ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

অন্ধকার ঘুচাবে সৌরবিদ্যুৎ

অন্ধকার ঘুচাবে সৌরবিদ্যুৎ

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ হয়ে উঠেছে এক আশার আলো। যেসব দুর্গম অঞ্চলে শতবর্ষেও পৌঁছায়নি বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড, সেখানে আজ রাতে জ্বলছে আলো, চলছে ফ্যান, এমনকি চালিত হচ্ছে ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি-যার সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছে সৌরশক্তি। একসময়ের ‘বিকল্প শক্তি’ হিসেবে বিবেচিত এই সবুজ শক্তি এখন জাতীয় উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ খাতের মূলধারায় নিজের স্থান শক্ত করে নিচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি শুধু যে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাচ্ছে তা নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে দিয়ে অন্ধকার দূরীকরণে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। দুর্গম চরাঞ্চল ও পাহাড়ে আলোর ঝরনা ধারাদেশের যে সমস্ত প্রত্যন্ত অঞ্চল- যেমন নদীর বুক জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন চর, দুর্গম পাহাড়ি জনপদ কিংবা উপকূলীয় দ্বীপে গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব বা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল, সেখানে আলোর দিশারী হয়ে এসেছে সৌরবিদ্যুৎ।

সোলা হোম সিস্টেম এবং সোলার মিনি-গ্রিডের মাধ্যমে এসব অঞ্চলে এখন ঘরে ঘরে জ্বলছে আলো। রাতে বাচ্চাদের পড়াশোনা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দোকানপাট খোলা রাখা কিংবা জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এসেছে অভূতপূর্ব পরিবর্তন। আগে সন্ধ্যা নামলেই আমাদের জীবন থমকে যেত। কোপায় তেল ভরে আলো জ্বালানো ছিল একমাত্র ভরসা। এখন ঘরের ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানোর পর রাত আর দিন আলাদা মনে হয় না। ছেলেমেয়েরা নিশ্চিন্তে রাতে পড়তে পারছে। ফাতেমা বেগম, চর এলাকার বাসিন্দা। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও টেকসই পরিবেশ বিশ্বব্যাপী কার্বন নির্গমন কমানোর যে লড়াই চলছে, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা খনিজ তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে বাতাসে যে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে, তা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো ধরনের বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয় না। একটি ১০০ ওয়াটের সৌর প্যানেল তার জীবদ্দশায় কয়েক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হ্রাস করতে সক্ষম। পরিবেশবিদদের মতে, সবুজ শক্তির দিকে দ্রুত স্থানান্তরিত হওয়াই আগামী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার একমাত্র পথ।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্যতম যন্ত্র হলো সোলার প্যানেল। সূর্য থেকে আলো ও তাপ শোষণ করে বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন করে এই প্যানেল। এটি আমদানি করা হয়। দেশেও এখন সীমিত পরিসরে সোলার প্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাকৃতিক উৎস। তাই পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানি হিসেবে দুনিয়াজুড়ে এর ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া এটি নির্মাণের পর নতুন করে জ্বালানি কেনার খরচ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ঠেকাতে সৌরবিদ্যুৎ মূল ভরসা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে সোলার প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান জানানোর পর চীনের একাধিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পর্যালোচনা করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘লংগি’ বাংলাদেশে অফিস স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত। গত মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) বলছে, গত ২০১২ থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ৫৬ মেগাওয়াট।

বর্তমানে এটি বেড়ে ১৬০ মেগাওয়াট হয়েছে। ছাদ ব্যবহার করে বড় ধরনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ আছে দেশে। সএটি করা গেলে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারে সরকার। ৬০ হাজার কোটি টাকার ৫৫ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে অনিশ্চয়তা। ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের নামে দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ও বিদেশি বিনিয়োগ এনে আত্মসাৎ করায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। এ কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে পুরো প্রকল্প। জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আগের পরিকল্পনাটি স্থগিত করে বর্তমান নতুন সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশ্ববাজারে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির দাম কমছে। এতে অনেকেই বিনিয়োগে উৎসাহী হবে। সারা দেশে সরকারি সব স্থাপনার ছাদ ব?্যবহার করে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার।

