ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২০ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ধ্বংসাত্মক হামলার পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের

ধ্বংসাত্মক হামলার পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও নিজ নাগরিকদের কাছে ইরান নিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ‘কিছু অসত্য ও বিভ্রান্তিমূলক’ তথ্য দিয়েছেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, মার্কিন বাহিনী যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য পূরণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানে কঠিন আঘাত করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এই ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাাঁটিগুলোতে নতুন উদ্যমে হামলা শুরু করেছে ইরান। বুধবার ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় রাতে যুদ্ধ-ক্লান্ত মার্কিন জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ৩২ দিন ধরে চলা হামলায় তার সামরিক বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত, চূড়ান্ত ও অপ্রতিরোধ্য বিজয় নিয়ে এসেছে আর ইরান এখন কোনো নিরাপত্তা হুমকি নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত কঠিন আঘাত হানতে যাচ্ছি। তাদের প্রস্তর যুগে ফেরত পাঠাচ্ছি আমরা।’ এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী টেলিগ্রামে জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করেছে। এ হুমকি প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সক্রিয় রয়েছে। ট্রাম্প তার বক্তব্যে দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি চূর্ণ হয়েছে। এমন দাবির পরই ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক ছুড়েছে ইরান। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির উত্তরাঞ্চলজুড়ে বিপদসংকেত বাজানো হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষণের পর লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর বড় পরিসরে রকেট ও ড্রোন হামলার খবর জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে লেবাননের মালিকিয়াহ ও ইয়েরুন এলাকায় হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা রকেট হামলা চালান। কাছাকাছি সময়ে লেবাননের মেনাহেম এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ড্রোন হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে হিজবুল্লাহ।

এত ইরানি অস্ত্রের উৎস কী, জানে না যুক্তরাষ্ট্র : ইরানি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল অত্যন্ত ‘নগণ্য’ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি সামনে আরও ‘ব্যাপক এবং ধ্বংসাত্মক’ হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিম এবং আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, তেহরানের সামরিক সক্ষমতা এবং সরঞ্জাম সম্পর্কে দেশ দুটির কাছে ‘অসম্পূর্ণ’ তথ্য রয়েছে। মুখপাত্র আরও বলেন, ইরানের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এমন সব জায়গায় সম্পন্ন হয়, যা আপনাদের একেবারেই অজানা। এর মাধ্যমে তিনি ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার ব্যাপকভাবে ফুরিয়ে গেছে বলে ট্রাম্পের করা দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে অবশ্যই এই আগ্রাসনের চড়া মূল্য দিতে হবে।

ট্রাম্পের ভাষণকে বড় ভুল বলছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা : ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতির উদ্দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ভাষণে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা। মার্কিন সিনেটের সংখ্যালঘু ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ভাষণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের পদক্ষেপ আমাদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নীতিগত ভুলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে।’ নিউইয়র্কের এই ডেমোক্র্যাট সিনেটর আরও বলেন, ট্রাম্প লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যর্থ হচ্ছেন। তিনি মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। সাধারণ আমেরিকানদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো উপেক্ষা করছেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকান দলীয় সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এই ভাষণকে তুলনামূলক ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, ইরানের সামনে এখন দুটি পথ খোলা- চুক্তি করা অথবা আরও বোমা হামলার মুখোমুখি হওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ, বলছে বিশ্বের ৮০ থিঙ্কট্যাঙ্ক : ইরানে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের লক্ষ্য অর্জনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিশ্বের প্রধান ৮০টি থিংকট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ কথা জানিয়েছে। এই গবেষণার মূল স্তম্ভ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পাঁচটি বিষয়কে। বিশ্লেষকদের মতে, এ যুদ্ধ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে। সামরিক প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘ট্যাকটিক্যাল’ বা কৌশলগত কিছু আঘাত হানতে পারলেও ‘স্ট্র্যাটেজিক’ বা রণকৌশলগত দিক থেকে তারা ব্যর্থ। রাজনৈতিক ব্যবস্থা উপড়ে ফেলা, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধ্বংস করা বা দেশটিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার যে লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ছিল, তা অর্জনে বাধা দিতে সক্ষম হয়েছে তেহরান। ইরান বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছে। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালি দখল এবং সেটি পুনরায় সচল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ব্যর্থতা ইরানের হাতকে শক্তিশালী করেছে। বর্তমানে যুদ্ধটি একটি ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের চেয়ে ইরানের পক্ষেই বেশি কাজ করছে। যুদ্ধ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে হয় একটি ‘প্রচারণামূলক বিজয়’ দেখাতে হবে, নতুবা কোনো জয় ছাড়াই যুদ্ধ শেষ করতে হবে। গবেষণায় মোট ৮০টি থিংকট্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি, যুক্তরাজ্যের আটটি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৮টি, এশিয়ার ৯টি এবং চীনের সিআইসিআইআর, ভারতের ওআরএফ, জাপানের জেআইআইএ ও দক্ষিণ কোরিয়ার কেডিআই। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপসহ ১৪টি আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোও এ তালিকায় রয়েছে।

হাজার কিমি বিস্তৃত এলাকায় হামলা চালাল ইরান : মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন এবং ইসরায়েলি অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। বুধবার সকালে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-ফোর’-এর ৮৯তম ধাপের এই অভিযানে শতাধিক ভারী ক্ষেপণাস্ত্র, ২০০ রকেট এবং বিপুল সংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করা হয়। কয়েক হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় এই সমন্বিত হামলা চালানো হয়। আইআরজিসি-র জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, ইসরায়েলের ইলাত, তেল আবিব এবং বনি ব্রাক শহরের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আইআরজিসি বলেছে, এসব হামলায় ইসরায়েলি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পাশাপাশি বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে নিখুঁত হামলা চালানো হয়, যেখানে প্রায় ৮০ জন সেনাসদস্য অবস্থান করছিলেন। এছাড়া ইরাক সীমান্তের পাশে মরুভূমিতে অবস্থিত আল-উদাইরি ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি চিনুক হেলিকপ্টার সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং বেশ কয়েকটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভিযানের অংশ হিসেবে পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরে পাঁচটি পৃথক অভিযান চালিয়েছে ইরানি নৌবাহিনী। আইআরজিসি-র তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমায় থাকা দুটি মার্কিন আর্লি ওয়ার্নিং রাডার সিস্টেম ধ্বংস করা হয়েছে। পারস্য উপসাগরের মাঝখানে ‘অ্যাকুয়া ওয়ান’ নামের একটি ইসরায়েলি ট্যাঙ্কারে সফল হামলা চালানো হয়েছে, যা এখনও জ্বলছে। ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-কে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হলে সেটি অবস্থান পরিবর্তন করে গভীর সমুদ্রে পিছু হটতে বাধ্য হয়। আমিরাতে মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি গোপন জমায়েতে মঙ্গলবারের হামলায় অন্তত ৩৭ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান। আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, এই যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। এই সংঘাতের ফলে ইসরায়েলের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী সম্পর্কে আইআরজিসি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শত্রুভাবাপন্ন কোনো শক্তির জন্য এটি খোলা হবে না।

আমিরাত ও সৌদিতে আবার হামলা : সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির উপকণ্ঠে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের খবর জানিয়েছে শহরটির সরকারি গণমাধ্যম দপ্তর। গতকাল বৃহস্পতিবার জানানো হয়, খলিফা ইকোনমিক জোনস আবুধাবির (কেইজেডএডি) পাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ ঘটনায় ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কেউ হতাহত হননি। এদিকে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির আকাশসীমায় বেশকিছু ড্রোন, চারটি অজ্ঞাত আকাশযান এবং একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়েছে। নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে এসব ধ্বংস করা হয়েছে।

আইআরজিসির পাশাপাশি বড় হামলা সেনাবাহিনীর : আইআরজিসি-র পাশাপাশি ইসরায়েলি ও মার্কিন স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে ইরানের সেনাবাহিনী। এবার ইসরায়েলের বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ড্রোন হামলা চালান তারা। বুধবার ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক আর্লি ওয়ার্নিং বা এওয়াক্স বিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং গুরুত্বপূর্ণ রাডার সাইটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে অত্যন্ত শক্তিশালী ‘আরাশ-টু’ ড্রোন ব্যবহার করা হয়। এই ড্রোন প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের বেন গুরিয়ান বিমানবন্দরে অবস্থানরত মার্কিন এওয়াক্স এবং রিফুয়েলিং বিমানগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। পাশাপাশি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন শনাক্ত ও ট্র্যাকিং করার রাডার সাইট এবং ইরানের ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সাইটগুলোতে নিখুঁত হামলা চালানো হয়। স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের এক মাসে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর আনুমানিক ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২৭ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ই-থ্রি সেন্ট্রি এওয়াক্স বিমান এবং বেশ কিছু রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘ফ্লাইং রাডার’ বা উড়ন্ত রাডারগুলোর ক্ষতি হওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনার ক্ষমতা পঙ্গু হয়ে পড়েছে। তাছাড়া, সৌদি আরব, আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান এবং কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ধারাবাহিক হামলায় থাড মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, রিপার ড্রোন এবং একাধিক রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত আগ্রাসনের জবাবে এবং বেসামরিক এলাকায় তাদের নির্বিচার হামলার প্রতিশোধ নিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাদের বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, ‘আগ্রাসনকারীরা যেন তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়, তা নিশ্চিত করতে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী শেষ পর্যন্ত অটল থাকবে।’

