
এক সপ্তাহ আগে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের তিনি দেশে শুরু হয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব এবং শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক দল এবং আয়োজক নিয়ে শুরু হওয়া ২৩তম এই আসরে এখন পর্যন্ত সাবেক চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে মাঠে নেমেছে ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন এবং উরুগুয়ে। তাদের মধ্যে চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি ছাড়া আর কোনো দলই জয়ের দেখা পায়নি। এবার পরীক্ষা দিতে নামছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আজ বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় ক্যানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার মুখোমুখি হবে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। মাঠে নামলেই টানা ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা প্রথম ফুটবলার বনে যাবেন মেসি। তিনি জাদুকরী বা পায়ে রোমাঞ্চের রেণু ছড়ান ২০২২ বিশ্বকাপেও। গোল করেন সাতটি। লুসাইলের ফাইনালে ফ্রান্সের জালে জোড়া গোলের পর টাইব্রেকারে প্রথম শটেও পান জালের দেখা। ১৯৮৬ সাল থেকে চলা খরা ঘুচিয়ে, ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে আর্জেন্টিনা। এবার নিশ্চিতভাবেই নিজের শেষ বিশ্বকাপ রাঙাতে চাইবেন মেসি। তাই ম্যাচটি ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন সমর্থকরা।
আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি খুব সম্ভবত ২০২২ বিশ্বকাপের ছকই টেনে নিবেন এবারের আসরে। সেখানে থাকছে না কেবল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডের নির্ভরতা আনহেল দি মারিয়া। আক্রমণভাগ সাজাতে স্কালোনির হাতে বিকল্পের কমতি নেই। ধারণা করা হচ্ছে, লাউতারো মার্তিনসেকে আরও বড় ভূমিকায় খেলাতে পারেন কোচ। দুইবার ফিফা সেরা গোলকিপারের পুরস্কার জেতা এমিলিয়ানো মার্তিনেসের সামনেও আছে দৃঢ়তাপূর্ণ রক্ষণভাগ। যদিও এই ছক নিয়ে কাতার বিশ্বকাপের শুরুতে হোঁচট খেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ২-১ গোলে বিস্ময়করভাবে হেরে বসেছিল সৌদি আরবের কাছে। সেই ম্যাচটিই অনুপ্রেরণা আলজেরিয়ার। আর্জেন্টিনাকে, মেসিকে হতবাক করে দিতে চায় তারাও। ম্যাচের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি জানান যে তিনি প্রথম ম্যাচ নিয়ে অতিরিক্ত চাপ অনুভব করছেন না।
তার মতে, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই প্রতিযোগিতার শেষ কথা নয়। স্কালোনি বলেন, এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ। আমাদের আগের বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রথম ম্যাচ কখনও পুরো টুর্নামেন্টের ভাগ্য লিখে দেয় না। অবশ্যই এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে সবকিছু এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আর্জেন্টিনার জন্য বড় স্বস্তির খবর হলো দলের তিন নির্ভরযোগ্য তারকা লিওনেল মেসি, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এবং হুলিয়ান আলভারেজ পুরোপুরি ফিট রয়েছেন। পেশির চোট কাটিয়ে মেসি যেমন ফিরছেন, তেমনি গোড়ালির সমস্যা কাটিয়ে খেলার জন্য প্রস্তুত আলভারেজ। গোলবারের নিচে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে থাকছেন আঙুলের চোট কাটিয়ে ওঠা এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী একাদশ মাঠে নামাতে যাচ্ছে আলবিসেলেস্তেরা। রক্ষণভাগে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসানদ্রো মার্তিনেজের পাশাপাশি মাঝমাঠে রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। অন্যদিকে আলজেরিয়াও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। রিয়াদ মাহরেজ ও মোহামেদ আমৌরার মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত তাদের আক্রমণভাগ যেকোনো দলের জন্য হুমকি হতে পারে।
যদিও এই ছক নিয়ে কাতার বিশ্বকাপের শুরুতে হোঁচট খেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ২-১ গোলে বিস্ময়করভাবে হেরে বসেছিল সৌদি আরবের কাছে। সেই ম্যাচটিই অনুপ্রেরণা আলজেরিয়ার। আর্জেন্টিনাকে, মেসিকে হতবাক করে দিতে চায় তারাও। কাগজে কলমে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার দলগুলোর সাফল্য আলজেরিয়াকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে। ২০২৬ বিশ্বকাপের পঞ্চম দিনের পূর্ববর্তী চারটি ম্যাচ ড্র হওয়ায় দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে লড়বে। এখন দেখার বিষয় মেসিরা জয় দিয়ে শুভসূচনা করেন নাকি আলজেরিয়া কোনো বড় অঘটন ঘটায়।
মেসির দিকে যেমন আর্জেন্টিনা, তেমনি মোহামেদ আমৌরার দিকে আলজেরিয়া তাকিয়ে থাকবে গোলের দাবি নিয়ে। বাছাইয়ে আফ্রিকার দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গোল ছিল এই আমৌরার, ১০টি। মিশরের ফরোয়ার্ড মোহামেদ সালাহর চেয়ে একটি বেশি গোল করেন তিনি। দলটির আক্রমণভাগে এছাড়াও আছেন, বেয়ার লেভারকুসেনে খেলা সম্ভাবনাময় তরুণ ফরোয়ার্ড ইব্রাহিম মাজা। মেসির উদ্দেশে এই ২০ বছর বয়সী মাজা তো ছেড়েছেন হুঙ্কারও। ‘বিশ্বকাপে ভালো সময় কাটাতে হবে আমাদের। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। ওরা আমাদের অনেকভাবে প্রলুব্ধ, প্ররোচিত করতে চাইবে, কিন্তু আমাদের শান্ত থাকতে হবে, সর্বোচ্চটুকু দিতে হবে, বুদ্ধিদ্বীপ্ত ফুটবল খেলতে হবে। দেখা যাক, কী হয়। আমরা মেসিকে হারাব, ইনশাআল্লাহ।’
আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার মধ্যে খুব বেশি দেখা হয়নি। এটি হবে এই দুই দলের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো দেখা। ইতিপূর্বে আগে ২০০৭ সালে তারা মুখোমুখি হয়েছিল। ২০০৭ সালের ৫ জুন, আলফিও বাসিলের অধীনে আর্জেন্টিনা দল বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুতে আলজেরিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল। সেটি ছিল এমন এক স্কোয়াডের চূড়ান্ত পরীক্ষামূলক ম্যাচ, যেখানে রবার্তো আয়ালা, সেবাস্টিয়ান ভেরন ও রোমান রিকুয়েলমের মতো অভিজ্ঞ তারকাদের পাশাপাশি লিওনেল মেসি ও ফার্নান্দো গ্যাগোর মতো প্রতিভাবান তারকারা ছিলেন।
সেদিন বিকেলে আলবিসেলেস্তেরা মাঠে নেমেছিল গোলপোস্টে রবার্তো আবোনদানজিয়েরি, রক্ষণভাগে গ্যাব্রিয়েল মিলিতো, রবার্তো আয়ালা, নিকোলাস বুরদিসো এবং হাভিয়ের পিনোলাকে নিয়ে। মাঝমাঠে ছিলেন হাভিয়ের জানেত্তি, ফার্নান্দো গ্যাগো ও এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো। আর আক্রমণভাগে ছিলেন লিওনেল মেসি, কার্লোস তেভেজ ও ডিয়েগো মিলিতো ম্যাচের মাত্র দেড় মিনিটের মাথায় তেভেজ পেনাল্টি থেকে গোল করে আর্জেন্টিনার খাতা খোলেন। তবে আলজেরিয়াও দ্রুত জবাব দেয়। নয় মিনিট পর সমতা ফেরান আনথার ইয়াহিয়াহ। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই মাজিদ বুঘেরা আফ্রিকান দলটিকে এগিয়ে নেন। তিন মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল-প্রথমটি মেসির এবং দ্বিতীয়টি ক্যাম্বিয়াসোর। তাতে কোকোর (কোচ বাসিল) দল আবারও লিড পায়। এরপর ৭৩ মিনিটে মেসির আরেকটি গোলে দলের জয় নিশ্চিত হয়।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পনেরো মিনিট বাকি থাকতে বেলহাদজ একটি গোল শোধ করে আলজেরিয়ার হারের ব্যবধান কিছুটা কমান। ২০ বছর পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জে’-এর উদ্বোধনী ম্যাচে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই দল। লিওনেল স্কালোনির দল শিরোপা ধরে রাখার মিশনটি দারুণভাবে শুরু করতে চাইবে, অন্যদিকে ‘ডেজার্ট ফক্সেস’ তাদের গতিময় আক্রমণ ও ফরোয়ার্ডদের দুর্দান্ত টেকনিক্যাল দক্ষতা দিয়ে চমক দেখানোর চেষ্টা করবে। আর ১৯ বছর আগের সেই ৪-৩ ব্যবধানে লড়াকু হার নিশ্চয় অনুপ্রেরণা দেবে আলজেরিয়াকে।