
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে কিছু কিছু জায়গায় লোডশেডিং হচ্ছে। বিষয়টি সহনীয় মাত্রায় আনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে এবং বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা করে রাজধানীতেও পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শহরের মানুষ আরামে থাকবে আর গ্রামের মানুষ কষ্টে থাকবে এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে জ্বালানি সংকট নিরসনে গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়ে এ তথ্য জানান। দেশের কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এবং গ্রাম-শহরের বিদ্যুৎ বৈষম্য কমাতে রাজধানীতেও পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার তাদের শপথের মর্যাদা এবং পবিত্র সংসদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। বর্তমানের এই বিদ্যুৎ সমস্যা একদিনের নয়, বরং এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার ফল। বর্তমানে কাগজে-কলমে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেটির গরমিল রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ফসল কাটার মৌসুম চলায় কৃষকদের সেচ কাজের সুবিধার্থে প্রধানমন্ত্রী নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন বাংলাদেশের চেতনা সমুন্নত রাখতে রাজধানীতে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশে প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার না থাকায় দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
ঢাকায় লোডশেডিং ১-২ ঘণ্টা আর গ্রামে ১৪ ঘণ্টা- সংসদে রুমিন ফারহানা : ঢাকায় এক-দুই ঘণ্টা লোডশেডিং থাকলেও গ্রামে ১৪ ঘণ্টা গড়ায়। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে এখন গ্যাস ছাড়া কারোর চুলা জ্বালানোর পথ নেই বলে মন্তব্য করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নিজের প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকা আশুগঞ্জ একটা শিল্পনগরী। এখানে সার কারখানা, বিদ্যুৎ, মিল, ফ্যাক্টারি আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাস যায় সারা দেশে, কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ গ্যাস পায় না। তিসাস গ্যাস ফিল্ড বাংলাদেশের অন্যতম গ্যাস কেন্দ্র। এখান থেকে ৩২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সরবরাহ হচ্ছে। অথচ আমার নির্বাচনী এলাকায় সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। চুলা মিট মিট করে জ্বলে। এরপরে মন চাইলে এক ঘণ্টার জন্য গ্যাস আসে, তারপরে আর খবর নাই।
তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের সংকট আছে তারপরে শীতকালে চাহিদা আরও বাড়ে। অন্যদিকে আছে অবৈধ সংযোগ। ২০১৬ সাল থেকে বাসা-বাড়িতে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ হলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাহায্যে এখনও বেশকিছু মানুষ অবৈধ সংযোগ নিয়ে রেখেছে। এতে করে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। যাদের বাড়িতে (বৈধ) লাইন আছে তারাও গ্যাস পাচ্ছে না। এখন এলপিজি ও বৈদ্যতিক চুলাই ভরসা। সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গুণিজনদের কথা বলতে গিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, মেঘনা-তিতাস পাড়ের দেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আলাউদ্দিন খাঁ, শচীন দেব বর্মনের দেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কীর্তন আর বাউল গানের দেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ছানামুখী মিষ্টির অপরূপ স্বাদের দেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। দিগন্ত জোড়া হাওরের দেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া আবার তুচ্ছ বিষয়ে টেঁটা নিয়ে মাঠে নামার দেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে। অলি আহাদ ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মতো সংগ্রামী চরিত্রের জন্ম এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। যাদের কল্যাণে বাংলা রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি : বন্ধদিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় অবস্থিত বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বুধবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের চারটি কোল মিলের মধ্যে দুটি ভেঙে যায়। এতে ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট আগে থেকেই বন্ধ ছিল। চালু থাকা একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলো। বৃহস্পতিবার বিকালে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘প্রথম ইউনিটের চারটি কোলমিলের মধ্যে দুটি ভেঙে যাওয়ায় ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ আছে। পাথরমিশ্রিত কয়লার কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে। ইউনিটটি চালু করতে প্রয়োজনীয় মেরামত কার্যক্রম চলছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই ইউনিটটি চালু হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করছি আমরা।’
বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট রয়েছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিট ১২৫ মেগাওয়াট করে ২৫০ মেগাওয়াট। তৃতীয় ইউনিটটি ২৭৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে। আর ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ইউনিটটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে বন্ধ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, আগামী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে চালু হবে ২৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ইউনিট। দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু করতে চীনা কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের আলোচনা চলছে। এই ইউনিট চালু করার জন্য চার সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। খুব দ্রুতই দ্বিতীয় ইউনিট চালুর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত আসবে।
গ্যাস সংকটে অর্ধেকের নিচে বিদ্যুৎ উৎপাদন, লোডশেডিং সমন্বয়ের উদ্যোগ : গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বুধবার দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। এতে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে পরিস্থিতি চরম চাপে রয়েছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৩ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে এবং এই খাতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াটের বেশি। তবে গ্যাসের অভাবে বর্তমানে এর অর্ধেকের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
যুগ্মসচিব জানান, দেশের সব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত বুধবার হিসাবে গ্যাস থেকে উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তিনি বলেন, ১ হাজার ২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া গেলে ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন সম্ভব হতো। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ছাড়াও শিল্প-কারখানা এবং সার উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে হচ্ছে, যার কারণে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো যাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকার সাশ্রয়ের নীতি নিয়েছে। এ অবস্থায় দেশের ৮টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণদমে চালু থাকলে লোডশেডিং পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। এদিকে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৬ এপ্রিলের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে এবং বন্ধ থাকা ইউনিট থেকে আবার বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে বলেও জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে অপ্রয়োজনে লাইট, ফ্যান ও এসি ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে উম্মে রেহানা বলেন, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদনে ধস, ৫ ইউনিটের ৪টিই বন্ধ : রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তীব্র পানি স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস নেমেছে। কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে চারটিই বন্ধ রয়েছে। পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় বর্তমানে মাত্র একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে এই কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২৪২ মেগাওয়াট। তথ্যানুযায়ী, শুধুমাত্র ২ নম্বর ইউনিট থেকে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। পানির স্তর দ্রুত কমতে থাকায় গত মঙ্গলবার থেকে বাধ্য হয়ে দুটি ইউনিটের পরিবর্তে একটি ইউনিটে উৎপাদন নামিয়ে এনেছে কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর দিন দিন কমতে থাকে। আর পানির ওপর নির্ভরশীল এই কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে গত বুধবার সকাল নয়টা পর্যন্ত শুধুমাত্র ২ নম্বর ইউনিট হতে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে রুলকার্ভ অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদে ৮৩.৮০ এমএসএল (মিন সি লেভেল) পানি থাকার কথা থাকলেও কাপ্তাই হ্রদে পানির লেভেল ছিল ৭৭ দশমিক ৪৭ এমএসএল। এদিকে কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা জানান, বিগত সপ্তাহগুলোতে কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দুইটি ইউনিট চালু রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও কাপ্তাই হ্রদের পানির লেভেল দ্রুত কমতে থাকায় গত মঙ্গলবার হতে শুধুমাত্র একটি করে ইউনিট চালু রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত বৃষ্টি হবে না, ততদিন পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান হবে না।
চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে : পিডিবি চট্টগ্রাম বিতরণ অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ২৪টি। এরমধ্যে ছয়টি সরকারি, বাকি ১৮টি বেসরকারি মালিকানাধীন। এর মধ্যে মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও বাঁশখালীতে দুটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র, পাঁচটি গ্যাসভিত্তিক, একটি জলবিদ্যুৎ এবং দুটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ফার্নেস অয়েল দিয়ে চলে। এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের সক্ষমতার অর্ধেকও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ বিতরণ অঞ্চল (দক্ষিণ) গঠিত। এ অঞ্চলে প্রতিদিন বিদ্যুতের গড় চাহিদা ১৩ শ থেকে ১৪ শ মেগাওয়াট। কিন্তু দেশের অন্যান্য এলাকার চাহিদা মেটাতে গিয়ে জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রাম সরবরাহ পায় প্রয়োজনের চেয়ে কম। পিডিবি চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিচালন ও সংরক্ষণ) একেএম মামুনুল বাশার বলেন, আমাদের বিদ্যুতে সংকট রয়েছে, সে কারণে শহর-গ্রাম সবখানেই নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তেল-গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদনও কমে গেছে। গত সোমবারে অফপিক আওয়ারে (বেলা ১১টা) উৎপাদন ছিল ২১৫২ মেগাওয়াট, আর পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা ৭টা) বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ২৩৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে দিনে ৬৭ মেগাওয়াট এবং রাতে ছিল ১০৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। এর আগে রোববার দিনে উৎপাদন নেমে আসে ২০০৯ মেগাওয়াটে, আর সন্ধ্যায় এ পরিমাণ ছিল ২৩৪২ মেগাওয়াট। সেদিন রাতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১৫৮৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলেছে ১৪৫৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ লোডশেডিং ছিল ১২৭ মেগাওয়াট। গত শুক্রবার চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলো থেকে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৮৮৫ মেগাওয়াট, অফপিক আওয়ারে তা নেমে আসে ১৩৮০ মেগাওয়াটে। লোডশেডিং ছিল সকালে ৯০ ও সন্ধ্যায় ৮৪ মেগাওয়াট।
চট্টগ্রাম পটিয়া উপজেলার কেলিশহর গ্রামের বাসিন্দা কাজল দে বলেন, দিন ও রাত মিলিয়ে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
পিডিবি চট্টগ্রাম বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সারাদেশে বিদ্যুতের যে অবস্থা আমাদের চট্টগ্রামেও একই অবস্থা। চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলো থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবার পর আমাদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেয়। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ না পেলে আমরা লোডশেডিং করে থাকি।
পিডিবি চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলোতে তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনে যেতে পারছে না। রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ইউনিট গ্যাসের অভাবে বন্ধ আছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দুই থেকে তিনটি কেন্দ্র পানির অভাবে নিয়মিত বন্ধ থাকছে।