ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ফ্যামিলি কার্ডে মধ্যবিত্তে স্বস্তির সুবাতাস

ফ্যামিলি কার্ডে মধ্যবিত্তে স্বস্তির সুবাতাস

দেশের প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে দেশের এক কোটিরও বেশি পরিবারকে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগটি এখন আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। এতদিন যা কেবল টিসিবি (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ)’র নির্ধারিত ট্রাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর কষ্ট ছিল, তা এখন ফ্যামিলি কার্ডের আধুনিক রূপান্তরের মাধ্যমে হয়ে উঠেছে সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাশীল। প্রশাসনের আধুনিক পরিকল্পনা, স্মার্ট ডেটাবেজ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত যাচাইকরণ পদ্ধতির সমন্বয়ে তৈরি এই ‘নতুন দিশা’ একদিকে যেমন ভুয়া উপকারভোগীদের বাদ দিয়ে প্রকৃত প্রাপকদের হাতে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করছে।

১. ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়ায় পাল্টে যাওয়া চিত্রঅতীতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অভিযোগ নিত্যদিনের বিষয় ছিল। কার্ড জালিয়াতি, একই ব্যক্তির বারবার সুবিধা গ্রহণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত হতদরিদ্র মানুষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো। তবে বর্তমান ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এসব সমস্যা অনেকটাই কেটে গেছে।

স্মার্ট কার্ড ও কিউআর কোড : হস্তলিখিত বা সাধারণ কাগজের কার্ডের বদলে এখন প্রদান করা হচ্ছে ডিজিটাল কিউআর কোড যুক্ত ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’।

বায়োমেট্রিক ও এনআইডি সংযোগ : জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ডেটাবেজের সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। ফলে একজন ব্যক্তির একাধিক কার্ড নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসএমএস নোটিফিকেশন: পণ্য বিতরণের তারিখ, সময় ও নিকটস্থ ডিলার পয়েন্টের তথ্য সরাসরি উপকারভোগীর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে এসএমএসের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

২. কী কী থাকছে এই নতুন সেবায়? ফ্যামিলি কার্ডে শুধু যে বিতরণের পদ্ধতি বদলেছে তা নয়, পণ্যের বৈচিত্র্য ও পরিমাণেও আনা হয়েছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। নিম্নআয়ের মানুষের পুষ্টি চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া পণ্যের তালিকায় নতুন কয়েকটি প্রয়োজনীয় সামগ্রী যুক্ত করা হয়েছে।

এক নজরে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় বর্তমান সুবিধা ও মূল্য তালিকা :

সয়াবিন তেল : প্রতি লিটার ১০০ টাকা (সর্বোচ্চ ২ লিটার)

মসুর ডাল : প্রতি কেজি ৬০ টাকা (সর্বোচ্চ ২ কেজি)

চাল : প্রতি কেজি ৩০ টাকা (সর্বোচ্চ ৫ কেজি)

চিনি : প্রতি কেজি ৭০ টাকা (সর্বোচ্চ ১ কেজি- সরবরাহ সাপেক্ষে)

পেঁয়াজ/আলু : বাজারদর ও উপযোগিতা অনুযায়ী সময়ে সময়ে যুক্তপণ্যের নামসাধারণ বাজারদর (আনুমানিক) ফ্যামিলি কার্ডের মূল্য পরিবার প্রতি সাশ্রয় সয়াবিন তেল (২ লিটার) ৩৫০-৩৬০ টাকা ২০০ টাকা ১৫০-১৬০ টাকামসুর ডাল (২ কেজি) ২৪০-২৫০ টাকা ১২০ টাকা ১২০-১৩০ টাকা চাল (৫ কেজি) ৩৫০-৩৭০ টাকা ১৫০ টাকা ২০০-২২০ টাকা মোট সাশ্রয় ৯৬০-৯৮০ টাকা ৪৭০ টাকা প্রায় ৫০০ টাকা!

৩. মাঠপর্যায়ের চিত্র : স্বস্তির নিঃশ্বাস প্রান্তিক মানুষের রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা ও পেশায় পোশাক শ্রমিক রহিমা খাতুন (৩৮)। চার সদস্যের পরিবার সামলাতে গিয়ে মাস শেষে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। সম্প্রতি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড হাতে পাওয়ার পর তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাইয়ের (ট্রাক) পেছনে লাইনে দাঁড়ায়া থাইকাও অনেক সময় চাল-ডাল পাইতাম না। কার্ড হওয়ার পর এখন সুবিধা হইছে। মোবাইল ফোনে মেসেজ আসে, নির্দিষ্ট দিনে গিয়া লাইনে না দাঁড়ায়াই কার্ড স্ক্যান কইরা জিনিসপত্র লইয়া আসি। বাজারে যেসব জিনিস কিনতে হাজার টাকার ওপরে লাগত, তা এখন ৫০০ টাকার কমে পাইয়া যাইতাছি। এইটা আমাগো মতো গরিব মানুষের জন্য অনেক বড় আশীর্বাদ।’

রহিমা খাতুনের মতোই স্বস্তির কথা জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাজারও নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ডিলারদের অনিয়ম বন্ধ হওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে এই সরকারি কর্মসূচির ওপর।

৪. স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও স্বয়ংক্রিয় তদারকিএই ‘নতুন দিশা’র অন্যতম বড় সাফল্য হলো স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয়ভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হয়েছে।

পণ্য ট্র্যাকিং : কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে ডিলার পয়েন্ট পর্যন্ত পণ্যের পরিবহন জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে মাঝপথে পণ্য কালোবাজারে বিক্রি না হতে পারে।

ডিজিটাল মাস্টাররোল : পণ্য বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে ডিলারের হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইসে তা এন্ট্রি হয়ে যায়। এতে প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে কতটুকু পণ্য বিক্রি হলো তা তাৎক্ষণিকভাবে ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়।

অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা : কোনো কার্ডধারী যদি ডিলারের কাছ থেকে কঙ্ক্ষিত সেবা না পান বা ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ থাকে, তবে একটি নির্দিষ্ট হটলাইন নম্বরে কল করে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানাতে পারছেন।

৫. অর্থনীতিতে ফ্যামিলি কার্ডের বহুমাত্রিক প্রভাবঅর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই চড়া মৌসুমে ফ্যামিলি কার্ডের সঠিক ব্যবহার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে। এটি শুধু খাদ্য নিরাপত্তাই নিশ্চিত করছে না, বরং নিম্নবিত্তদের বাড়তি আয় সঞ্চয়ে সাহায্য করছে যা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো : অতিপ্রয়োজনীয় ৫টি পণ্যে প্রায় ৫০% পর্যন্ত ভর্তুকি পাওয়ার ফলে একটি দরিদ্র পরিবারের মাসে অন্তত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণ : সরকারি পর্যায়ে এক কোটি পরিবারকে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ করায় খোলা বাজারে এসব পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারছে না, যা সার্বিক বাজার দর স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে।

সামাজিক সুরক্ষা নেট শক্তিশালী করা : সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষা খাতের বাজেট সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত হয়েছে।

৬. আগামী দিনের লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ ফ্যামিলি কার্ড এখন আর শুধু একটি ত্রাণ বা সহায়তা কার্যক্রম নয়, এটি একটি সুসংগঠিত নাগরিক সুবিধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে এই উদ্যোগকে আরও নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকর করতে সরকার কয়েকটি নতুন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে।

কার্ডধারীর সংখ্যা বৃদ্ধি : বর্তমান এক কোটি পরিবার থেকে বাড়িয়ে আগামীতে এর পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে শহর ও গ্রামের সমন্বিত হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী পূর্ণাঙ্গ কাভারেজের আওতায় আসে।

পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি : পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু চাল-ডাল ও তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গুঁড়ো দুধ, ডিম ও স্থানীয় মৌসুমী খাদ্যপণ্য যুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে।

স্থায়ী আউটলেট স্থাপন : অস্থায়ী ডিলার পয়েন্টের বদলে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থায়ী ‘টিসিবি সার্ভিস সেন্টার’ বা ‘ন্যায্য মূল্যের দোকান’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যেন কার্ডধারীরা মাসের যেকোনো সুবিধাজনক সময়ে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। নতুন ভোরের প্রত্যাশা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বই হলো তার সবচেয়ে দুস্থ ও অবহেলিত নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানো।

‘ফ্যামিলি কার্ডে নতুন দিশা’ শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, এটি সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের এক অনন্য রূপরেখা। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে গঠিত এই নতুন ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা ও আধুনিক ভাবনার সংযোগ ঘটলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে কতটা গতিশীল ও কল্যাণমুখী করে তোলা সম্ভব। মূল্যস্ফীতির উত্তাল তরঙ্গে দিশাহারা নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে এই নতুন ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবিক অর্থেই এক আলোর দিশারী।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত