
ঢাকায় টানা তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। দিনের বেশিরভাগ সময়ই অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে, চুলায় আগুন জ্বলে মিটমিট করে। ফলে সময়মতো রান্না শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এক ঘণ্টার রান্না শেষ করতে লেগে যাচ্ছে দু-তিন ঘণ্টা। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক হিটার, ইন্ডাকশন ওভেন কিংবা রাইস কুকারে রান্না করছেন। আবার অনেকে রান্না করতে না পেরে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এতে সীমিত আয়ের অনেক মানুষের প্রতিদিনের খরচ বেড়ে গেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আদাবর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, হাজারীবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, বাসাবো, মালিবাগ, উত্তরা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভোর কিংবা গভীর রাত ছাড়া অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ থাকে না বললেই চলে। কোথাও কোথাও চুলা জ্বললেও সেই আগুনে একটি তরকারি রান্না করতেই দু-তিন ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। মোহাম্মদপুরের গৃহিণী রাজিয়া আক্তার বলেন, সকালে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর আগে নাশতা তৈরি করতে পারি না। চুলায় আগুন এত কম যে ডিম সেদ্ধ করতেও অনেক সময় লাগে। বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
মিরপুরের বাসিন্দা রুকাইয়া জানান, কয়েকদিন ধরে দুপুর ও রাতে রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রায়ই হোটেল থেকে খাবার কিনে আনতে হচ্ছে। এতে মাসিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও গ্যাসের স্বল্পচাপ দেখা দিয়েছে। অনেক স্টেশন সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। এতে তাদের আয়ও কমে গেছে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি—সব খাতেই এর প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের স্বল্পচাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকরা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে একই সমস্যায় ভুগলেও স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মজীবী পরিবার ও শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রান্নার জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় একদিকে যেমন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। গত মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস জানিয়েছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে আরএলএনজি (পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি) সরবরাহ প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাস গ্যাস অধিভুক্ত এলাকার সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করবে। এদিকে, চলমান গ্যাস সংকট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে মন্ত্রী জানান, একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে এলএনজি খালাস ব্যাহত হয়েছে। এতে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামতের কাজ চলছে। তবে মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি কার্গো খালাস সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রান্নার গ্যাসের চাপ কমে গেছে। পাশাপাশি গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায়ও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
গ্যাস সংকটসহ শিল্প খাতের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর : দেশের শিল্প খাতে চলমান গ্যাস সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিল্প খাতে গ্যাস সংকটসহ বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভাকক্ষে টেক্সটাইল শিল্পের সমস্যা সমাধানে গঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রথম সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সভায় যোগ দেন এবং সবার বক্তব্য শোনেন। প্রধানমন্ত্রী সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেন। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরবর্তী সভা আয়োজনের নির্দেশনা দেন।
সভায় কমিটির সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব উপস্থিত ছিলেন। এর আগে, গত ২২ জুলাই বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতির নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে টেক্সটাইল শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে। ওই বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী সমস্যাগুলো সমাধানের প্রস্তাব প্রণয়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গঠিত কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।
রাজধানীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে সিএনজি, আয় কমেছে চালকদের : দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশনে গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। অনেক স্টেশনে চাপ কম থাকায় নির্ধারিত সময়েও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে যেমন যাত্রী পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে, তেমনি চালকদের দৈনিক আয়েও ভাটা পড়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর তেজগাঁও ও মগবাজার এলাকার কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে শতাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত যানবাহন। অনেক চালক দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারছেন না। মোহাম্মদপুরের সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দুপুর থেকে লাইনে আছি। দুই ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে, এখনও গ্যাস পাইনি।’