প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১০ আগস্ট, ২০২৬
একটি দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি বহুলাংশে নির্ভর করে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষা শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়; এটি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিকাশ, সৃজনশীলতার উন্মেষ এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভিত্তি শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান উপকরণও বটে। তাই শিক্ষার প্রসার যেমন জরুরি, শিক্ষার মান নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি। শুধু নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ কিংবা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে একটি ফলপ্রসূ ও কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান, শিক্ষকতার গুণগত মান, পাঠ্যক্রম, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা উন্নয়নের দিকে অধিক মনোযোগ দেওয়া সময়ের অপরিহার্য দাবি।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিক্ষার সুযোগও আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অর্জন। তবে এই সম্প্রসারণের সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান যদি রক্ষা করা না যায়, শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও চিন্তাশক্তি অর্জন করতে না পারে, তাহলে সেই সম্প্রসারণের সুফল আশানুরূপ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সংখ্যাগত সম্প্রসারণ থেকে গুণগত উৎকর্ষের দিকে অগ্রসর হওয়া। কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কোথাও দক্ষ শিক্ষক নেই। আর বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব তো রয়েছেই। বহু প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত গবেষণাগার, লাইব্রেরি, প্রযুক্তিগত সুবিধা কিংবা ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ভালো ফল করাকে শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে; কিন্তু বাস্তব সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহার কিংবা সৃজনশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা যথেষ্ট বিকশিত হচ্ছে না।
শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রথম শর্ত হলো যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। ভালো ভবন, আধুনিক আসবাব কিংবা প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ কখনও একজন দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না। শুধু পাঠ্যবই পড়িয়ে দেওয়াই একজন শিক্ষকের কাজ নয় বরং একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগাতে, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শেখাতে এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হতে হবে। এজন্য নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে এটিকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
পাঠ্যক্রমের সংস্কার একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিবর্তনশীল বিশ্বে পুরোনো সিলেবাসে লেখাপড়া করে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের জন্য নিজেদেরকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। যুগের চাহিদা মেটাতে সক্ষম না হলে ওরা যে পিছিয়ে পড়বে- তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, অটোমেশন, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার বিষয়বস্তু ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তবে প্রযুক্তি শেখানোর পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শিক্ষা যদি শুধু কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ মানুষ তৈরি করে, কিন্তু নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই শিক্ষা সমাজের জন্য পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ বয়ে আনতে পারবে না। একজন শিক্ষিত মানুষকে শুধু চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করার যোগ্য নয়, বরং সত্য-মিথ্যা বিচার, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নির্ণয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে।
গতানুগতিক পরীক্ষা ফলাফলনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। অথচ বর্তমানে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে পরীক্ষার ফলাফলই শিক্ষার প্রধান সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে কোচিং, নোটনির্ভরতা ও মুখস্থবিদ্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার্থীর কৌতূহল ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
এমতাবস্থায় শিক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী কী মুখস্থ করেছে তার পাশাপাশি সে কী বুঝেছে, কীভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে, কীভাবে একটি সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে অর্জিত জ্ঞান কীভাবে প্রয়োগ করতে পারে- এসবও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো অবশ্যই শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু যদি গবেষণার পরিবেশ, দক্ষ শিক্ষক, মানসম্মত ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং আন্তর্জাতিক মানের একাডেমিক কার্যক্রম নিশ্চিত না হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না। বরং মানসম্পন্ন কয়েকটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিক্ষার আঞ্চলিক বৈষম্যদূর করাও জরুরি। শহরের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য বিরাজমান। নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিদ্যমান পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, ডিজিটাল ও বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা ভীষণ প্রয়োজন।
এখানে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার যেন শুধু ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। শিক্ষাকে যদি শুধু বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে দেখা হয়, তাহলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষার মান নির্ধারণে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, শিক্ষকদের উপস্থিতি ও পাঠদানের মান কেমন, প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো কী অবস্থায় রয়েছে এবং স্নাতকদের বাস্তব দক্ষতা কতটা- এসবের নিয়মিত ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। শুধু প্রতিষ্ঠান অনুমোদন করে তার কার্যক্রমের ওপর নজর না রাখলে কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষায় বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য ভবনের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না; মাপতে হয় মানুষের সক্ষমতা দিয়ে। একটি বিদ্যালয় হয়তো শত শত শিক্ষার্থীকে সার্টিফিকেট দিতে পারে; কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, কতজন দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, কতজন সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠেছে- সেটিই হওয়া উচিত শিক্ষার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
এখন তাই শিক্ষানীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার নির্ধারণের সময় এসেছে। যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ঘাটতি রয়েছে, সেখানে অবশ্যই নতুন প্রতিষ্ঠান করতে হবে। কিন্তু শুধু সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান স্থাপন না করে আগে দেখতে হবে—- বদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে আরও কার্যকর, আধুনিক ও মানসম্মত করা যায়।
শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সংখ্যার ওপর নয়, মানের ওপর। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না; জ্ঞান অর্জন করবে, দক্ষতা অর্জন করবে, নৈতিকভাবে বিকশিত হবে, সৃজনশীলভাবে চিন্তা করবে এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে।
অতএব, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এখন আমাদের আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে শিক্ষকতার মান, পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন, গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ব্যবহারিক দক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা এবং কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণের ওপর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজনের ভিত্তিতে হতে হবে; কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়ন হতে হবে জাতীয় শিক্ষানীতির প্রধান অগ্রাধিকার।
কারণ ভবনের সংখ্যা দেশকে উন্নত করে না- মানসম্পন্ন শিক্ষায় গড়ে ওঠা মানুষই একটি দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
মো. মুখলেছুর রহমান
লেখক : অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক