ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রোববার থেকে হামের টিকাদান

রোববার থেকে হামের টিকাদান

আগামী রোববার থেকে হামের জরুরি টিকাদান (ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশন) কার্যক্রম শুরু করছে সরকার। দেশের যেসব উপজেলায় শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, প্রথমে ওই সব উপজেলা থেকে এই টিকা কার্যক্রম শুরু করা হবে। গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ ঘোষণা দিয়েছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে আজ বৃহস্পতিবার এবং পরশুর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বিশেষভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত (হামে) উপজেলায় আগামী দুই দিনের ভেতরে ভ্যাকসিন এবং সিরিঞ্জ গ্রাম অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আর রোববার সকাল থেকে টিকাদান শুরু করা হবে। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশনের কাজ রোববার থেকে শুরু করব। আমরা ফিল্ড লেভেল স্টাফদের সব ছুটি আগামীকাল থেকে প্রত্যাহার করে নিলাম। কোনো ছুটি থাকবে না। ভ্যাকসিন যারা দেবে, তারা সবাই আন্ডার সুপারভিশন অব লোকাল অফিসার থাকবে এবং কাজ করবে।’

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘যতটা ভয়াবহভাবে মিজেলস আমাদের আক্রমণ করেছে, আমরা তার চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছি। কিছু ক্যাজুয়ালটি হয়েছে। বাট অবশ্যই বলব, এটা আমাদের অনেকটা সার্থকতা, আমরা এটা ম্যানেজ করেছি প্রপারলি। ওয়ার্ড ম্যানেজ করেছি বিভিন্ন জায়গায়। আমরা ত্বরিত গতিতে বেসরকারি খাত থেকে ভেন্টিলেটর কালেক্ট করেছি, যেটা খুবই দরকার ছিল। ভেন্টিলেটর কালেক্ট করে আমরা সব জায়গায় ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করেছি, যাতে ভেন্টিলেশন দেওয়া যায়। বাচ্চারা যাতে অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায়।’ সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসের হামের একটা ক্যাম্পেইন হয়েছিল। তবে সবাইকে তখন এর আওতায় আনা হয়নি। অসম্পূর্ণ অবস্থায় ওই ক্যাম্পেইন শেষ করা হয়েছে। উল্লেখ্য এর আগে গত এক সপ্তাহে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন একাধিকবার বলেছেন, ২০১৮ সালের পরে দেশে হামের টিকাদানের কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি।

টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির কাছে ২১ দশমিক ৯ মিলিয়ন হামের টিকার মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এই টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া টিকা কেনার জন্য ৬০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। টিকা কেনা হলে গ্যাভির কাছ থেকে নেওয়া টিকা রিপ্লেস (প্রতিস্থাপন) করা হবে। আগে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুরা এই টিকা পেলেও বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শিশু-কিশোররা এই টিকা নিতে পারবে বলেও জানান মন্ত্রী।

এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দীন হায়দার। গতকাল সকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রতি হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ধীরে ধীরে একটি প্রাদুর্ভাবে রূপ নিচ্ছে। সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হাম সদৃশ উপসর্গে শিশুমৃত্যুর খবর জনস্বাস্থ্য খাতে তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

এই পরিস্থিতি হঠাৎই তৈরি হয়নি উল্লেখ করে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বরং এটি গত কয়েক বছরের নীতি-ঘাটতি, বিলম্বিত সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল বাস্তবায়নের একটি ফলাফল। বিশেষ করে টিকা সংগ্রহে ধীরগতি, সময়মতো ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন না করা এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব দেশের সামগ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের অদক্ষতা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনীতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থতা- এই সংকট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জিয়াউদ্দীন হায়দার বলেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। যদি দ্রুত, সমন্বিত এবং তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো জনসাধারণকে আশ্বস্ত করা, মাঠপর্যায়ের সেবা জোরদার করা এবং সংক্রমণ বিস্তার রোধ করা।

হামে ১৫ জনের মৃত্যু : দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। এ পর্যন্ত রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় হামে আক্রান্ত হয়ে ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি।

কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুর সঙ্গে হামের সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এসব মৃত্যুর ঘটনা রাজশাহী অঞ্চলে বেশি হওয়ায় সেখানে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব শিশু এখনও টিকার আওতায় আসেনি বা নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করেনি, তাদের মধ্যেই সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হচ্ছে।

২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশুদের হামের টিকার ব্যবস্থা চেয়ে আইনি নোটিশ : ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের শিশুদের হামের টিকার ব্যবস্থা করার নির্দেশনা চেয়ে সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে এই নোটিশ পাঠানো হয়। বুধবার মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া এ নোটিশ পাঠান। নোটিশে বলা হয়েছে, কিছুদিন ধরে টিকার অভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুবরণসহ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। অথচ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। নোটিশে পত্রিকায় প্রকাশিত ‘হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, উপসর্গ নিয়ে ক্ষতি শতাধিক’ প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে নোটিশ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হবে বলেও নোটিশে জানানো হয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত