
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩২ বছর নির্ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ এবং সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত দুটি আলাদা বিল পাস হয়েছে। এতে ওই অধ্যাদেশ দুটি আইনে রূপ পাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংসদে অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি রহিত করা এবং ১৬টি পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়।
রোববার (গতকাল) থেকে অধ্যাদেশগুলোকে অনুমোদন দিতে বিল পাসের কাজ শুরু করেছে জাতীয় সংসদ। পাস হওয়া বিল দুটির বিষয়ে বিশেষ কমিটির সুপারিশ ছিল, যেন অধ্যাদেশ যেভাবে আছে, সেভাবে অনুমোদন করা হয়। এ দুটি বিল পাসের মাধ্যমে মোট চারটি অধ্যাদেশ অনুমোদন পেল।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী আলাদাভাবে বিল দুটি পাসের জন্য সংসদে তোলেন। দুটি বিলের কোনোটিতেই কোনো সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না। ফলে বিল দুটি নিয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি।
‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল’ এবং ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশন স্বশাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ বিল’ সরাসরি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিল দুটি পাস হতে আট মিনিটের মতো সময় লাগে। কণ্ঠভোটে বিরোধী দলের সদস্যদের ‘হ্যাঁ’, ‘না’ কোনোটাই বলতে দেখা যায়নি।
সংসদে সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে দুটি বিল উত্থাপনের বিষয়টি সংসদ সদস্যদের জানানো হয়। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সম্পূরক কার্যসূচিতে কিছু বিল আনা হয়েছে। ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। কিছু অধ্যাদেশ ল্যাপস (বাতিল) করা হয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং জুলাই চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁরা বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে চান। জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিল দুটি ১৩৩টি অধ্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে পরবর্তীকালে তিনি বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, এ দুটি বিল ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
তখন বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তাঁরা চান, যেসব অধ্যাদেশ ল্যাপস করার কথা বলা হয়েছে, প্রতিটি বিষয় সংসদে উত্থাপন করা হোক। তাঁরা সেটাতে আলোচনায় অংশ নিতে চান।
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি অধ্যাদেশ সংসদে তোলা হবে। সেখানে আলোচনার সুযোগ থাকবে। গতকাল রোববার যে দুটি বিল আনা হয়েছে, সে দুটির বিষয়ে বিশেষ কমিটি নিঃশর্তভাবে পাস করার বিষয়ে সর্বসম্মত হয়েছিল।
পরে একপর্যায়ে সরকারি চাকরি বিল অনুমোদনের জন্য তোলেন আইনমন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, বিলের ওপর দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব নেই। তিনি বিলের দফাগুলো সরাসরি ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে বিলের দফাগুলো পাস হয়। একই প্রক্রিয়ায় অন্য বিলটিও পাস হয়।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ–সংবলিত বিবৃতিতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি চাকরিতে চাকরিপ্রার্থীদের প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি এবং বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল কর্পোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ২০২৪’–এ সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৩২ বছর করা হয়। কিন্তু কিছু নিয়োগবিধিতে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৩-৪৫ নির্ধারিত আছে। এতে নিয়োগে জটিলতা তৈরি হয়। জটিলতা নিরসনে ২০২৫ সালে অধ্যাদেশটি অধিকতর সংশোধন করা হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর রেখে সার্কুলার জারি করে নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু রয়েছে বিধায় অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা আবশ্যক।
এই আইন অনুযায়ী, বিসিএসের সব ক্যাডারে ও ক্যাডারবহির্ভূত সব সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা হবে ৩২ বছর। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর চাকরির সব পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রেও বয়সসীমা ৩২ বছর হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সরকারি চাকরি আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরে আবার সেটাতে সংশোধনী এনে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। ওই দুটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনা সংশোধনী হুবহু রেখে আজ ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল-২০২৬’ সংসদে তোলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। আলোচনা ছাড়াই বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিলে সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও দণ্ড–সংক্রান্ত বিশেষ বিধান পাস হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করেন, আইনসংগত কারণ ব্যতিরেকে সরকারের কোনো আদেশ, পরিপত্র ও নির্দেশ অমান্য করেন বা এর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করেন বা এসব কাজে অন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে প্ররোচিত করেন, তা হবে অসদাচরণ। ছুটি বা যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছাড়া অন্য কর্মচারীদের সঙ্গে সমবেতভাবে নিজের কাজ থেকে অনুপস্থিত বা বিরত থাকাও হবে সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ। যেকোনো সরকারি কর্মচারীকে তাঁর কর্মে উপস্থিত হতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করা হবে অসদাচরণ। এ ধরনের অসদাচরণের জন্য নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া ও চাকরি থেকে বরখাস্ত করার বিধান আছে।
অমুক্তিযোদ্ধা বাদ দিতে ৪৮১ জনের গেজেট বাতিল : বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকাভুক্ত হওয়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান।
তিনি জানান, এরইমধ্যে আগস্ট ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সারা দেশে তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ৪৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করা হয়েছে। গতকাল রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য জানান তিনি।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে এ সংক্রান্ত প্রশ্নটি উত্থাপন করেন সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: আব্দুল মালিক।
তিনি তার প্রশ্নে অভিযোগ করেন, বিগত ১৫ বছরে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত ছিলেন এবং অনেক অসাধু ব্যক্তি ভুয়া তথ্য দিয়ে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। বিশেষ করে সিলেটের বালাগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলতে আসলে কিছু নেই। তবে কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি অসাধু উপায়ে তালিকায় ঢুকে পড়েছে। এদের চিহ্নিত করার কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) উপকমিটি অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত শুনানি ও যাচাই-বাছাই করছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া মাত্রই তাদের সনদ ও গেজেট বাতিল করা হবে।’
সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা স্মরণ করে মন্ত্রী আজম খান জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী ও সাবেক নৌবাহিনী প্রধান মাহবুব আলী খানের স্মৃতিবিজড়িত এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রবাসে অবস্থানরত যেসব মুক্তিযোদ্ধা এখনো ডিজিটাল সনদ বা স্মার্ট আইডি পাননি, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুততম সময়ে তা প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংসদ সদস্যের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী আশ্বাস দেন, দক্ষিণ সুরমা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের কাজ দ্রুত হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ ও সংস্কারের বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
এ সময় মন্ত্রী বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত নেত্রীর আদর্শে বর্তমান সরকার পরিচালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।’
তিনি আরো বলেন, শিগগিরই তিনি সিলেটের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের স্থানগুলো পরিদর্শন করবেন এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষায় স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আরো তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ১০ লেন হবে, সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ১০ লেন হবে এবং এজন্য বর্তমানে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
মন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন এবং পদুয়াবাজার এলাকার যানজট নিরসনকল্পে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যে বাজেট আছে সেটা সমন্বয় করে, এখানকার যে ওভারপাস আছে সেটা সম্প্রসারণ করার জন্য ইতোমধ্যে নকশা প্রণয়ন করেছি। আমরা মনে করছি এই নকশা অনুসারে কাজটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে সক্ষম হবো এবং তাতে ওই জায়গায় যে সমস্যাটি আছে তার একটা স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে।’
শেখ রবিউল আলম আরও বলন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ১০ লেনে উন্নীত করার একটি প্রকল্পে ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই চলমান রয়েছে। আরও তিনটি আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা ওই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্যে আছে। পদুয়াবাজারে যে ইউলুপের কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে আবার ইন্টারসেকশন যেভাবে আছে তার অধীনে আরও দুটি আন্ডারপাস নির্মাণ করবো।’ ‘ফলে পাঁচটি আন্ডারপাস ওই অঞ্চলে নির্মাণের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে সরকার গ্রহণ করেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। আমরা এরপর ডিপিপি উপস্থাপন করে যে সমস্যাটা আছে তা সমাধান করতে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি,’ যোগ করেন মন্ত্রী।
সরকার সমন্বয় করে কাজ করছে জানিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যে প্রকল্পটি হয়েছিল, সেই প্রকল্প যতটুকু সংশোধন করা দরকার ততটুকু আমরা করতে পারছি, এর বেশি ওই প্রকল্পে করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার নতুন এসেছে। সংসদ সদস্য আমাকে এই বিষয়ে জ্ঞাত করেছেন। আমি সচিব এবং আমাদের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে পাঠিয়েছি। তারা সেখানে সরেজমিনে দেখে আসছেন। বেশ কিছু পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চয়ই সংসদ সদস্য দৃশ্যমান কিছু দেখতে পাবেন।’
মালয়েশিয়ায় নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠাবে না সরকার : বর্তমান সরকার অতীতের ন্যায় সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সিন্ডিকেট পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গতকাল রোববার বিকালে সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রশ্নোত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত প্রশ্ন রেখে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছিল। বর্তমান সরকার কী অতীতের মতো নির্দিষ্ট সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে রাজি হবে; নাকি যোগ্য সব এজেন্সির জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখবে?
জবাবে মন্ত্রী বলেছেন, না, বর্তমান সরকার অতীতের ন্যায় সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সিন্ডিকেট পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে আগ্রহী নয়। বর্তমান সরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্য সব লাইসেন্স প্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখতে সচেষ্ট রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশন, মালয়েশিয়ার মাধ্যমে পত্র যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।
২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩২ হাজার কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে : ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ জন কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রণীত কর্মপরিক্রম বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, রোমানিয়া, সিশেলস, পর্তুগাল, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রেরণের বিষয়ে ১৮টি দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক/চুক্তি সই হয়েছে।
গতকাল রোববার সংসদের প্রথম অধিবেশনের নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আলফারুক আব্দুল লতীফের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বিদেশে কর্মী প্রেরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে নানাবিধ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এরইমধ্যে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ/সংকুচিত শ্রমবাজার- মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে কর্মী প্রেরণের লক্ষ্যে দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, রোমানিয়া, সিশেলস, পর্তুগাল, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রেরণের বিষয়ে ১৮টি দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক/চুক্তি সই হয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ও ইন্টারন্যাশনাল ম্যানপাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় জাপানে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জাপান এর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যে জাপানি ভাষা শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং অধিকহারে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যে এ মন্ত্রণালয়ে ‘জাপান সেল’ নামে আলাদা সেল গঠন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ফেরত আসা কর্মীদের পুনরায় বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, পূর্ববর্তী শিক্ষা কাজের স্বীকৃতি এবং তার সনদ দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এক লাখ ড্রাইভার তৈরির জন্য সরকার ‘দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভি প্রশিক্ষণ প্রদান’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা সফলভাবে চলমান। কম্বোডিয়ার সঙ্গে, জাপানের সঙ্গে স্পেশালাইজ স্কিলড ওয়ার্কার প্রেরণের জন্য মেমোরেন্ডাম অব কো অপারেশন এবং সিশেলস এর সঙ্গে এগ্রিমেন্ট অন লেবার করপোরেশন স্বাক্ষরিত হয়েছে। জাপান স্পেশালাইজড স্কিলড ওয়ার্কার সেন্ডিং এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৯ম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
সংসদে গুম অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশের সমালোচনা ব্যারিস্টার আরমানের : সংসদে দাঁড়িয়ে গুম বিষয়ে আবেগতাড়িত বক্তব্য উপস্থাপন করে গুম অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশের বিরুদ্ধে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। তিনি বলেন, বিশেষ কমিটি কি করে এই আইন (অধ্যাদেশ) বাতিলের সুপারিশ পরামর্শ দেয়? দুজন তো গুমের শিকার ভুক্তভোগী, প্রধানমন্ত্রী নিজে টর্চারের শিকার। তাহলে কেমন করে এই গুমের আইন বাতিলের পরামর্শ দেয়। আমরা জানতে চাই। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় কার্যসূচিতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ কথা বলেন তিনি।
ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) বলেন, আমি আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আছি একটি অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসে। যেখানে আমার মত আরও শত শত মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের আর ফিরে আসার সৌভাগ্য তাদের হয়নি। তাদের পক্ষ থেকে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বিষয়ে মহান সংসদের আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
‘আমরা যারা গুমের শিকার। সেই অন্ধকার ঘরে আমরা মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম এই অন্ধকার ঘরে আমাদের মৃত্যু হচ্ছে। হয়তো আমাদেরকে হত্যা করবেন হয়তো এখানেই আমাদের মৃত্যু হবে। কথা বলার কেউ ছিল না আমাদের। কীটপতঙ্গ, পিঁপড়া, টিকটিকির সঙ্গে আমরা কথা বলতাম। বুঝতে পারতাম না বাইরে দিন না রাত। মনে হতো জীবন্ত কবর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মনে হতো মৃত্যু এর থেকে হাজারগুণ ভালো। মনে হতো আজকে বুঝি আমাকে হত্যা করা হবে। এভাবেই মৃত্যুর প্রহর যখন গুনছিলাম তখন একদিন রাতে আমাকে যখন ট্রেনে হয়েছে সেখান থেকে বের করা হয়। তখনো আমি ধরে নিয়েছিলাম আজকে আমাকে হত্যা করা হচ্ছে তখন আমি সুরা ইয়াসিন পড়া শুরু করেছিলাম যাতে মৃত্যু সহজ হয়। পরে জানতে পারলাম কিছু বাচ্চা জীবন দিয়ে চোখ হারিয়ে পা হারিয়ে ফ্যাসিবাদকে বিদায় করে আমাদেরকে আবার দুনিয়ার আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, এই সংসদকে যদি বলতে হয় এই সংসদ হচ্ছে মজলুমদের মিলনমেলা। এখানে এমন একজন কেউ পাওয়া যাবে না যিনি বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের জুলুমের শিকার হন নাই।
গুমের শিকার, গুমের ভুক্তভোগী যারা ফিরে এসেছেন ও গুম পরিবারের পক্ষ থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আমরা স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ্য করছি, আমাদের সঙ্গে যা যা করা হয়েছে, সেই জুলুম যাতে বাংলার মাটিতে আর কখনো না হয়, সেটি নিশ্চিত করার জন্য যে দুটি আইন করা হয়েছিল গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইন। বিশেষ কমিটি এই আইন দুটি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এপর্যায়ে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কেমন করে দুজন গুমের শিকার ভুক্তভোগী, যেই প্রধানমন্ত্রী নিজেও টর্চারের শিকার, তাহলে কেমন করে এই আইন দুটি বাতিলের পরামর্শ দেয়? আমরা জানতে চাই। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আমাদের আবেদন, যদি এই আইন সরকার পরিশোধিত করতে চায় তাহলে এই আইনটিকে আগে অনুমোদন দিয়ে আইনে রূপান্তর করুক তারপর প্রয়োজনে সংশোধনী বিল এনে সংশোধন করা হোক।
আওয়ামী লীগের আমলের উত্তরই দিচ্ছেন সড়ক মন্ত্রী : জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের জবাবে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। মন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘হতাশাজনক’ জানিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময় যে উত্তর দিতো, মন্ত্রীসাব সেই উত্তরই দিয়েছেন। এই রবীন্দ্র সংগীত আমরা বহু শুনেছি।
গতকাল রোববার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ নোটিশের ওপর আলোচনার সময় ক্ষোভ জানান এই সংসদ সদস্য।
সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে আন্ডারপাস ও ওভারপাস না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ২০১৪ সালের কুত্তা মার্কা নির্বাচনের সময় ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর বহু লোক মারা গেলেও কেউ ক্ষতিপূরণ পায়নি। মন্ত্রী বলছেন ওভারপাস হবে, এক্সপ্রেসওয়ে হবে—এসব সচিবদের শেখানো বুলি। যারা টাকা লুণ্ঠন করেছে, তারাই তাকে এগুলো শিখিয়ে দিয়েছে।
মন্ত্রীর আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে মনিরুল হক আরও বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় বললেন ওভারপাস হবে, এক্সপ্রেসওয়ে হবে—এ রবীন্দ্রসংগীত বহু শুনেছি। আমাদের শান্তিমতো মরতে দেন। উনার প্রতিটি কথা সচিবেরা যা বলে দিয়েছে, যারা টাকা লুণ্ঠন করেছে, তারা শিখিয়ে দিয়েছে সেটাই তিনি বলেছেন। আমি এর প্রতিবাদ করছি।’
জবাবে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ১০ লেনে উন্নীত করার জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ প্রকল্প আগে থেকে চলমান আছে। আমরা শুধু নকশা পরিবর্তন করে ও বাজেট সমন্বয় করে কাজ করতে পারছি। সরকার নতুন এসেছে। সংসদ সদস্য আমাকে যা জ্ঞাত করেছেন, সে বিষয়ে সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের পাঠিয়েছি এবং কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আশা করি, দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান কিছু দেখতে পাব।’ একপর্যায়ে স্পিকার মন্ত্রীর কাছে জানতে চান, এসব পদক্ষেপে মনিরুল হক চৌধুরীর সমস্যার সমাধান হবে কি না। জবাবে মন্ত্রী বলেন, আংশিক হবে।