প্রথম ধাপে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে তিনটি মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগ যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদ ব্যবহার করা হবে। গত বছর ২১ অক্টোবর তিন মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগের সঙ্গে আলাদা করে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ। ছয়টি বিভাগ হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ। ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা। ৪৬ হাজার ৮৫৪টি প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যদিও এতে তেমন অগ্রগতি নেই। দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে ১৩টি এলাকায় গবেষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে দুটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ফেনীতে গত ২০০৫ সালে নির্মাণ করা হয় প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র।

এটির উৎপাদন সক্ষমতা ১ মেগাওয়াটের চেয়ে কম। যা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। গত ২০০৮ সালে কক্সবাজারে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একই এলাকায় ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র গত বছর উৎপাদনে এসেছে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পানি ও বায়ুবিদ্যুতের চেয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সম্ভাবনা দেখছেন সরকার।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একাধিক উৎস আছে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ এবং সন্ধ্যার পর পানি ও বায়ুবিদ্যুৎ দিয়ে গ্রিডের সমতা বজায় রাখে। দেশে মূলত সম্ভাবনা আছে সৌরবিদ্যুতের। এ ক্ষেত্রে জমির স্বল্পতা একটা বড় সমস্যা। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শুরুটা হয় কাপ্তাইয়ের পানিবিদ্যুৎ থেকে। পার্বত্য জেলা রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে ১৯৫৭ সালে পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরুর মধ্য দিয়ে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুরু হয়। এই কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো হয় ১৯৮৮ সালে। যদিও ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এ কেন্দ্র থেকে এখন উৎপাদন হয় ১০০ মেগাওয়াটের কম। ১৯৯৬ সালে শুরু হয় সোলার হোম সিস্টেম বসানোর প্রকল্প। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছায়নি, সেসব এলাকার ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্র বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম বসানো হয়েছে বলে দাবি করে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)। এর মধ্যে দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করেছে সরকার। এ ফলে সোলার হোম সিস্টেমের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত ও অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলা হয়, গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি করে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের জন্য চুক্তি হয়েছে ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের, যার সক্ষমতা ১ হাজার ১০৪ মেগাওয়াট। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সব মিলিয়ে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আছে। এদের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। এর বাইরে ৩৫৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। বেসরকারি খাতে ২ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরও ৩১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া ছিল গত সরকারের সময়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্মতিপত্র দেওয়া হয় দরপত্র ছাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে। দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত ওই আইন বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এগুলো এখন পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অপেক্ষায় আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। দরপত্রের মাধ্যমে যে দর পাওয়া গেছে, এগুলোর দাম আগের চেয়ে গড়ে ২১ শতাংশ কমেছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

কৃষি খাতে সৌরবিদ্যুৎ : ডিজেল নির্ভরতার অবসান কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে সৌরবিদ্যুতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে সেচ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে। আগে সেচ মৌসুমে কৃষকদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো আমদানিকৃত এবং দামি ডিজেলের ওপর। ডিজেল চালিত পাম্প ব্যবহার করতে গিয়ে সেচ খরচ বেড়ে যেত বহুগুণ, যা ফসলের উৎপাদন খরচে বড় ধরনের প্রভাব ফেলত। বর্তমানে সৌরচালিত সেচ পাম্প ব্যবহারের ফলে কৃষকদের জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে-

উৎপাদন খরচ হ্রাস : ডিজেলে বারবার টাকা খরচ করার ঝামেলা কমেছে।

পরিবেশবান্ধব সেচ : ধোঁয়া ও শব্দদূষণমুক্ত প্রযুক্তি।

সহজ পরিচালনা : সূর্যের আলো থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি তোলার সুবিধা। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সৌর সেচপাম্প শুধু কৃষকের উৎপাদন খরচই কমাচ্ছে না, বরং জাতীয় জ্বালানি আমদানির ওপর থেকেও চাপ অনেকটা হ্রাস করছে। শিল্প ও বসতবাড়িতে ‘নেট মিটারিং’ ও ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বর্তমানে শুধু গ্রিডবহির্ভূত গ্রাম অঞ্চলেই নয়, বরং শহরাঞ্চল ও শিল্পকারখানাতেও সোলার প্যানেলের বহুল ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ‘রুপটপ সোলার’ বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। নেট মিটারিং পদ্ধতির মাধ্যমে শিল্পমালিক ও সাধারণ গ্রাহকরা তাদের অব্যবহৃত ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন।

দিনের বেলায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ : নিজেদের উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে দিনভাগের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে।

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি : উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পাঠিয়ে মূল বিদ্যুৎ বিল থেকে কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ : তৈরি পোশাক শিল্পসহ ভারী শিল্পকারখানাগুলোতে বিদ্যুতের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসছে, যা পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে। অর্থনৈতিক মুক্তি ও নতুন কর্মসংস্থানসৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ শুধু আলো জ্বালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি তৈরি করেছে নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ। সৌর প্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি তৈরি ও বিক্রয় ব্যবস্থা ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল বাজার।

নতুন কর্মসংস্থান : তরুণ প্রকৌশলী ও স্থানীয় মেকানিকদের জন্য সৌর সেক্টরে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।

নাইট ইকোলজি ও ব্যবসা : প্রত্যন্ত গ্রামের হাটবাজারগুলোতে আগে সূর্য ডোবার পরপরই কেনাবেচা বন্ধ হয়ে যেত। এখন সৌরবিদ্যুতের কারণে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত ব্যবসা-বাণিজ্য সচল থাকছে, যা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও আধুনিক ব্যাটারি ব্যবস্থা একসময় সৌরবিদ্যুতের বড় সীমাবদ্ধতা ছিল ব্যাটারির স্থায়িত্ব এবং মেঘলা আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ সংকটের ঝুঁকি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সৌর প্রযুক্তিতে এসেছে ব্যাপক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্যানেল : মনোক্রিস্টালাইন প্যানেল আসার ফলে কম সূর্যের আলোতেও বেশি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।

লিথিয়ামণ্ডআয়ন ও উন্নত ব্যাটারি: নতুন প্রযুক্তির লিথিয়ামণ্ডআয়ন এবং লিথিয়াম আইরোন ফসফেট ব্যাটারি আসার ফলে সৌরবিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখা অনেক বেশি নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি : আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও আধুনিক সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান।

এই খাতকে আরও গতিশীল করতে যেসব বাঁধা অতিক্রম করা প্রয়োজন : চ্যালেঞ্জ বর্তমান পরিস্থিতিসম্ভাব্য সমাধান প্রাথমিক বিনিয়োগ সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় এখনো অনেকের সাধ্যের বাইরে। সহজশর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও সরকারি ভর্তুকি বৃদ্ধি। জমি বা জায়গার অভাব বড় আকারের সোলা পার্ক তৈরির জন্য প্রচুর জমির প্রয়োজন হয়। জলাশয়ে ভাসমান সোলা প্যানেল ও ছাদভিত্তিক সোলারে জোর দেওয়া। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মেয়াদ শেষ হওয়া প্যানেল ও ব্যাটারির পরিবেশগত প্রভাব। রিসাইক্লিং বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নীতিমালা তৈরি করা। ভবিষ্যতের পথনকশা বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য শক্তির কোনো বিকল্প নেই। সৌরবিদ্যুৎ হলো- এমন এক অসীম শক্তির উৎস যা কখনোই নিঃশেষ হবে না। যে গতিতে সৌর প্রযুক্তির খরচ দিন দিন কমে আসছে এবং কার্যক্ষমতা বাড়ছে, তাতে স্পষ্ট যে আগামী দিনগুলোতে আমাদের জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করবে সূর্য। প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি খালি জায়গা এবং প্রতিটি দুর্গম কোণে যদি আমরা সৌর প্যানেলের ছোঁয়া পৌঁছে দিতে পারি, তবে বিদ্যুৎহীন অন্ধকারের অধ্যায় চিরতরে সমাপ্ত হবে। সৌরবিদ্যুতের আলোয় উদ্ভাসিত হবে একটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত