ঢাকা সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হামে মৃত্যু বাড়ছেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

হামে মৃত্যু বাড়ছেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৩ জন শিশু।

গতকাল রোববার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।

এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৭৭৫ শিশুর। আর হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯৮ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট ৮৭৩ শিশু মারা গেছে।

এছাড়া, ২৪ ঘণ্টায় ৭৫ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, আর হামের উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা ৯৮৮। এই সময়ে ৯৩৮ শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৯৪২ শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩২০, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৭,১১৫।

ডেঙ্গুতে আরও ২ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৬৭২ জন : দেশে গত একদিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসেবে, এ নিয়ে চলতি বছর এইডিস মশাবাহিত এ রোগে মোট ৬১ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে চলতি অগাস্টেই প্রাণ গেছে ৭ জনের।

গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৬৭২ জন।

এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হন ১১০ জন। ৯১ জন ভর্তি হন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার হাসপাতালগুলোতে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের বাইরে আরও ৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিভাগের মধ্যে বরিশালে ৮৪ জন, চট্টগ্রামে ৮৮ জন, খুলনায় ১৪০ জন ও ময়মনসিংহে ২৭ জন, রাজশাহীতে ৫৭ এবং রংপুরে ৫ এবং সিলেটে ৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫১১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল ছেড়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ৩৪৫ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে সুস্থ্য হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১৭ হাজার ৪৪ জন।

চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ২০ জন মারা গেছে ডিএসসিসি এলাকায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০ জনের প্রাণহানি হয়েছে খুলনা বিভাগে।

এছাড়া ডিএনসিসি এলাকায় ৭ জন, বরিশাল বিভাগে ৭, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫, ময়মনসিংহে ৬, রাজশাহীতে ৩ এবং ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের বাইরে, রংপুর ও সিলেট বিভাগে ১ জন করে মারা গেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর।

গেল বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের মত।

সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আরও ভয়ংকর হওয়ার আশঙ্কা, ঝুঁকিতে ঢাকা : দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগস্টজুড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে। এমনকি সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সেপ্টেম্বর পর্যন্তও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ হাজার ৬৭৩ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৫৯ জন। আক্রান্তের সংখ্যায় অন্য সব বিভাগকে ছাড়িয়ে গেছে ঢাকা। এ বিভাগে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৬৩৯ জন।

আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। সেখানে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৭৪০ জনের। চট্টগ্রামে ৩ হাজার ২২৮ জন, খুলনায় ২ হাজার ৪০১ জন, ময়মনসিংহে ৮২১ জন, রাজশাহীতে ৭১৩ জন, রংপুরে ৪২৬ জন এবং সিলেটে ১১১ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

মৃত্যুর দিক থেকেও সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা। এ বিভাগে এ পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৫ জনই ঢাকা মহানগরীর বাসিন্দা। খুলনায় মারা গেছেন ১০ জন, বরিশালে ৭ জন, ময়মনসিংহে ৬ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন, রাজশাহীতে ৩ জন এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বিপুল জনসংখ্যার ঘনত্ব, বছরজুড়ে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের দুর্বলতার কারণে রাজধানীতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি।

রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে শুরু করে বাড়িঘর ও নির্মাণাধীন ভবন বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে। ফলে শুধু বর্ষাকালে অভিযান পরিচালনা করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সারা দেশের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ এবং মশার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা আরও বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় জনবল ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া গেলে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ডা. কবিরুল বাশার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেন, আগস্টে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে আগস্টেই যে এ বছরের সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি আরও বাড়তে পারে।

এ কারণে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর- দুই মাসকেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এই কীটতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে। বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের এলাকায় যাতে পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

ড্রাম, বালতি বা অন্যান্য পাত্রে পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করে উল্টে রাখতে হবে। একই সঙ্গে ড্রেন সচল রাখা এবং নির্মাণাধীন স্থাপনায় জমে থাকা পানির বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। তার মতে, মশা তৈরির পরিবেশ পরিবর্তন করা গেলে এডিসের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল দ্রুত শনাক্ত ও ধ্বংস করা।

যেসব স্থানে পানি জমে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে, সেগুলো নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। কোনও প্রজননস্থল পুরোপুরি অপসারণ করা সম্ভব না হলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতার কীটনাশক বা মশার প্রজনন বন্ধে কার্যকর উপাদান ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে ওয়ার্ড পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু মৌসুমে সাময়িক অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বছরজুড়ে প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে হবে।

তা না হলে আগামী মাসগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত