ঢাকা বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সরকারি এসআরও উপেক্ষা

নথি সত্যায়ন-পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে ভোগান্তির মুখে প্রবাসীরা

নথি সত্যায়ন-পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে ভোগান্তির মুখে প্রবাসীরা

অ্যাপোস্টিল কনভেনশনের অধীনে প্রবাসীদের নথি সত্যায়ন সহজ করার উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে না। বিদেশি ডকুমেন্টের স্বীকৃতি সহজ করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। কনভেনশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দূতাবাস এড়িয়ে সহজে পাওয়ার অ্যাটর্নি পাওয়ার সুযোগ এখনও অধরা। সত্যায়নে কনভেনশনের নির্দেশনা অনুসরণ করতে অন্তর্বর্তী সরকার এসআরও জারি করেছিল। কিন্তু বাস্তবে এসআরও উপেক্ষিত থেকে গেছে। এতে প্রবাসীদের দুর্ভোগ আগের মতোই থেকে গেছে। নথি সত্যায়নে এখনও বাংলাদেশ দূতাবাসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে দূতাবাসে প্রবাসীদের ধরনা কমছে না। এতে দূতাবাস কেন্দ্রিক দুর্নীতিবাজ চক্রের দৌরাত্ম্যও থামছে না।

ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা জানান, ১৯৬১ সালের হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশন একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। যা বিদেশে ব্যবহারের জন্য সরকারি ডকুমেন্টের সত্যায়ন প্রক্রিয়াকে সহজ করে। ‘সরকারি ডকুমেন্টের’ সংজ্ঞার মধ্যে নোটারি কার্যাবলী অন্তর্ভুক্ত আছে। আগে নথি সত্যায়নে একাধিক ধাপে জটিল লিগালাইজেশন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতো। এখন ‘নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ’ কর্তৃক ইস্যুকৃত একটি মাত্র ‘অ্যাপোস্টিল সার্টিফিকেট’-এর মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। এর ফলে জন্মসনদ, শিক্ষাগত সনদ, এফিডেভিট এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নিসহ বিভিন্ন নথি ১২৫টিরও বেশি সদস্য রাষ্ট্রে সহজেই স্বীকৃত ও গৃহীত হয়েছে। মূলত কূটনৈতিক বা কনস্যুলার লিগালাইজেশন বাতিল করাই হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশনের প্রধান উদ্দেশ্য। এটি ধীরগতির ও বহু ধাপের জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে একটি একক ও মানসম্মত সনদ সত্যায়ন ব্যবস্থা। এই কনভেনশনের অধীনে নথির সত্যায়নে নিজ দেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সঙ্গে অতিরিক্ত যোগাযোগ বা সত্যায়নের প্রয়োজন হবে না।

বাংলাদেশ ২৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে এই কনভেনশনে যোগদান করে। এটি কার্যকর হয় ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ থেকে। এই তারিখ থেকে বাংলাদেশ এবং অন্য সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে অ্যাপোস্টিলকৃত ডকুমেন্ট সত্যায়ন করা যাবে। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসআরও জারি করেছিল। যাতে নথি সত্যায়নে দূতাবাস বা কনস্যুলারের অতিরিক্ত সত্যায়ন প্রয়োজন না থাকার কথা বলা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী অ্যাপোস্টিলপ্রাপ্ত নথির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সত্যায়নের প্রয়োজন নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি ও নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন বাংলাদেশ মিশনের ওয়েবসাইটে এখনও পুরোনো নির্দেশনা বহাল রয়েছে। যা প্রবাসীদের বিভ্রান্ত করছে।

২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর সরকারি এসআরও অনুযায়ী, বিদেশে ব্যবহৃত ডকুমেন্ট প্রথমে নোটারাইজ করে পরে অ্যাপোস্টিল করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো এখনও পুরোনো ও অসঙ্গতিপূর্ণ নির্দেশনা প্রচার করছে। এতে দূতবাসে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কাজে আসা প্রবাসীরা প্রতিদিন ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দ্বৈত প্রক্রিয়া শুধু প্রবাসীদের হয়রানি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ডকুমেন্টের গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বাংলাদেশে ভুয়া ডকুমেন্টের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক ধারণা আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্বে থাকাকালীন সময় বিষয়টি নিয়ে একবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তার উদ্বেগ প্রকাশের পর বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, আইনগত নির্দেশনার কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে বিদেশে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও অ্যাপোস্টিল স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে দাবি উঠেছে প্রবাসীদের মধ্যে। লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ ও জাতীয় জনগুরুত্বের বিষয় বিবেচনা করে একটি জনস্বার্থ মামলার প্রস্তুতি চলছে।

একই সঙ্গে প্রস্তাব করা হয়েছে, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা ২০১৫-এর ১০ (৫)(ক) বিধির সংশোধন, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা থাকবে। যেখানে হেগ অ্যাপোস্টিল সদস্য রাষ্ট্রে নোটারি ও অ্যাপোস্টিলকৃত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি পুনরায় দূতাবাস বা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুনঃসত্যায়ন প্রয়োজন হবে না। তা বাংলাদেশে আইনগতভাবে বৈধ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রস্তাবিত জনস্বার্থ মামলায় আদালতের কাছে নির্দেশনা চাওয়া হবে। যাতে সব বাংলাদেশ মিশনে অভিন্ন নীতিমালা কার্যকর করা হয় ও ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা সার্কুলার বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। পাশাপাশি অ্যাপোস্টিলভিত্তিক আধুনিক পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আদালতের নির্দেশনা অনুসারেও এই সংশোধন কার্যকর হলে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের চরম দুর্ভোগ দূর হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনলাইনে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন সহজ হবে। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, এ ধরনের কিছু অভিযোগ আমরা মাঝেমধ্যে পাই। সবগুলো অভিযোগ পুরোপরি সত্য নয়। তবে দূতাবাসগুলোতে জনবল সংকটে কিছু বিঘ্নিত হচ্ছ। এতে হয়তো সত্যায়ন সংক্রান্ত কাজ দেরি হতে পারে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত