
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর মামলার রায় জানা যাবে ৩০ জুন। গতকাল সোমবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দিন ঠিক করে দেয়। এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম ও ফারুক আহাম্মদ। প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মূলত চার্জ হচ্ছে যে, তিনি সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটিতে তার যে দায়িত্ব ছিল, তিনি শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করা, বিভিন্ন পলিসি সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং তাদের এই বিভিন্ন রকমের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কুষ্টিয়াসহ সারা বাংলাদেশে অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, সেটার দায় তার উপরে বর্তায়।’ তিনি বলেন, ‘১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য আমরা আদালতে উপস্থাপন করেছি...হাসানুল হক ইনু সাহেবের যে সংশ্লিষ্টতা, সাক্ষীরা তা প্রমাণ করেছে কোর্টে। উভয় পক্ষের আর্গুমেন্ট হয়েছে। এটি জাজমেন্টের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। আজকে সেটার তারিখ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।’
রায় নিয়ে ?প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা হলো- আইন অনুযায়ী তার যে অপরাধ, সে অনুযায়ী তার যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়- সেটাই প্রত্যাশা করছি।’
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে এ মামলা করে প্রসিকিউশন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গত বছরের ২ নভেম্বর এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় গত ১৪ মে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়।
অভিযোগ দাখিলের দিন গত ২৫ সেপ্টেম্বর কৌঁসুলি মিজানুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এবং জাসদের সুপ্রিম। তিনি নিয়মিত শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন এবং তিনি ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে স্থানীয় এসপি এবং তার দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিতেন।
‘শেখ হাসিনাকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন সশস্ত্র ক্যাডারদেরকে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংগঠনে নির্দেশনা দিতেন।’
ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও হাসানুল হক ইনুর ফোনালাপ দাখিল করার কথা উল্লেখ করে কৌঁসুলি মিজানুল বলেছিলেন, গত বুধবার ওই ফোনালাপ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দাখিল করা হয়েছিল। সেই ফোনালাপ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দাখিল করা হয়েছে বিশেষষজ্ঞ মতামত এবং ওই ফোনালাপের ট্রান্সক্রিপ্টসহ।
মিজানুল বলেছিলেন, ইনু ভারতের ‘মিরর নাউ’ নামক একটি অনলাইন পোর্টালে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, নিউজ ২৪ নামের টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, আরও একটা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ‘এছাড়া দেখামাত্র গুলির নির্দেশের যে অর্ডার দিয়েছেন, সেসব আনুষ্ঠানিক অভিযোগে রাখা হয়েছে।’
অভিযোগের মধ্যে আরও রয়েছে- ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে নির্দেশনা; ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আন্দোলনকারী নিরস্ত্র নিরীহ জনতাকে চিহ্নিত করা; ছত্রীসেনা নামিয়ে বম্বিং করা, গুলি করা; এসব নির্দেশনা স্থানীয় কুষ্টিয়ার এসপিকে অবহিত করা।
মিজানুল বলেছিলেন, ‘কথোপকথনে আরও বলেন, আন্দোলনকারীদের ধরা হবে, তারপর স্ক্রলে নিউজে আসবে যে তাদের জেলখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ছেড়ে ছেড়ে দেওয়া হবে আরকি- মানে তাদের মেরে ফেলা হবে।’
‘এছাড়া ফোনালাপ থেকে যেটা উঠে এসেছে, জঙ্গি নাটকের কার্ডটা খেলতে হবে। আন্দোলনকারীদেরক জঙ্গি বলা হবে, তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হবে। এটা প্রচার করা হবে যে জঙ্গি আক্রমণে তারা নিহত হরয়েছেন। ৫ অগাস্ট কারফিউ উঠিয়ে দিয়ে প্রতিটা ওয়ার্ড থেকে ২ হাজার লোক ঢাকায় জমায়েত করতে হবে। শিবিরের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে। বিএনপিকে ধ্বংস করে দিতে হবে।’
কৌঁসুলি মিজানুল বলেছিলেন, ‘কথোপকথনে দুজন নেতার কথা বলতে শোনা গেছে। এরা হলেন জোনয়েদ সাকি ও সাইফুল হক। তাদেরকে দলে কীভাবে নেওয়া যায় সে বিষয়ে কথা বলতে শোনা গেছে।’
‘শেখ হাসিনার নির্দেশে যে ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দেওয়া হয়, তার পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন হাসানুল হক ইনু।’
ফোনালাপের বরাতে মিজানুল বলেছিলেন, ‘আপনি আপনার লোকাল লিডার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলে দেন কীভাবে আন্দোলন দমন করতে হবে। সাক্ষ্য প্রমাণ তদন্তে আসছে যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও পুলিশ স্থানীয় আন্দোলনকারীদের উপর বিভিন্ন স্থানে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করেছে, যার নির্দেশ দেওয়ার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।’ ‘আটটা অভিযোগের মধ্যে দুইটি সুনির্দিষ্ট আছে, সেগুলো হলে- া একজনকে মাথায় গুলি করে হত্যা এবং ছয়জনকে গুলি করে হত্যা।’