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক হ্যাক করল ইরান : ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে সফলভাবে অনুপ্রবেশ করে সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার দাবি করেছে ইরানের হান্দালা সাইবার গ্রুপ। একই সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সামরিক অবকাঠামোই আর নিরাপদ থাকবে না বলে সতর্ক করেছেন তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রুপটির এক বিবৃতির ভিত্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি। তাদের দাবি, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সমন্বিত কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম ডিজাইন ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পিএসকে উইন্ড টেকনোলজিস-এর নেটওয়ার্কে জটিল সাইবার হামলা চালানো হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির সার্ভার থেকে সব সংবেদনশীল তথ্য সম্পূর্ণভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, এই প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের কমান্ড সেন্টার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে কাজ করে।

‘একজন শত্রুও যেন জীবিত না ফেরে’, ইরানি সেনাপ্রধানের হুঁশিয়ারি : মহা-সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শত্রু পক্ষ যদি ইরানের মাটিতে কোনো ধরনের ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ বা স্থল অভিযান চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে একজন আক্রমণকারীকেও জীবিত ফিরতে দেওয়া হবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের সকল কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টারের সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক অনলাইন ভাষণে তিনি এই ‘নো কোয়ার্টার’ (কাউকে রেহাই না দেওয়া) নীতি ঘোষণা করেন। মেজর জেনারেল হাতামি স্থল, নৌ এবং বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতি মুহূর্তে বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, ইরানি সেনাবাহিনী রক্ষণাত্মক এবং আক্রমণাত্মক- উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ণ প্রস্তুত। আমাদের লক্ষ্য দেশ থেকে যুদ্ধের কালো মেঘ সরিয়ে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

স্থল হামলা করলে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়বেন ট্রাম্প : যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে স্থল অভিযান চালালে মার্কিন সেনারা শুধু ছদ্মবেশী যোদ্ধাদের মুখোমুখি হবে না; তাদের সামনে দাঁড়াবে একটি সুসংগঠিত ও বিপুলসংখ্যক যোদ্ধার বাহিনী, যারা মাতৃভূমি রক্ষাকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে দেখে। গত চার দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রতিরক্ষার এই কাঠামো গড়ে তুলেছে তেহরান। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলে নেওয়ার নির্দেশ দেন, তবে তা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক সামরিক অভিযান। এই পরিকল্পনায় মার্কিন বাহিনীকে ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে, যা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত জটিল। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস এই ধরনের অভিযানে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশেষ বাহিনীর অপারেশন’ প্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। কারণ, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যা মার্কিন বাহিনীর জন্য পৌঁছানো ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কঠিন। প্রথমত, এই স্থাপনাগুলো পারস্য উপসাগরের মার্কিন ঘাঁটি বা বিমানবাহী জাহাজ থেকে প্রায় ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত, যা সরবরাহ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় বাধা। দ্বিতীয়ত, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান নিজেই একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। পশ্চিম ইরানজুড়ে বিস্তৃত জাগ্রোস পর্বতমালা প্রাকৃতিক প্রাচীরের মতো কাজ করে, যা উপকূল থেকে দেশটির ভেতরে প্রবেশকে কঠিন করে তোলে। ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল মূলত বহু স্তরভিত্তিক। দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দূর থেকে শনাক্ত ও ধ্বংস করার চেষ্টা করে। মাঝারি স্তরে রয়েছে মোবাইল প্রতিরক্ষা ইউনিট, যা যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল মোকাবিলা করে। পাশাপাশি, সৈন্যদের হাতে থাকা পোর্টেবল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও হেলিকপ্টার ও নিম্ন-উচ্চতার বিমান প্রতিহত করতে সক্ষম। এই প্রতিরক্ষার মূল দায়িত্বে রয়েছে আইআরজিসি, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কৌশল তৈরি করে আসছে। এই কৌশলের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ইরাকের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে। ইরান বলেছে, তাদের প্রতিরক্ষায় প্রায় ১০ লাখ যোদ্ধা প্রস্তুত রয়েছে, যার মধ্যে আইআরজিসি, বাসিজ মিলিশিয়া ও স্বেচ্ছাসেবকেরা অন্তর্ভুক্ত। এই বাহিনীর কার্যকারিতা পুরোপুরি অজানা হলেও সংখ্যার দিক থেকে এটি যে কোনো দখলদার বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসহাক জাহাঙ্গিরি সতর্ক করে বলেছেন, স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুল হবে। তার ভাষায়, ইরানের এক ইঞ্চি জমি দখল করতে হলেও রক্তের সাগর পাড়ি দিতে হবে।

অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান চীনের : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর কঠোর আক্রমণের হুমকি দেওয়ার পর চীন গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্ততার ভূমিকায় রয়েছে। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সামরিক উপায়ে সমস্যার মূল সমাধান সম্ভব নয় এবং সংঘাতের তীব্রতা উভয় পক্ষের জন্যই অনুকূল নয়। তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছি। চীন আরও উল্লেখ করেছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলাই হরমুজ প্রণালীর অবরোধের মূল কারণ, যা ট্রাম্পের তেলের চলাচল নিয়ন্ত্রণের আহ্বানের পর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মাও নিং বলেন, হরমুজ প্রণালীর নৌপথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ হলো- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ সামরিক অভিযান।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত