক সংঘাত আরও বাড়ানোর জন্য তাদের সামনে আরও অনেক বিকল্প ও ধাপ রয়েছে। তার মতে, এর মধ্যে অন্যতম একটি বিকল্প হতে পারে বাব আল-মান্দেব প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া।
দ্রুত ইরান যুদ্ধের অবসান চান ৬৬ শতাংশ মার্কিন : যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন না হলেও দেশটির উচিত দ্রুত এ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা। রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। গত শুক্রবার থেকে গত রোববার পর্যন্ত জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৬৬ শতাংশ যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে ২৭ শতাংশ বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানে তাদের সব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া। আর ৬ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেননি। ট্রাম্পের রিপাবলিকান সমর্থকদের যারা জরিপে অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যেও ৪০ শতাংশ মনে করেন, লক্ষ্য অর্জন না হলেও দ্রুত সংঘাত শেষ করা দরকার।