
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ঐ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তারা এই হামলাকে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে চালানো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি ‘চূড়ান্ত জবাব’ বলে বর্ণনা করেছে। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, তাদের নৌবাহিনী ও মহাকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী যৌথভাবে রোাববার (স্থানীয় সময়) রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে এই অভিযান পরিচালনা করে। এতে আটটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে। এর মধ্যে কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের সালমান বন্দরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরও রয়েছে। বাহিনীটি জানায়, এই অভিযানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে ঐ স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শত্রুপক্ষ ইরানের উপকূলীয় পাঁচটি ঘাঁটিতে হামলা চালানোর পরই এই অভিযান পরিচালিত হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে- আগ্রাসী শত্রু, যার স্বভাবই হলো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং চুক্তি লঙ্ঘন করা আজ ভোরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের উপকূলীয় পাঁচটি স্থানে হামলা চালায়। তারা দাবি করে, এটি হরমুজ প্রণালীতে অনধিকার প্রবেশকারী একটি জাহাজের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনায় আইআরজিসির নৌবাহিনীর পদক্ষেপের জবাব দিয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, সম্প্রতি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচলের দায়িত্ব ইরানের ওপর ন্যস্ত। তারা আরও জানিয়েছে, ‘এখন থেকে যেসব জাহাজ নিয়ম লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে আগের চেয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিবৃতিতে আরও সতর্ক করে বলা হয়, ভবিষ্যতে শত্রুপক্ষ যেকোনো অজুহাতে আগ্রাসন চালালে—এমনকি গত রাত ও আজ রাতের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলেও- তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর ও বিধ্বংসী। শত্রুর বোঝা উচিত যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা ইসলামাবাদ সমঝোতার প্রথম ধারা ভঙ্গ করার শামিল এবং এর ফলে সংশ্লিষ্ট সব প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে স্থগিত হয়ে যাবে। এই বিবৃতিটি এমন এক সময় প্রকাশ করা হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড ঘোষণা করেছে, তারা ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর সত্যতা স্বীকার করেছেন।
হামলা-পাল্টা হামলার পর ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি ট্রাম্পের : ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারা টানা তৃতীয় দিনের মতো প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে। এদিকে, উভয় পক্ষ একে অপরকে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে যে শান্তি আলোচনা চলছে, তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলাগুলো পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি প্রক্রিয়ার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই শান্তি প্রক্রিয়ার লক্ষ্য ছিল ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধের অবসান ঘটানো। ওই যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড রোববার জানিয়েছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, নিয়ম ভঙ্গকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে আগের চেয়ে আরও কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ ও অনুমোদিত যাতায়াতের একমাত্র পথটি বর্তমানে ইরানের উপকূল বরাবর বিস্তৃত একটি করিডোরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানায়, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে প্রতিশোধমূলক হামলাও চালিয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় কুয়েতের আলী আল-সালেম ঘাঁটি ও বাহরাইনের পোর্ট সালমানের মার্কিন নৌঘাঁটিতে আটটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘শত্রুর যেকোনো আগ্রাসন, যে কোনো অজুহাতে, এমনকি তুচ্ছ লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত করলে, তার কঠোর ও বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে।’ বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার দুই বার সেখানে বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জুনের মাঝামাঝি সময়ে একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো। ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবং তাদের মিত্ররা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান না চালানো এবং শক্তি প্রয়োগ বা হুমকি না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে ‘বাধ্য’ হয়, তবে ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের ওপর হামলার পাল্টা জবাবে শনিবার মার্কিন বাহিনী ‘একাধিক’ ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর পরই ট্রাম্প এই হুমকি দেন।
ট্রাম্প তার সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশালে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। কারণ তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘এমন একটা সময় আসতে পারে, যখন আমাদের আর সংযম দেখানোর সুযোগ থাকবে না এবং আমরা যে অভিযান অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করেছি, তা সামরিকভাবে শেষ করতে বাধ্য হব। যদি সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
‘হরমুজ প্রণালী’ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ইরানের কৌশলগত হাতিয়ার : ইরানের নীতি নির্ধারণীপরিষদের সদস্য সদস্য হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এই জলপথটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তির মাধ্যম। তিনি বলেছেন: ‘আমরা আমাদের অন্যতম অনস্বীকার্য সম্পদ, অর্থাৎ হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর করি এবং কোনো অবস্থাতেই এই প্রণালীকে হাত ছাড়া করা উচিত হবে না।’
ইরানিয়ান ব্রডকাস্টিং এজেন্সিকে উদ্ধৃত করে পার্সটুডে জানিয়েছে, ইরানের নীতি নির্ধারণীপরিষদের সদস্য মোহাম্মদ হোসেন সাফার হারান্দি, ইরানের টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাতে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রসঙ্গে বলেছেন: পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক বিষয় এবং জনমত- এই সকল ক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্মকর্তারা এই জলপথের গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত এবং এর ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বের কারণ এ পথের প্রতি বিরোধী পক্ষগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন: হরমুজ প্রণালীর সংবেদনশীল অবস্থান অনুধাবন করার পর, শত্রু সামরিক হুমকি, রাজনৈতিক চাপ এবং উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই কৌশলগত সুবিধাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ইরানি কর্মকর্তাদের সঠিক সচেতনতা এবং সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এই লক্ষ্যগুলোর বাস্তবায়নকে প্রতিহত করেছে। হরমুজ প্রণালীর আইনি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করে সাফার হেরান্দি জোর দিয়ে বলেন: শত্রুরা চক্রান্তের মাধ্যমে ইরানের কাছ থেকে এই সুযোগ এবং স্বাভাবিক সম্ভাবনা কেড়ে নিতে চায়। তিনি আরও বলেন: যারা আন্তর্জাতিক আইন জানেন এবং পড়ান, তারা ভালোভাবেই অবগত আছেন যে, এমন ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত এবং এমন সীমাবদ্ধতাযুক্ত একটি জলপথের অধিকারী কোনো দেশের একটি স্বাভাবিক অধিকার রয়েছে। তার মতে, হরমুজ প্রণালীর বেশিরভাগ অংশ ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমায় অবস্থিত এবং এটি এই কৌশলগত পথের উপর ইরানের স্বাভাবিক অধিকারকে নিশ্চিত করে।