
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হওয়ার অভিযোগ তুলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা ‘অসম্ভব’ বলে জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। মার্কিন বার্তাসংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, যুদ্ধবিরতির কোনো অর্থই থাকে না, যদি তা নৌ অবরোধের মাধ্যমে লঙ্ঘিত হয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, সব ফ্রন্টে ইহুদিবাদী আগ্রাসন বন্ধ না হলে এবং সমুদ্রপথের অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হবে না। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো ইরান জাতির অধিকারসমূহকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আরও বলেন, নৌ-অবরোধের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন না করলে এবং সব ফ্রন্টে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড বন্ধ হলেই একটি ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি’ অর্থবহ হতে পারে। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে গালিবাফ লিখেছেন, ‘নৌ-অবরোধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন না করলে এবং জায়নবাদীদের সব ফ্রন্টের যুদ্ধংদেহী মনোভাব বন্ধ হলেই একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি অর্থবহ হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির এমন চরম লঙ্ঘনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব নয়।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সর্বশেষ আলোচনায় ইরানি দলের নেতৃত্ব দেওয়া গালিবাফ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, চাপের মুখেও তা পারবে না। একমাত্র পথ হলো ইরানি জাতির অধিকারকে মেনে নেওয়া।’
হরমুজ প্রণালীতে প্রথমবারের মতো টোল আদায় ইরানের : হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে প্রথমবারের মতো টোল আদায় শুরু করেছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের এক প্রতিবেদনে এক জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতার বরাতে বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানানো হয়েছে। পার্লামেন্টের প্রেসিডিয়াম বোর্ডের এক সদস্য তাসনিমকে জানিয়েছেন, তিনি নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে জেনেছেন যে ইরান এখন চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর মাশুল আরোপ করেছে। জাহাজ ভেদে, কার্গোর পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে এই ফি ভিন্ন হয়ে থাকে। ইরান নিজেই এই ফি মূল্যায়ন ও সংগ্রহের নিয়ম নির্ধারণ করেছে। তিনি দাবি করেছেন, এই মাশুল থেকে সংগৃহীত অর্থ বর্তমানে সমন্বিত সরকারি কোষাগারের হিসাবে জমা করা হচ্ছে।
আলাদা এক প্রতিবেদনে পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদরেজা হাজি-বাবাই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির টোল থেকে পাওয়া প্রথম রাজস্ব দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে তেহরান। ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর নৌ-অবরোধও আরোপ করেছিল। এদিকে পেন্টাগন দাবি করছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান যেসব মাইন পুঁতে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো অপসারণ করতে ছয় মাস পর্যন্তও সময় লাগতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বরাতে গত বুধবার ওয়াশিংটন পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ দীর্ঘ সময়ের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও অনেকটা সময় চড়া থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম যেমন হু হু করে বাড়ছে, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চললেও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে এই পথটি কার্যত বন্ধই রয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সমুদ্রপথটি মাইনমুক্ত করতে কয়েক মাস লেগে যাবে। পেন্টাগন মনে করছে, যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব নয়। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এক গোপন ব্রিফিংয়ে এই ৬ মাসের কথা জানানো হয়েছে।
আইনপ্রণেতাদের জানানো হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে ২০টি বা এরও বেশি মাইন পেতে রেখেছে। এর মধ্যে কিছু জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে এগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য এএফপি যোগাযোগ করলে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল ওয়াশিংটন পোস্টের এ তথ্যকে ‘ভুল’ বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, সমুদ্রের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে তারা ‘বিপজ্জনক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের তুলনায় ১৪ গুণ। এই বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মাইন থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বেসামরিক প্রধান জন সি ফেলানের পদত্যাগ : ট্রাম্প প্রশাসন ছাড়ছেন মার্কিন নৌবাহিনীর বেসামরিক প্রধান (সচিব) জন ফেলান। বুধবার পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তার এই বিদায়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, জন ফেলানের পদত্যাগ ‘অবিলম্বে কার্যকর’ হয়েছে। তার জায়াগায় নৌবাহিনীর আন্ডারসেক্রেটারি হুং কাও ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
জন ফেলানের বিদায়ের সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ নৌবাহিনী উল্লেখ করেনি। তবে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজ নির্মাণ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে মার্কিন নেতৃত্বের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া উত্তেজনার জেরে তিনি পদত্যাগ করেছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে একের পর এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সেনাপ্রধান র্যান্ডি জর্জকে পদত্যাগ করতে বলেন। এ ছাড়া জেনারেল ডেভিড হোডনে এবং মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিনকেও সম্প্রতি তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য পেন্টাগনের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হেগসেথ এখন পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন, যার মধ্যে নৌবাহিনীর অপারেশন প্রধান এবং বিমানবাহিনীর ভাইস চিফ অব স্টাফও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সত্ত্বেও তেল রপ্তানি অব্যাহত ইরানের : ইরানের বন্দরে গত ১৩ এপ্রিল থেকে অবরোধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ফাঁকি দিয়ে তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে ইরান। তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সা জানিয়েছে, গত ১৩ থেকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এই চালানগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ করা এলাকা পার হতে সক্ষম হয়েছে।
ছয়টি বড় ট্যাংকারে এসব তেল রপ্তানি করা হয়েছে। ট্যাংকারগুলো তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) বন্ধ করে যাতায়াত করছিল। অবরোধের বিষয়ে ভরটেক্সা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ইরানি বন্দর বা হরমুজ প্রণালির খুব কাছে কার্যকর করা হচ্ছে না। বরং পাকিস্তান-ইরান সীমান্ত থেকে ওমানের পশ্চিম কোণ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মাইল এলাকায় কিছুটা নমনীয়ভাবে এই অবরোধ চলছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, ১৩ থেকে ২২ এপ্রিলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ভেঙে মোট ৩৫টি জাহাজ যাতায়াত করেছে। এই তালিকায় ইরান-সংশ্লিষ্ট বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু মালবাহী জাহাজও রয়েছে। তবে অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজের সংখ্যা কমেছে। গত ৩০ দিনে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩টি ট্যাংকার যাতায়াত করত, ১৩ থেকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে তা কমে ১ থেকে ২টিতে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী গতকাল বুধবার জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধের অংশ হিসেবে তারা এ পর্যন্ত ৩০টিরও বেশি জাহাজকে বন্দরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
আলোচনার পথে তিন বাধার কথা জানালেন ইরানের প্রেসিডেন্ট : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ সংলাপ ও সমঝোতাকে স্বাগত জানায় এবং তা অব্যাহত রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। পেজেশকিয়ান আরও লিখেছেন, ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, অবরোধ এবং হুমকি প্রদানই প্রকৃত আলোচনার প্রধান বাধা।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যের শেষে লিখেছেন, ‘বিশ্ব তোমাদের অন্তহীন কপট কথাবার্তা এবং দাবি ও কাজের মধ্যকার বৈপরীত্য দেখতে পাচ্ছে।’ এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ লিখেছেন, ‘নৌ-অবরোধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন না করলে এবং জায়নবাদীদের (ইসরায়েল) সব ফ্রন্টের যুদ্ধংদেহী মনোভাব বন্ধ হলেই একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি অর্থবহ হয়।’ গালিবাফ আরও লিখেছেন, ‘যুদ্ধবিরতির এমন চরম লঙ্ঘনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব নয়।’