
দেশে মিজেলস (হাম) পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলছে। গত ২২ দিনে সারাদেশে হাম সন্দেহে আক্রান্ত হয়েছে ৭৬১০ জন শিশু এবং মৃত্যু হয়েছে ১১৩ জনের। এড়াছা গত ২৪ ঘণ্টায় হামে মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের, আক্রান্ত হয়েছে ৯৭৪ জন। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে হাম সন্দেহে ৭ হাজার ৬১০ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে পরীক্ষায় ৯২৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম সন্দেহে ১১৩ জন শিশুর মৃত্যু হলেও নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি হাম সন্দেহে আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে মোট আক্রান্ত হয়েছে ৩২৫৯ জন শিশু, এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৪৬৮ জন।
অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাম সন্দেহে ৬৫৪ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে।
মৃত্যুর হিসেবে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে, ৫৫ জন। এরপরই আছে ঢাকা বিভাগ, ১০ জন। এ সময় ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগে মৃত্যুর কোনো ঘটনা নেই।
আগামী ৩ মে থেকে সারাদেশে হামের টিকা দেওয়া হবে- স্বাস্থ্যমন্ত্রী : সারাদেশের সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে আগামী ৩ মে থেকে হামণ্ডরুবেলার টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল রোববার ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামণ্ডরুবেলার টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ৩ মে থেকে সারাদেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। এছাড়া আগামী ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ময়মনসিংহ ও বরিশাল জেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। পরবর্তী সময়ে তা পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে হামের যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। হাম এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা করোনার মহামারির চেয়ে কম উদ্বেগজনক নয়।
অতীতের সরকারগুলোর ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে এবার হামের প্রাদুর্ভাব হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৮২ শতাংশ রোগী ৫ বছরের কম বয়সী হওয়ায় তাদের আাগে টিকা দেওয়া হচ্ছে। বাকিদের পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।
হামণ্ডরুবেলার টিকাদান শুরু ৩০ উপজেলায় : হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুরা হামণ্ডরুবেলার টিকা পাবে। কেউ আগে পেয়ে থাকলেও চলমান ক্যাম্পেইনে টিকা নিতে পারবে। টিকা প্রদান কার্যক্রম চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। গতকাল রোববার সকাল ৯টা থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় একযোগে এই কর্মসূচি শুরু হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রোববার সকালে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই টিকা দান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এ সময়ে তিনি জানান, হামের পরিস্থিতি বর্তমানে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। মূলত যেসব এলাকায় সম্প্রতি হামের প্রকোপ বেশি দেখা গেছে, সেসব ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষ কার্যক্রমের আওতাভুক্ত উপজেলা ও জেলাগুলো হলো : বরগুনা সদর ও পৌরসভা, পাবনা সদর, পৌরসভা, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া; চাঁদপুর সদর, পৌরসভা ও হাইমচর; কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু; গাজীপুর সদর; চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, পৌরসভা, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট; নেত্রকোণা’র আটপাড়া; ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, তারাকান্দা ও শ্রীনগর; রাজশাহীর গোদাগাড়ী; বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ; নওগাঁর পোরশা; যশোর সদর ও পৌরসভা; নাটোর সদর; মুন্সীগঞ্জ সদর, পৌরসভা ও লৌহজং; মাদারীপুর সদর ও পৌরসভা; ঢাকার নবাবগঞ্জ; ঝালকাঠির নলছিটি; শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যেসব শিশুর জ্বর রয়েছে বা বর্তমানে অসুস্থ, তাদের এই সময়ে টিকা না দিয়ে সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি আক্রান্ত বা জ্বর আছে এমন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র টিকাই দেওয়া হবে, অতিরিক্ত কোনো ওষুধ দেওয়া হবে না। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে টিকা দেওয়া হবে। আগের টিকাদান কেন্দ্রগুলো ছাড়াও স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত স্থান, স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রাথমিকভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যক্রম শুরু হলেও ধীরে ধীরে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে। জুলাই মাসের মধ্যে এটি নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে চালু থাকবে।
রাজশাহীতে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ শিশুর মৃত্যু : রাজশাহীত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে দুই এবং বেসরকারি সিডিএম হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, গত শনিবার দুপুর ১২টা থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশু মারা গেছে। মারা যাওয়া শিশুদের বয়স ছয় ও সাত মাস। তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৪ জন শিশু। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ১২৫ জন। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে ৩৬ জন। ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট রোগীর সংখ্যা ৩৯১ জন। এনিয়ে এই হাসপাতালে ৪০ জন মারা গেল। অন্যদিকে, রাজশাহীর বেসরকারি হাসপাতাল সিডিএমণ্ডএ শনিবার দিবাগত রাতে দুজন ও রোববার সকালে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সবমিলে এই হাসপাতালে তিন শিশু মারা গেছে। রাজশাহীর সিডিএম হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার তারেক আজিজ বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুজন শিশু চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও একজন শিশু নাটোরের।