
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছে সৌদি আরব। বিশেষ করে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি, এই যুদ্ধের খরচ উপসাগরীয় দেশগুলোকে বহন করতে হবে এমন ইঙ্গিত এবং সৌদি যুবরাজকে নিয়ে অশালীন মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে রিয়াদে। থিংক-ট্যাংক চ্যাথাম হাউজের সৌদি বিশেষজ্ঞ এবং সহযোগী ফেলো নিল কুইলিয়ামের মতে, সৌদি আরব এখন হোয়াইট হাউজের ওপর ‘চরম হতাশ’। অথচ গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক জোরদার করতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছিল রিয়াদ। সৌদি আরবের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ট্রাম্পের কিছু পরামর্শ। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের হাতে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি ফের উন্মুক্ত করার দায়িত্ব অন্য দেশগুলোর ওপর বর্তাবে এবং তিনি হয়তো কোনো চুক্তি ছাড়াই যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারেন। কুইলিয়াম বলেন, ‘ট্রাম্পের একতরফা পদক্ষেপ এবং পরিণতির কথা চিন্তা না করার অনিচ্ছায় তারা ব্যাপক হতাশ। আর এই সবকিছুর ওপর বড় আঘাত ছিল এমবিএস (যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান) সম্পর্কে করা তার মন্তব্যগুলো।’
অপমানে বিদ্ধ সৌদি যুবরাজ : গত শুক্রবার মিয়ামিতে সৌদি আরব আয়োজিত এক বিনিয়োগ সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় ট্রাম্প যুবরাজ সালমানকে নিয়ে কথা বলেন। শুরুতে তিনি সৌদি রাজপরিবারের এই সদস্যসহ অন্যান্য উপসাগরীয় নেতাদের প্রশংসা করেন এবং তাকে একজন ‘মহান বন্ধু,’ ‘বিজয়ী’ এবং ‘যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু ২০ মিনিট পরেই ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি (যুবরাজ সালমান) হয়তো ভাবেননি যে তাকে আমার পশ্চাদ্?দেশে চুমু খেতে হবে।’ ট্রাম্প যুবরাজের শীর্ষ সহযোগীদের সামনেই বলেন, ‘তিনি ভেবেছিলেন আমি হয়তো অন্য কোনো পরাজিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবো, যার দেশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এখন তাকে আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। তাকে বলে দেবেন, তিনি যেন আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন।’ সৌদিদের কাছে এটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের অমার্জিত ও অনিশ্চিত আচরণের সর্বশেষ উদাহরণ। ট্রাম্প ও যুবরাজ সালমানের মধ্যে দৃশ্যত ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও রিয়াদ তাকে নিয়ে সতর্ক। সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস
যুদ্ধের কৌশল নিয়ে মতভেদ : অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো সৌদি আরবও ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর শুরু করা এই যুদ্ধে অনিচ্ছাসত্ত্বেও জড়িয়ে পড়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির নিকট-প্রাচ্য বিষয়ের অধ্যাপক বার্নার্ড হেকেল জানান, যুদ্ধ এবং এই সংঘাতের প্রতি সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনাও বেড়েছে। শুরুতে ট্রাম্প যখন ইরানে হামলার কথা ভাবছিলেন, তখন সৌদিরা তাকে ঝুঁকির কথা জানিয়ে সতর্ক করেছিল। তারা ভেবেছিল ‘ইসরায়েলিরা যদি হামলা চালায়, তবে মার্কিনিদেরও এতে জড়িত থাকা উচিত, কারণ তাতে যুদ্ধের ফলাফল অনেক বেশি নিরাপদ হবে।’
নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা : এই হুমকি আরও স্পষ্ট হয়েছে ইরানের নিখুঁত হামলার সক্ষমতায়। ইরান তাদের অবকাঠামোতে হামলার বদলা নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পাশাপাশি সৌদি আরবের শোধনাগার, বাহরাইন ও কুয়েতের পানি শোধন কেন্দ্র, কাতারের প্রধান গ্যাস কমপ্লেক্স এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানিতে আঘাত হেনেছে ইরান। ইরান যদি হরমুজ প্রণালি ফের খুলে না দেয় তবে ট্রাম্প গত মাসে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তখন ওয়াশিংটনে একটি জমকালো অনুষ্ঠানে উপস্থিত আরব রাষ্ট্রদূতরা ফোনে সেই খবর দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একজন তো ভয়ে টেবিল ছেড়ে লাফিয়ে ওঠেন।
আঞ্চলিক শান্তি প্রচেষ্টায় রিয়াদ : সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখে আসলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছিল। তারা এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো প্রথমে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শক্তি কমে যাওয়াকে লাভজনক মনে করেছিল। কিন্তু রিয়াদ এখন আশঙ্কা করছে, ট্রাম্প হঠাৎ করে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে চলে যাবেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে তেহরানের আহত ও আরও কঠোর শাসকদের একাই মোকাবিলা করতে হবে।
সৌদি আরব প্রকাশ্যে ইরানের নিন্দা জানাচ্ছে এবং উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে। কারণ এই যুদ্ধ যুবরাজ মোহাম্মদের সৌদি আরবকে বাণিজ্য ও পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করার ট্রিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এই সপ্তাহে ইসলামাবাদে পাকিস্তান, মিশর এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একটি আঞ্চলিক প্রচেষ্টায় যোগ দিয়েছেন যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পৌঁছাতে রাজি করানোর বিষয়ে আলোচনা করা যায়।