
দুপুরের আকাশজুড়ে ঝুম বৃষ্টি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) জাদুঘরের ভেতর বিদ্যুৎ না থাকায় চারদিকে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে কাঁচের ভেতরে সংরক্ষিত একটি রক্তমাখা শার্ট-প্যান্টের দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলেন এক ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর কাঁচের ওপর হাত রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। তিনি শহিদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে গত বুধবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আমন্ত্রণে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন রতন চন্দ্র। পরদিন বৃহস্পতিবার বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি যান বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে। সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে তার ছেলে হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার রক্তমাখা শার্ট ও প্যান্ট- যে পোশাক পরে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন হৃদয়।
কাঁচের ভেতরে রাখা পোশাকটির দিকে দীর্ঘক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকেন রতন চন্দ্র। এরপর কাঁপা হাতে কাঁচ স্পর্শ করেন। যেন কাঁচের ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে তার একমাত্র ছেলে। মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। উপস্থিত অনেকের চোখও ভিজে ওঠে সেই দৃশ্যে। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে রতন চন্দ্র বলেন, ‘মানুষের বাসায় কাজ করে সেই টাকা দিয়ে এই শার্টটাই ওর মা ওরে কিনে দিছিল। ওই শার্ট পইরাই ও শহীদ হয়ে গেছে।’
কথা বলতে বলতেই তিনি বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। বলেন, ‘আমি কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতাম। ওর মা মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করত। আমরা সাধারণ পরিবার। ভাড়া বাসায় থাকি। ওর একটাই স্বপ্ন ছিল, পড়ালেখা করে কিছু করবে।’
রতন চন্দ্র জানান, হৃদয় ছিল তার একমাত্র ছেলে। ছেলেকে হারানোর পর মেয়ে, জামাতা ও নাতনিকে নিজের কাছে এনে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু শূন্যতা কাটেনি।
ছেলে হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। আমার বাড়িও অনেক দূরে। এখানকার কাউকে চিনি না। তাই আমি নিজে মামলা করিনি। একজন বাদী হয়ে ২৬৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছে। কিন্তু তারা সেই মামলা নিয়ে রাজনীতি করছে, ব্যবসা করছে। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। যারা এই হত্যা মামলা নিয়ে ব্যবসা করছে, তাদেরও বিচার চাই।’
হৃদয় চন্দ্র তরুয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হৃদয় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। পরে ২৩ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রক্তমাখা সেই শার্ট-প্যান্ট এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক নিদর্শন। কিন্তু একজন বাবার কাছে সেটিই সন্তানের শেষ স্মৃতি, শেষ স্পর্শের প্রতীক। তাই জাদুঘরের নীরবতার মধ্যে রক্তমাখা পোশাকের সামনে দাঁড়িয়ে তার কান্না যেন শুধু একজন বাবার নয়, হারিয়ে যাওয়া এক প্রজন্মের স্বপ্নের জন্যও।
ছুটির দিনে জুলাই জাদুঘরে ঘুরতে এসে ভোগান্তিতে দর্শনার্থীরা : জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের পরে প্রথম ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের আগ্রহ থাকাতে সকাল থেকেই ছিল তাদের সরব উপস্থিতি। কিন্তু ছুটির দিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে জাদুঘর দেখতে এসে ভোগান্তিতে পড়েছেন দর্শনার্থীরা। জাদুঘর খোলার সময়সূচি নিয়ে বিভ্রান্তি, অনলাইনে টিকিট কাটা, রিফান্ডের সুযোগ না থাকা এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। একই সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে এক পর্যায়ে স্লোগানও দেন দর্শনার্থীরা। গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই জাদুঘরের সামনে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাদের উপস্থিতি। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। গতকালের (৬ আগস্ট) মতো সকাল ১১টায় জাদুঘর খোলার প্রত্যাশায় এলেও পরে জানতে পারেন, প্রবেশ শুরু হবে বিকাল ৩টা থেকে। এরপর শুরু হয় তাদের অপেক্ষার পালা। জাদুঘরের মূল ফটকের সামনে ও আশেপাসে বসে থাকতে দেখা যায় তাদের। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তপ্ত রোদে ক্ষোভ বাড়তে থাকে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের। কিছুক্ষন পর পর তাদের চিৎকার করতে দেখা যায়। আবার অনলাইনে ভুল তারিখের টিকিট কিনে ক্ষোভ জানিয়েছেন কেউ কেউ। তারা দাবি জানান টিকিট রিফান্ড করার ব্যবস্থা রাখার।
গত বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লা থেকে জুলাই জাদুঘর দেখার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসেছেন মিশুক চালক মো. ইসমাল হোসেন। ঢাকায় এসে রাতে মিরপুরের শাহ-আলী মাজারে ছিলেন।
তার সঙ্গে কথা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি কাল রাতে এসেছি শেখ হাসিনার বাড়ি (সাবেক গণভবন) দেখার জন্য। কি ভাঙ্গছে আর কি করছে এখন সেটা দেখার জন্য এসেছিলাম। আমি সকাল সাড়ে নয়টায় এখানে (জাদুঘরের সামনে) এসেছি। পরে দেখি বন্ধ। অন্যান্য লোকজন বললো ১১টার দিকে খুলবে কিন্তু পরে দেখি খুলে না। তারপর জানলাম যে তিনটার সময় খুলবে। এখন আর কি করার। সকাল থেকে এই এলাকা হেঁটে হেঁটে ঘুরলাম। এটা (জাদুঘর) খুললে পরে ঘুরে আবার কুমিল্লা চলে যাবো।’
সাভার থেকে পরিবার নিয়ে জাদুঘরে ঘুরতে এসেছেন মো: আল-আমিন। কিন্তু আসার পর পরেন ভোগান্তিতে। তিনি বলেন, ‘আমি পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি। জাদুঘর সবার জন্য উন্মুক্ত করার পরে, আজ যেহেতু ছুটির দিন তাই আজ সবাইকে নিয়ে এলাম। জুলাইয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিলো সেগুলো বাচ্চাদের দেখানোর জন্যই এখানে আসা।’
এসময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমরা এসেছি সাড়ে ১২টার দিকে। কারণ জানতাম যে সকাল ১১টা থেকে খোলা হবে এটি। কিন্তু এসে দেখি বিকাল তিনটা থেকে খুলবে। এটা যদি তারা আমাদের আগে জানিয়ে দিতো তাহলে আমরা সেই সময়েই আসতাম। শুধু শুধু রোদের মধ্যে কষ্ট করার দরকার হতো না।
নারায়নগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে এসেছেন তারেক হাসান সোহেল। তিনি এসেছেন দুপুর ১টার দিকে। তিনিও জাদুঘর খোলার সময় নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন। একই সঙ্গে অনলাইনে টিকিট কাটা নিয়েও ঝামেলায় পড়েন তিনি।
তারেক বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে নিয়ে নারায়নগঞ্জ থেকে এসেছি দুপুর ১টার দিকে। আমি জানতাম না যে ৩টা থেকে খুলবে, এটা জানলে ধীরে-সুস্থে আসতাম।’
এ সময় অনলাইনে টিকিট কেটে ঝামেলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসে অনেক লোক দেখে ভাবলাম অনলাইনে টিকিট কেটে ফেলি। এটা করে এক ঝামেলায় পড়েছি। টিকিট কাটার পর দেখি আমাকে ৯ আগস্টের টিকিট দিয়েছে। এখন আমার তো আবার ৯ তারিখে আসার সুযোগ নেই। এখন খুঁজছি যে এই টাকা কি রিফান্ড করা যায় কিনা।’ তিনি বলেন, ‘গতকাল রাতেই টিকিট কেটেছিলাম। ২টা থেকে ৪টার স্লটের টিকিট নিয়েছিলাম। এখানে এসে দেখি ৩টা থেকে ঢোকানো হবে। অনলাইনে যদি আগে থেকে সময় পরিবর্তনের তথ্য দেওয়া থাকত, তাহলে এই ভোগান্তি হতো না।’
এ সময় জাদুঘরে কি দেখতে এসেছেন জানতে চাইলে আরমান বলেন, ‘এখানে আসার কারণ হলো, আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে এটি হয়তো বেশিদিন থাকবে না। তাই ভাবলাম পরিবারকে নিয়ে এসে দেখিয়ে যাই, যাতে পরে বলতে পারি- এক সময় এটা দেখেছিলাম, এখন আর নেই। আপা (শেখ হাসিনা) ফেরত আসবে। টুডে অর টুমরো আসবেই। আপাকেই দরকার; এখন যা অবস্থা...। আমার মূল লক্ষ্য ছিল আমার মেয়েকে নিয়ে আসা, তাকে দেখানো। পাশাপাশি আমার স্ত্রীকেও নিয়ে এসে দেখাতে চেয়েছি। এই আর কী।’
সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি অনলাইনে তিনটি টিকিট কেটেছেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, সেগুলো আজকের নয়। তার ভাষ্য, টিকিট কাটার সময় তারিখ পরিবর্তনের অপশন থাকলেও সেটি এতটা দৃশ্যমান ছিল না যে তিনি খেয়াল করতে পেরেছেন। ফলে তিনটি টিকিট কেনার পর ভুলটি বুঝতে পারেন।
এ সময় তিনি দাবি জানিয়ে বলেন, ‘তারিখ নির্বাচনের অপশন আরও স্পষ্টভাবে দেখানো উচিত, যাতে অন্য দর্শনার্থীদেরও আমার মতো একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে না হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনলাইনে টিকিট বুকিং হলেও যারা শেষ পর্যন্ত আসেন না, তাদের জন্য নির্ধারিত স্লট খালি থেকে যায়। এতে দর্শনার্থীর সংখ্যা যেমন কমে, তেমনি অন্যরাও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তার মতে, টিকিট বাতিল বা রিফান্ডের ব্যবস্থা থাকলে বাতিল হওয়া স্লটগুলো নতুন করে অন্যদের জন্য উন্মুক্ত করা যেত। মানুষের পরিকল্পনা বদলাতেই পারে। অনেক সময় প্লেনের টিকিটও মিস হয়। যেহেতু অগ্রিম টিকিট কেনার ব্যবস্থা আছে, সেহেতু রিফান্ডের অপশনও থাকা উচিত ছিল। এতে দর্শনার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না।’
এদিকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অনেক দর্শনার্থী। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দেন, ‘হই হই রই রই... টিকিটম্যান গেল কই।’
জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গতকাল (৬ আগস্ট ) রাতেই নোটিশ টানিয়ে জানানো হয়েছিল, শুক্রবার দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর বিকাল ৩টা থেকে খোলা হবে। তবে অনেকেই আগের সময়সূচি ধরে সকালেই চলে এসেছেন।’
পরে এই বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব একটি গণমাধ্যমকে কে বলেন, ‘আমাদের ভবনের ধারণক্ষমতা সীমিত। তাই পরিকল্পনা ছিল স্লট পদ্ধতিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করানো। কিন্তু প্রথম সপ্তাহে মানুষের আগ্রহ বেশি থাকায় অনেকেই স্লট পদ্ধতি মানতে চাননি। আমরা এখন একটি পরীক্ষামূলক সময় পার করছি। তাই কিছুটা বেশি মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। তবে পরে শৃঙ্খলিতভাবে প্রবেশ করাতেই হবে। ব্যাগ জমা দিয়ে প্রবেশ, লাইনে দাঁড়ানো-এসব প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগেই। আমার মনে হয়, মানুষও অভ্যস্ত হয়ে যাবে, আমরাও অভ্যস্ত হয়ে যাবো। এক সপ্তাহ চলতে দিন। এত বড় একটি জাদুঘর পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাড়লে পুরো প্রক্রিয়া আরও স্মুথ হয়ে যাবে।’
লাল টেলিফোনে শোনা যায় হাসিনার গোপন কথা : কেউ চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। কেউ হাতে থাকা মুঠোফোনে নম্বর মিলিয়ে লাল টেলিফোনের বোতাম চাপছেন। আবার কেউ পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, কখন খালি হবে টেলিফোনটি। নির্দিষ্ট নম্বরে কল করতেই ভেসে আসছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠ। কখনও অপর প্রান্তে রাজনৈতিক নেতা, কখনও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথন। পুরোনো সেই টেলিফোন ঘিরেই যেন সবচেয়ে বেশি কৌতূহল দর্শনার্থীদের।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সাবেক গণভবন এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নানা নিদর্শন, আওয়ামী লীগ শাসনামলের বিভিন্ন নথিপত্র এবং সেই সময়ের নানা ঘটনার স্মারক নিয়ে সাজানো হয়েছে জাদুঘরটি। এরমধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহৃত লাল টেলিফোন হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ।
জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার প্রথম দিন সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শেখ হাসিনার অফিসকক্ষের সামনে থাকা লাল টেলিফোনগুলো ঘিরে দর্শনার্থীদের তুমুল আগ্রহ। কেউ একটি কথোপকথন শুনে সরে যাচ্ছেন, আবার কেউ পরের নম্বরটি শুনতে অপেক্ষা করছেন।
সাবেক গণভবনের নিচতলায় শেখ হাসিনার অফিসকক্ষে তিনটি আলাদা টেবিলে রাখা হয়েছে ছয়টি লাল টেলিফোন। প্রতিটি টেবিলের সামনে রয়েছে আলাদা তালিকা। তালিকায় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের নাম ও নম্বর দেওয়া রয়েছে। সেই নম্বরে কল করলেই শোনা যাচ্ছে শেখ হাসিনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কথোপকথনের অডিও।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের প্রদর্শন ব্যবস্থায় ছয়টি টেলিফোনে রয়েছে প্রায় শতাধিক কল রেকর্ড। নির্দিষ্ট নম্বর চাপলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। কথোপকথনের বড় একটি অংশ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার বলে জানানো হয়েছে।
টেলিফোনগুলোর একটিতে ৭০৮ নম্বরে কল করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নুর তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনা যাচ্ছে। তালিকায় তার সঙ্গে শেখ হাসিনার পাঁচটি কথোপকথন থাকার তথ্য রয়েছে।
অন্য একটি লাল টেলিফোনে ৭১১ নম্বরে কল করলে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনা যাচ্ছে। এই টেলিফোনটির সামনেও বেশ কিছুক্ষণ ধরে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়।
লাল টেলিফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদ ইয়াসিন নামের এক যুবক। কথোপকথন শোনার পর তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপাকে একটাই কথা বলি, ভারতে থেকে ষড়যন্ত্র করে লাভ নাই। বাংলাদেশে ফিরে আসেন।’
তেজগাঁও থেকে বন্ধুদের সঙ্গে জাদুঘর দেখতে এসেছেন আমিনুল ইসলাম। অন্য প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পাশাপাশি বেশ কিছুক্ষণ তাকে লাল টেলিফোনে কথোপকথন শুনতে দেখা যায়।
টেলিফোনে কী শুনেছেন জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘৭৭০৮ নম্বরে দেখতে পাচ্ছি ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের নাম। সাদ্দাম হোসেন বেশ কয়েকবার, প্রায় নয়বার ভয়েস কল করেছেন। অনেক কথা বলছেন। কী করা যায়, কী করতে পারি আপা, এসব বলছেন। উনি (শেখ হাসিনা) বিভিন্নভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন।’
আরেক দর্শনার্থী আব্দুস সালামের কাছেও লাল টেলিফোনের অভিজ্ঞতা ছিল অন্য রকম। তিনি বলেন, ‘জুলাই জাদুঘরে অনেক কিছু দেখলাম। এর মধ্যে লাল টেলিফোনের বিষয়টি ইন্টারেস্টিং লেগেছে। একেকটি নম্বরে কল দিলে একেকজনের সঙ্গে কথোপকথন শোনা যায়। সরাসরি সেই সময়ের কথাগুলো শোনার সুযোগ পাওয়াটা অন্য রকম অনুভূতি।’
শুধু টেলিফোনের কথোপকথন নয়, এই কক্ষের দেয়াল ও আশপাশের প্রদর্শনীর মধ্যেও রয়েছে আওয়ামী লীগ শাসনামলের নানা স্মৃতি। সেখানে বিভিন্ন সময়ে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ছবি কাঠে খোদাই করে প্রদর্শন করা হয়েছে। ফলে একটি কক্ষে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা একদিকে যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অফিসের পরিবেশ দেখছেন, অন্যদিকে শুনছেন সেই সময়ের নানা কথোপকথন।
দর্শনার্থীদের আগ্রহের কারণও এখানেই। জাদুঘরের অন্যান্য নিদর্শন যেখানে চোখের সামনে দেখা যায়, লাল টেলিফোনে সেখানে শোনা যাচ্ছে কণ্ঠ। একটি নম্বর, একটি বোতাম চাপা, আর এরপরই কয়েক বছর আগের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কথোপকথন কানে ভেসে আসছে। ফলে দর্শনার্থীদের কাছে এটি শুধু একটি পুরোনো টেলিফোন নয়, বরং অতীতের একটি সময়কে শব্দের মাধ্যমে ফিরে দেখার মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতি, শহিদদের আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে সাবেক গণভবনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের প্রথম দিনে শুধু জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ পরিবারের সদস্য ও আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিদের প্রবেশের সুযোগ ছিল। বৃহস্পতিবার থেকে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় জাদুঘরটি।
প্রথম দিন সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। জাদুঘরের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখার পাশাপাশি লাল টেলিফোনের সামনে ছিল বিশেষ ব্যস্ততা।
দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক টিকিট ব্যবস্থা চালু করেছে। দর্শনার্থীদের আগে থেকে ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে সময় নির্বাচন করতে হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশ ফি ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা টিকিট নিয়ে জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। পরে এই সরকারের অধীনেই জুলাইয়ের নানা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে গণভবনে তৈরি করা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।
বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এর গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণ, সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং জুলাইয়ের শহিদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই জাদুঘর।