ঢাকা মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

‘আমি শুধু বাচ্চাটারে দুই টুকরো করেছি, ধর্ষণ করছে, মারছে ডলার’

‘আমি শুধু বাচ্চাটারে দুই টুকরো করেছি, ধর্ষণ করছে, মারছে ডলার’

রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা এখন দায় চাপাচ্ছেন ডলার নামে এক ব্যক্তির ওপর। সোহেলের ভাষ্য, তিনি শুধু রামিসাকে ‘দুই টুকরো’ করেছেন। ধর্ষণ এবং হত্যা করেছে ডলার নামের মিরপুরের সেই ধনাঢ্য ব্যক্তি। ঢাকা মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন গতকাল সোমবার সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে তাদের বিচার শুরুর আদেশ দেন।

আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে সোহেল সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে ডলারের বিষয়ে কথা বলেন। গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।

পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন। পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেদিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। আসামি সোহেল রানা ‘দোষ স্বীকার করে’ আদালতে জবানবন্দি দেন।

পাঁচ দিন তদন্ত করেই গত ২৪ মে দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। দ্রুত বিচার শেষ করার জন্য সেদিনই মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য সোমবার সোহেলকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এং স্বপ্নাকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে শুনানির জন্য এজলাসে তোলা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য নিযুক্ত বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, “শিশু রামিসা আক্তারকে বাসায় ডেকে নিয়ে বাথরুমে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। রামিসাকে বেঁধে নির্যাতনের এক পর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে আসামি তাকে মৃত ভেবে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শরীর থেকে গলা কেটে আলাদা করে। একই সঙ্গে বাথরুমের ভেতরেই তার হাত-পা বিচ্ছিন্ন করা হয়।”

আইনজীবী দুলু বলেন, “ঘটনার দিন ভুক্তভোগীর মা রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ডাকাডাকি করলে তাকে খুঁজে পাননি। পরে একটি জুতা দেখতে পেয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এসময় আশপাশের লোকজন জড়ো হন। ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও আসামিদের ফ্ল্যাটের দরজা না খোলায় সবার মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। “পরে জানালা দিয়ে একজন ফ্ল্যাটের ভেতরে রক্ত দেখতে পান। এরপর দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আসামি সোহেল রানা পালিয়ে গেছেন। তার স্ত্রী তখন উপস্থিত লোকজনকে জানান, তার স্বামী এমন ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে গেছেন। পরে পুলিশ এসে তাকে গ্রেপ্তার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।” আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে শুনানি করেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন,”তড়িঘড়ি মামলার তদন্ত শেষ করা হয়েছে। পুলিশ কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও উপস্থাপন করতে পারেনি।” আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে আপত্তি জানান এ আইনজীবী। উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারক সোহেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান। এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে চান সোহেল রানা। তবে অনুমতি মেলেনি। পরে অপর আসামি স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনানো হয়। সেখানে বলা হয়, তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং রামিসাকে হত্যায় বাধা না দিয়ে রক্ত ও আলামত নষ্টে সহযোগিতা করেছেন, যা হত্যার অপরাধের সহায়তা হিসেবে গণ্য হয়। পরে বিচারক স্বপ্না আক্তারের কাছে জানতে চান, তিনি নিজেকে দোষী মনে করেন কি না।

উত্তর দিতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন স্বপ্ন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো স্বামী সোহেল রানাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “তুমি বল আমি দোষী কিনা।” এসময় সোহেল রানা আদালতে দাবি করেন, স্বপ্না ‘নির্দোষ’। শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন রাখেন। পরে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক। এরপর কাঠগড়ায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন সোহেল ও স্বপ্না। সোহেল তার স্ত্রীকে চিন্তা করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, স্বপ্নার ‘কোনো দোষ নেই’। বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটের দিকে স্বপ্নাকে কাঠগড়া থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় হাজতখানায় নেওয়া হয়। এসময় স্বামী সোহেল রানার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন স্বপ্না। সোহেলও তাকে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

স্ত্রী চলে যাওয়ার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন,”আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কাটছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।” সোহেল বলতে থাকেন, মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে ‘দুই লাখ টাকা’ দেওয়ার কথা বলেছিল। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন।

আদালত থেকে নেওয়ার কারাগারে নেওয়অর পথে সোহেল সাংবাদিকদের উদ্দেশে জোরে জোরে বলতে থাকেন, ‘মিরপুর-১১ নম্বর লাইনে বাড়ি ডলারের। রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যার ‘মূল আসামি’ ওই ডলার। “ধর্ষণও ডলার করছে, মারছেও ডলার। ওরে ধরেন আপনারা, সব পাবেন।”

সোহেল বলেন, “আমার ওয়াইফ আমাকে সাহায্য করেনি। আমার ওয়াইফের কোনো দোষ নাই। দোষ ডলারের আছে। আমার দোষ আছে, ডলারেও দোষ আছে। আমি অত অপরাধী না। আমি শুধু বাচ্চারে দুই টুকরো করছি। ধর্ষণ করছে ডলার, মারছেও ডলার।

“আমার কোনো ডিএনএ টেস্ট নেয়নি। অটোমেটিক নিয়ে নিছে। ডলার আমাকে দুই লক্ষ টাকা দিছে। ডলার অনেক ধনী লোক, টাকাওয়ালা।”

এ মামলার এজাহারে বলা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা ‘কৌশলে’ তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যায়।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন।

এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।

মামলায় বলা হয়, পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।

রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ওই নৃশংস ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ চলছে। বিভিন্ন সংগঠন ও নানা শ্রেণি পেশার মানুষ সমাবেশ মানববন্ধনের মত কর্মসূচি পালন করছেন। তার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত