
হরমুজ প্রণালী পার হতে না পেরে শারজায় ফিরছে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি না পেয়ে আবারও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজা বন্দরে ফিরে যাওয়ার পথে রয়েছে। বিএসসি সূত্র জানায়, প্রায় ৪০ দিন আটকে থাকার পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে গত বুধবার সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালীর উদ্দেশে রওনা দেয় জাহাজটি। টানা প্রায় ৪০ ঘণ্টা যাত্রা শেষে শুক্রবার সকালে প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছে ইরান সরকারের কাছে পারাপারের অনুমতি চাওয়া হয়। তবে তেহরান সেই অনুমতি দেয়নি। ফলে জাহাজটিকে ঘুরিয়ে নিরাপদে শারজায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ইরানের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমতি চাওয়া হলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কূটনৈতিকভাবে অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে জাহাজটি হরমুজের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় শারজায় ফিরে যেতে বলা হয়েছে। তিনি জানান, জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিকের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত রয়েছে। প্রতিদিন ১৮ টন সামুদ্রিক পানি পরিশোধনের সক্ষমতা থাকলেও ইঞ্জিন চালু রাখতে হওয়ায় রেশনিং করে পানির ব্যবহার দৈনিক ৬ টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। নাবিকদের মনোবল ধরে রাখতে জনপ্রতি দৈনিক খাবারের বরাদ্দ ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসিক বেতনের সমপরিমাণ ওয়ার অ্যালাউন্স দেওয়া হচ্ছে। বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে পণ্য নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। পরে কাতার থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছে। পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ১১ মার্চ জেবেল আলীতে পণ্য খালাস শেষ হওয়ার পর কুয়েতে নতুন পণ্য বোঝাইয়ের পরিকল্পনা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি।
এলএনজি-এলপিজি নিয়ে দেশের পথে আরও ৫ জাহাজ : মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলছে। আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে অন্তত পাঁচটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব চালানে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালের জন্য এলএনজি এবং চট্টগ্রামের জন্য এলপিজি রয়েছে। গতকাল শুক্রবার মালয়েশিয়া থেকে ২ হাজার ৪৭০ টন এলপিজি নিয়ে ‘মর্নিং জেলি’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৬৯ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘ইএমইআই’ নামের আরেকটি জাহাজ মহেশখালীর ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) পৌঁছাবে। এরপর ১১ এপ্রিল ‘কংটং’ নামের আরেকটি এলএনজি জাহাজ একই পরিমাণ কার্গো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসার কথা রয়েছে। ১৩ এপ্রিল মালয়েশিয়া থেকে এলপিজি নিয়ে ‘পল’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে। আর ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪ হাজার ৬৭৮ টন এলএনজি নিয়ে ‘ম্যারান গ্যাস হাইড্রা’ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, পাঁচটি জাহাজই বর্তমানে সমুদ্রপথে রয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এসব জাহাজের বার্থিংকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর আগে বুধবার রাতে মালয়েশিয়া থেকে ২৬ হাজার টন অকটেন নিয়ে ‘এমটি সেন্ট্রাল স্টার’ নামের একটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায় এবং পরে পতেঙ্গার ডলফিন জেটিতে ভেড়ে। একই সময়ে মালয়েশিয়া থেকে হাই সালফার ফুয়েল অয়েল নিয়ে ‘ইস্টার্ন কুইন্স’ নামের আরেকটি ট্যাংকারও বন্দরের বহির্নোঙরে আসে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কবির জানান, চলতি মাসে মোট ৯টি এলএনজি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এরইমধ্যে দুটি জাহাজ এসে খালাস কার্যক্রম চলছে। প্রতিটি জাহাজ সাধারণত ৬৯ থেকে ৭০ হাজার টন গ্যাস বহন করে। আরপিজিসিএল সূত্রে জানা যায়, গত মার্চ মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে আটটি জাহাজে করে প্রায় ৬ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি সরবরাহে চাপ কমাতে সহায়ক হয়েছে।